সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিস্তাপারের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের আহাজারি নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি বারবার উত্তরাঞ্চল সফর করেছেন। সেই ভাবনার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসাবে ঘোষণা করেছে। এটি যে কোনো মূল্যে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হচ্ছে। প্রকল্পটি যাতে বাস্তবমুখী হয় সেজন্য দফায় দফায় চলছে সমীক্ষা। উত্তরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত ৫ জেলার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে বিএনপির সরকার এই বৃহৎ প্রকল্পের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বুধবার যুগান্তরকে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছিল খালেদা জিয়ার স্বপ্ন। ছাত্রনেতা হিসাবে আমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চল সফর করেছি। চলতি বাজেটে এজন্য অর্থও বরাদ্দ রেখেছে সরকার।

মন্ত্রী বলেন, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ঐতিহাসিক সূচনা করেছিলেন। খালেদা জিয়ার সরকার সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ২০০১ পরবর্তী বিএনপি সরকারের আমলে তিস্তা ব্যারাজের প্রধান ক্যানেল ও সেচ কাঠামোর সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী ও বগুড়াসহ ওই অঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর জমিতে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন রোধ। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বিকল্প হিসাবে ভূগর্ভস্থ পানি ও সেচ পাম্প ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শাসনামলে আন্তর্জাতিক ফোরামে এবং ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ার পর, তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নে কৌশল প্রহণ করেছিল। আমরা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে এই প্রতিবেদকের আলাপচারিতার নানা দিক তুলে ধরা হলো-

যুগান্তর : তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : তিস্তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন-জীবিকা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব। এই দুই সংকট বছরের পর বছর মানুষকে ভোগাচ্ছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে।

যুগান্তর : মহাপরিকল্পনার কাজ কি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে একটি শক্তিশালী ও নির্ভুল সমীক্ষা (স্টাডি) প্রয়োজন। আগে কিছু ধারণাপত্র (কনসেপ্ট) ছিল, কিন্তু আমরা মনে করছি সেটিকে আরও গভীরভাবে যাচাই করতে হবে। কারণ তিস্তার মতো বড় প্রকল্পে কোনো ধরনের ভুলের সুযোগ নেই।

যুগান্তর : এজন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : আমি নিজে বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে তিস্তা এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। বুয়েট, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, আইডব্লিউএম, ওয়ারপো এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমরা নদীর বর্তমান অবস্থা, ক্যানেল, সেচব্যবস্থা, নদীভাঙন এবং স্থানীয় মানুষের মতামত সংগ্রহ করেছি।

যুগান্তর : কবে নাগাদ স্টাডি শেষ হবে?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : চলতি মাসের শেষদিকে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে একটি চূড়ান্ত কনসেপ্ট পাব। এরপর পূর্ণাঙ্গ স্টাডি শুরু হবে। এই স্টাডি শেষ করতে অন্তত ৬ মাস সময় লাগতে পারে। কারণ এটি অত্যন্ত কারিগরি ও জটিল একটি কাজ।

যুগান্তর : চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : চীন আগে প্রাথমিক একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। তারা ভবিষ্যতেও সহযোগিতা করতে আগ্রহী। তবে শুধু চীন নয়, প্রয়োজন হলে নেদারল্যান্ডসসহ নদী ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ অন্য দেশগুলোর সহযোগিতাও নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই-সেটি হলো সর্বোচ্চ মানের স্টাডি নিশ্চিত করা। যাতে প্রকল্পটি বাস্তবমুখী ও পরিকল্পিত হয়।

যুগান্তর : তাহলে কি বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত হবেন?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : প্রয়োজন হলে অবশ্যই যুক্ত হবেন। বাংলাদেশের নিজস্ব বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চীন, নেদারল্যান্ডস কিংবা অন্য কোনো দেশের বিশেষজ্ঞদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আমরা সর্বোত্তম সমাধান চাই।

যুগান্তর : ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি বা চাপ আছে কি?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : না। এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। তিস্তার বাংলাদেশ অংশে উন্নয়নমূলক কাজ করা আমাদের সার্বভৌম অধিকার। আমরা অবশ্যই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেব।

যুগান্তর : তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কত সময় লাগতে পারে?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : স্টাডি শেষ হওয়ার আগে নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। তবে এটি একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়, বাস্তবায়নে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগতে পারে। স্টাডি শেষ হলে সময়সীমা আরও নির্ভুলভাবে বলা যাবে।

যুগান্তর : এ প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে হবে?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : স্টাডির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ চলতি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে উন্নয়ন সহযোগী দেশ বা সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হবে। অনুদান বা স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ থাকলে সরকার তা বিবেচনা করবে।

যুগান্তর : তিস্তা অঞ্চলের মানুষের জন্য সরকারের মূল বার্তা কী?

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি : আমরা শুধু একটি প্রকল্প করতে চাই না; আমরা এমন একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাই, যাতে তিস্তা অববাহিকার মানুষ স্থায়ীভাবে উপকৃত হন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর।