গ্রীষ্মকালীন তীব্র তাপদাহ ও চড়া তাপমাত্রা উপেক্ষা করে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার দ্বিতীয় দিনে তেহরানের রাস্তায় নেমেছে লাখ লাখ শোকাকুল মানুষের ঢল।
রবিবার (৫ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে জর্ডানের সংবাদমাধ্যম রোয়া নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের রাজধানী তেহরানে চলমান তীব্র তাপদাহের মধ্যেই প্রয়াত নেতার পতাকা জড়ানো কফিন এক নজর দেখতে সমর্থকরা সমবেত হয়েছেন ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো কমপ্লেক্স জুড়ে বিশেষ ওয়াটার-মিস্টিং (পানি ছিটানোর) ব্যবস্থা করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া রেড ক্রিসেন্ট ও হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে শীতল পানীয় বিতরণ এবং কুলিং টেন্ট ব্যবস্থাপনার কাজ করে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল উপস্থিতি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি একটি সুসংগঠিত সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। একই সাথে এটি খামেনির ৫৬ বছর বয়সী ছেলে ও উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির জন্য একটি বড় ধরনের শক্তিপ্রদর্শন।
প্রায় চার দশক ধরে ইরান শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন।
ইসলামী রীতি অনুযায়ী দ্রুত দাফনের নিয়ম থাকলেও, সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ চার মাস এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় ইরানি কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর অবশেষে এই রাষ্ট্রীয় বিদায়ানুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনী এবং ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির দাফনের সময় ঘটে যাওয়া মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হুড়োহুড়ির ইতিহাস মাথায় রেখে এবার অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কফিনের কাছাকাছি সরাসরি যাওয়া আটকাতে কংক্রিটের ব্যারিয়ার দিয়ে ঘেরা একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একজন দর্শনার্থী সর্বোচ্চ ২০ মিনিট অবস্থান করতে পারছেন।
ফাঁস হওয়া কিছু সরকারি নথি থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন শহর মিলিয়ে মোট উপস্থিতি ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে, যা মাথায় রেখে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা হতাহত মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতিও রেখেছে প্রশাসন।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াস্থলজুড়ে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। সমবেত জনতা প্রথাগত শিয়া শোক পালনের রীতি অনুযায়ী বুকে হাত চাপড়ে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’, ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ এবং ‘প্রতিশোধ! প্রতিশোধ!’ স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত করে তুলছেন। অনুষ্ঠানস্থলে ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষায় একটিই মূল নীতিবাক্য শোভা পাচ্ছে- ‘আমাদের জেগে উঠতে হবে।’
এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি দল তেহরানে এসে পৌঁছেছেন, যার মধ্যে ইরাক, তাজিকিস্তান ও জর্জিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও রয়েছেন।
শিয়া বিশ্বে আঞ্চলিক প্রভাব প্রদর্শনের জন্য এই বিশাল সময়সূচিটি খুব সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে।
৫ জুলাই: তেহরানে সন্ধ্যা পর্যন্ত জনসাধারণের শ্রদ্ধা জানানো শেষে খামেনির কফিনবাহী মিছিল রওনা হবে পবিত্র শহর কোমের উদ্দেশ্যে।
৭ জুলাই: মিছিলটি প্রতিবেশী দেশ ইরাকে প্রবেশ করবে এবং শিয়াদের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র নাজাফ ও কারবালা প্রদক্ষিণ করবে।
৮-৯ জুলাই: মরদেহ পুনরায় ইরানে ফিরিয়ে এনে খামেনির নিজ শহর মাশহাদের বিখ্যাত ইমাম রেজা মাজারে চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন করা হবে।








