বাবা আর ছেলে সাইকেল চালানো সেরে বাড়ি ফিরছিল। ঘনিয়ে ওঠা শরতের এক রোববার তারা নদীর ধারে সাইকেল চালাতে গিয়েছিল। ফেরার পথে জাতীয় সড়কের ধোঁয়া আর ধুলার ভেতর দিয়ে ঠেলেঠুলে তারা অবশেষে এসে পৌঁছাল বাড়ি থেকে মাত্র এক মাইল দূরের আবাসিক এলাকায়। সবে পুরোনো হয়ে আসা পাড়াটা পেরিয়ে আরও এক টিলার ওপারে তাদের বাড়ি—নতুন গৃহনির্মাণ প্রকল্পের ভেতরে। তখন সবে সাতটা পেরিয়েছে, কিন্তু শরতের সূর্য দ্রুত ডুবে যাচ্ছিল, আর চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল। বাবা আর ছেলে সাইকেল থামিয়ে রাস্তার বাতির হলুদ আলোয় দাঁড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস বুক ভরে টেনে নিল।
‘তোমার শরীর ঠিক আছে, বাবা?’
‘হাঁটুর যা অবস্থা—মনে হচ্ছে, এখনই ভেঙে পড়বে। একটু দাঁড়াই।’
‘আমার তো কিছুই লাগছে না।’
‘তোমার জন্য তো সেটাই স্বাভাবিক,’ বলে বাবা ক্লান্ত হেসে একটা সিগারেট ধরালেন।
‘কারা যেন তরকারি রান্না করছে!’ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ছেলে। ‘আমি তো ক্ষুধায় মরে যাচ্ছি। চলো না যাই! আর মাত্র একটু দূর!’
‘চলো, যাওয়া যাক।’
বাবা পায়ের তলায় সিগারেট চাপা দিয়ে সাইকেলের কালো হাতলে হাত রাখলেন। ঠিক যে মুহূর্তে বাবা আর ছেলে প্যাডেলে পা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে গতি বাড়াতে শুরু করল, ঠিক তখনই মাত্র পাঁচ-ছয় মিটার দূরের একটা মোড়ে এক বিশাল ছায়া আচমকা ঝড়ের মতো ছুটে মাটি কাঁপিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেল।
গতিবিধিতে মনে হলো ওটা খুব ভারী, খুব শক্তিশালী কোনো কিছু। যেন কোনো বুলডোজার কিংবা ১০ টনের ট্রাক।
ঘটনাটা এক পলকের মধ্যে ঘটে গেলেও তাদের চোখে স্পষ্ট ছাপ ফেলে গেল। প্রায় পিচ্ছিল, মোটা পশুর চামড়া, আর মাংস ও পেশির তিরতির কাঁপুনি।
শক্ত করে হাতল ধরে তারা দুজনেই প্যাডেল থেকে পা নামিয়ে তাকিয়ে রইল।
রাস্তার বাতির নিচে ধুলা ঘুরপাক খাচ্ছে। মাটির কম্পন ধীরে ধীরে থেমে এল।
র্যানডম স্যাম্পল‘উঁ...’ বাবা আবারও আগের মতো শব্দ করলেন। ‘গন্ডার চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে পড়তেই পারে। অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তুমি খেয়াল করনি ওটার মাথায় দুটো শিং ছিল?’
তবু চারপাশে মাটির নিচে যেন মৃদু গুড়গুড় আওয়াজ রয়ে গেল। এরপর হঠাৎ সেটাও থেমে গেল। সেটা থামল একটু অস্বাভাবিকভাবে—যেন হঠাৎ কোনো টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার চারপাশে ফিরে এল চেনা আওয়াজ—শিশুর কান্না, রান্নার গন্ধ, টেলিভিশনের হাসিঠাট্টা।
‘গিয়ে দেখব নাকি...?’, বাবা চোখ দিয়ে প্রশ্ন করলেন। ছেলে মাথা নাড়ল। তারা মোড়ে গিয়ে সাইকেল থামিয়ে তাকাল সামনের দিকে।
বিক্ষিপ্ত বাতি থেকে রাস্তায় হালকা আলো পড়ছে। আশপাশে গ্যাস আর পানির লাইন মেরামতের চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ফেটে যাওয়া অ্যাসফল্ট পাথরের দীর্ঘ রাস্তাটা শব্দহীন।
‘কোথায় গেল ওটা?’ ছেলের প্রশ্ন।
‘উঁ...’ বাবা মাথা নাড়লেন।
একটু চুপ করে রইল দুজন।
‘বাবা, কী মনে হয়, ওটা কী ছিল?’
‘জানি না।’
‘আমার তো মনে হলো গন্ডার। গরুর চেয়েও অনেক বড় ছিল। লম্বায় সাত-আট মিটার তো হবেই। আর যদি ভুল না দেখে থাকি, ওটা এই বেড়াটার দ্বিগুণ উঁচু ছিল—তাহলে তিন মিটার তো হবেই; না, আরও বেশি।’
‘উঁ...’ বাবা আবারও আগের মতো শব্দ করলেন। ‘গন্ডার চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে পড়তেই পারে। অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তুমি খেয়াল করনি ওটার মাথায় দুটো শিং ছিল?’
‘শিং? হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে—দুটো শিংই তো ছিল।’
‘তাহলে তো গন্ডার হওয়ার সম্ভাবনাও বাদ গেল।’
‘তাহলে গরু? ষাঁড়?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তাই হবে। এখন তো এমন ষাঁড় তেমন দেখা যায় না। কিন্তু কাছের কোনো খামার বা মাঠে নিশ্চয়ই ছিল।’
‘হুম।’
‘যদি ওভাবেই চলতে থাকে তাহলে কোনো ট্রাকের সঙ্গে লাগলে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটবে।’
‘ঠিক বলেছ।’
তারা আবার রাস্তাটার দিকে তাকাল। কান খাড়া করল। কিন্তু রাতের চেনা শব্দ, সংসার আর আরাম আর টেলিভিশনের হাঁকডাক ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ল না।
যেন ওরা যা দেখেছে, সে রকম কিছুই ঘটেনি।
বাবা মাথা ঝাঁকালেন।
যদি একা থাকতাম, ভাবতাম আমি ভুল দেখেছি।
অনেকক্ষণ পর বাবা আর ছেলে নীরবে সাইকেল চালিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে চলল। রাস্তা একটু উঁচু হতে থাকায় মাঝেমধ্যেই থেমে বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল।
শান্তিপুরে অশান্তিবিক্ষিপ্ত বাতি থেকে রাস্তায় হালকা আলো পড়ছে। আশপাশে গ্যাস আর পানির লাইন মেরামতের চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ফেটে যাওয়া অ্যাসফল্ট পাথরের দীর্ঘ রাস্তাটা শব্দহীন।
পেছনে বিস্তীর্ণ শহরের দিকে ফিরে তাকাল তারা। কিন্তু কোনো অস্বাভাবিক ছায়া, কোনো ধুলার কুণ্ডলী বা মাটির কম্পন—কিছুই নেই।
‘বাবা, তুমি কি ওটার লেজটা দেখেছিলে?’ হঠাৎ ছেলের প্রশ্ন।
‘হুম, কী হয়েছে লেজে?’
‘তুমি খেয়াল করোনি? বিশাল মোটা এক লেজ ছিল!’
তারা টিলার চূড়ায় পৌঁছে গেল, পার হলো শেষ কয়েকটা গাছের জটলা।
হঠাৎ সামনে তাদের এলাকা দেখা গেল। নতুন শহরের নতুন বাড়িগুলোর সব কটাতেই আলো জ্বলছিল, কিন্তু কে জানে কেন—সম্ভবত এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পারদ-বাতির তীব্র আলোর জন্যই—বাড়িগুলো মাটিতে ঝুঁকে চেপে বসে আছে বলে মনে হচ্ছিল।
মা তাদের জন্য রাতের খাবার রেঁধে রেখেছেন।
‘আরে, বলো কী! এতই বড় ছিল নাকি?’
চপস্টিক ধরা হাত তোলা অবস্থাতেই মা খাবার টেবিলের ওপর দিয়ে তাকালেন বাবা আর ছেলের দিকে।
‘ছিল তো! এত বড় ছিল যে আমি ভেবেছিলাম গন্ডার!’
‘তাই যদি হয়, তাহলে তো ভয়ানক হবে। পুরো শহর তো তোলপাড় হয়ে যাওয়ার কথা।’
‘কিন্তু আসলে কিছুই হয়নি। এমনকি দৌড়ের শব্দটাও হঠাৎ থেমে গেল।’
‘হ্যাঁ, একেবারে এমনভাবে থামল যেন আমরা কিছুই শুনিনি।’
‘এ তো অসম্ভব ব্যাপার! ও, বুঝেছি—এ জন্যই তোমরা হঠাৎ করে খবরের প্রতি এত আগ্রহ দেখাচ্ছিলে। খবরে কি কিছু বলেছে?’
‘কিছুই না। হয়তো এত তাড়াতাড়ি খবরে দেখাবে না।’
‘কী বলো, অবশ্যই দেখাতে হবে! ভাবো দেখি—সাত-আট মিটার লম্বা, অন্তত তিন মিটার উঁচু একটা প্রাণী।’
রহস্য‘এ তো অসম্ভব ব্যাপার! ও, বুঝেছি—এ জন্যই তোমরা হঠাৎ করে খবরের প্রতি এত আগ্রহ দেখাচ্ছিলে। খবরে কি কিছু বলেছে?’
‘আমার মনে হয় তোমরা বাড়িয়ে বলছ। এত বড় গরুর কথা কেউ শুনেছে কোনো দিন? আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ না তো?’
‘একেবারেই না। আমরা স্পষ্ট দেখেছি। তাই না, বাবা?’
‘নিশ্চয়ই। ওটা যদি গরু হয়, তবে ওটা দিয়ে অন্তত পাঁচ শ মানুষের জন্য স্টেক বানানো যাবে!’
‘আরে ধুর! থামো তো! তোমরা আসলেই মজা করছ।’, মা উচ্চ স্বরে হেসে উঠলেন। বাবা আর ছেলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, মুখে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি।
একটু পর বাবাও হাসলেন—একটা শুষ্ক, হালকা হাসি।
‘যা–ই হোক, এখন আর কিছু যায়-আসে না। একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হলো, তারপর ওটা দৌড় দিল। আমরা চমকে গিয়েছিলাম। হয়তো ছায়ার কারণে বড় মনে হয়েছে। একমাত্র যা নিশ্চিত করে বলা যায়, তা হলো ওটা কুকুর বা শূকরের মতো কোনো প্রাণী ছিল না। শরীরটা মস্ত বড় ছিল, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’ ছেলে মাথা নেড়ে চপস্টিকের দিকে নজর দিল, তবে মনে মনে খুশি হতে পারল না।
টেলিভিশনের পর্দায় চলছিল একটা বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান। স্বল্পবসনা ইউরেশীয় এক তরুণী হাত-পা ছুড়ে অদ্ভুত, টানটান কণ্ঠে গান গাইছিল—যেন আরেকটু হলেই চেঁচিয়ে উঠবে। মা আবার উচ্চ স্বরে হেসে উঠলেন।
‘কী হলো?’
‘ওই গায়িকা...তার নাক দিয়ে সর্দি বের হয়ে গেছে!’
‘সর্দি?’
‘আরে ধুর! তুমি তো নিজেই বলছিলে গতকাল—বললে এই মেয়েটা কখনো কখনো এত জোর দিয়ে গান গায় যে ওর নাক দিয়ে পানি বের হয়ে যায়। তখন ভেবেছিলাম, এর চেয়ে হাস্যকর কিছু জীবনে শুনিনি। কিন্তু এইমাত্র দেখলাম ওর নাক দিয়ে পানি পড়ছে। আমি—উঃ, হাসি থামছেই না আমার!’
মা আবার হাসিতে গড়িয়ে পড়লেন।
বাবা ও ছেলে কাষ্ঠহাসি হেসে চোখ নামিয়ে খাবারের দিকে তাকাল।
ইকোন‘আরে ধুর! থামো তো! তোমরা আসলেই মজা করছ।’, মা উচ্চ স্বরে হেসে উঠলেন। বাবা আর ছেলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, মুখে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি।
২.
বাবা সেদিন রাতের প্রায় অর্ধেকটা সময়ই জেগে কাটালেন। স্ত্রী ও ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তিনি কিছুতেই ঘুমোতে পারছিলেন না। উঠে বসার ঘরে গিয়ে বৈদ্যুতিক হিটারের দিকে পা তুলে দিয়ে এক হাতে ভর দিয়ে বসে তিনি ধীরে ধীরে পান করতে থাকলেন। টেলিভিশনটা তখনো চলছিল—সন্ধ্যা থেকেই চালু ছিল। রাতের শেষ খবর চলে এল কিন্তু প্রত্যাশামতোই, তাদের দেখা ছায়াটার বিষয়ে কোনো খবর সেখানে দেখাল না।
আমরা কি তাহলে ওটা কল্পনা করলাম?
পানীয় তাঁর অবসন্ন পেশিগুলোকে ধীরে ধীরে কারখানার শুকনা চামড়ার মতো বানিয়ে দিচ্ছিল। টিভির পর্দার চলমান দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্তত এমনই মনে হচ্ছিল বাবার কাছে।
এভাবেই কখন যেন তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
কে যেন নাক ঝাড়ছে। আস্তে আস্তে সেই শব্দ বাড়তে বাড়তে ঝড়ের গর্জনের মতো হয়ে উঠল। ঠাট্টা নয়। কোনো গায়িকা কোনো দিন এভাবে নাক পরিষ্কার করবে না। কী স্বপ্ন রে বাবা। অর্ধঘুমন্ত, অর্ধজাগ্রত অবস্থায় তাঁর মন আনমনে ঘুরছিল।
তারপর সেই গর্জনের সঙ্গে যোগ হলো নিচু এক গোঙানির মতো আওয়াজ—যেন কোনো বিশাল গুহার ভেতর থেকে ভেসে আসা অকপট মহানিনাদ। আরে, এটা তো সেই গায়িকার কণ্ঠ নয়। কী হচ্ছে এখানে?
চোখ হঠাৎ খুলে গেল তাঁর।
গোঙানির আওয়াজ। ঝড়ের গর্জনের শব্দ এবং এসব শব্দ চলতেই থাকল।
তিনি টেলিভিশনের দিকে তাকালেন। চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই, পর্দায় কেবল ঝিঁঝি শব্দ আর সাদা ঝাপসা আলো। তিনি সেটাকে বন্ধ করে কান পাতলেন।
পৃথিবী বদলে গেছেতারপর সেই গর্জনের সঙ্গে যোগ হলো নিচু এক গোঙানির মতো আওয়াজ—যেন কোনো বিশাল গুহার ভেতর থেকে ভেসে আসা অকপট মহানিনাদ। আরে, এটা তো সেই গায়িকার কণ্ঠ নয়। কী হচ্ছে এখানে?
শব্দটা বাইরে থেকে আসছে।
তিনি পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন।
ছোট্ট বাগানে বিড়ালের মাথার সমান ছোট ছোট এলোমেলো টবে গাছ লাগানো। তার ওপারে পাতাবাহারের বেড়ার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক কালো ছায়া। অন্ধকারে সেই ছায়ার চোখের দৃষ্টি এসে যেন বিদ্ধ করে ফেলছে।
দেখতে কিছুটা গন্ডারের মতোই লাগছিল।
কিন্তু নাকের শিং গন্ডারের চেয়ে তীক্ষ্ণ, মুখ মাংসাশী পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা। আর সেই মুখ থেকে স্টিম ইঞ্জিনের মতো বেরোচ্ছিল ঘন সাদা বাষ্প।
মহিষের মাথার মতো দেখতে মাথাটাই দেহের এক-তৃতীয়াংশ। কপাল থেকে দুদিকে বর্শার মতো উঠে গেছে দুটো দীর্ঘ শিং, কিন্তু মাথা আর ধড়ের মাঝের উঁচু, ঢালের মতো অংশটা বাবা আগে কখনো কোনো প্রাণীর গায়ে দেখেননি।
একটা দরজা খোলার শব্দ হলো।
তিনি পেছন ফিরে দেখলেন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলে পায়জামার ওপর প্যান্ট পরে এসেছে। নিঃশব্দে এক হাত সোয়েটারে গলাতে গলাতে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘ওটা এখানে এসেছে?’ছেলে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ।’
বাবা মাথা নেড়ে ইশারায় বাইরের ছায়ার দিকে দেখালেন।
দৈত্যাকার জন্তুটা শিঙের ডগা দিয়ে দুবার, তিনবার বেড়া আঁচড়াল, তারপর ধীরে ধীরে পাশ ফিরে হাঁটতে লাগল—যেন কোনো ট্যাংক অন্ধকার রাতে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে।
গাঢ় বাদামি পিঠ, পা, আর পায়ের পেছনে মোটা, সরীসৃপের মতো লেজ—এসবই ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টিসীমা পার হয়ে গেল। পুরু চামড়ার নিচে পেশির কম্পন স্পষ্ট।
‘ওটা গরুও নয়, গন্ডারও নয়,’ ছেলে বলল। তার গলা দিয়ে কথা বের হতে চাইছিল না।
‘আমারও তাই মনে হয়। সম্ভবত ওটা একটা ডাইনোসর।’
‘যদি সত্যিই ডাইনোসর হয়, তাহলে আমি বইতে ওটা দেখেছি। খুবই বিখ্যাত এক প্রজাতি। অ্যালোসরাস নয়, স্টেগোসরাস—’
‘মুখটা পাখির ঠোঁটের মতো, কিন্তু তেমন দাঁত আছে কি না, বোঝা গেল না।’
‘ওটার মুখ পাখির ঠোঁটের মতো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে ওটা ট্রাইসেরাটপস! তাই না বাবা? ট্রাইসেরাটপস। তার মানে তিন শিংওয়ালা ডাইনোসর—একটা নাকে, আর দুটো কপালে! এই তো তিনটা হলো!’
‘হ্যাঁ, তাহলে তাই। ট্রাইসেরাটপস।’
দ্য ম্যাথমেটিশিয়ানসগাঢ় বাদামি পিঠ, পা, আর পায়ের পেছনে মোটা, সরীসৃপের মতো লেজ—এসবই ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টিসীমা পার হয়ে গেল। পুরু চামড়ার নিচে পেশির কম্পন স্পষ্ট।দ্য ম্যাথমেটিশিয়ানস
ট্রাইসেরাটপস—ক্রেটাশিয়াস যুগের শেষভাগে, মেসোজোয়িক কালের সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের দানব―আজ থেকে সাত কোটির বেশি বছর আগে যে যুগে রাজত্ব করত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর শিকারি টাইরানোসরাস রেক্স। সেই সময়ে বেঁচে থাকা এবং বেঁচে থাকার জন্য অব্যাহত লড়াই চালিয়ে যাওয়া বিরাট তৃণভোজী প্রাণী ট্রাইসেরাটপস। তার চেয়ে শক্তিশালী বর্ম আর কোনোকালের কোনো প্রাণীরই কখনো ছিল না। সেই ট্রাইসেরাটপস তাদের চোখের সামনে রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছিল।
‘চলো, বাইরে যাই?’
‘চলো!’
বাবা-ছেলে চুপিচুপি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে ঠান্ডা ছিল, কিন্তু বাতাস ছিল না।
দশ মিটার দূরে ট্রাইসেরাটপসের পাহাড়সদৃশ পা দুটো দুলে দুলে এগিয়ে যাচ্ছিল। ওটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল টেলিফোনের খুঁটির মতো পুরু লেজ। বিশাল ঢালের আড়ালে তারা ওটার মুখ দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছিল সাবধানে চলছে ওটা—সামনের পা কিছুটা ভাঁজ করে মাথা নিচু করে সামান্যতম বিপদের জন্যও প্রস্তুত হয়ে চলছে।
শেষমেশ ট্রাইসেরাটপসটা রাস্তাটার শেষ প্রান্তে পৌঁছাল। সামনে একটা পাথরের পাঁচিল, দুই পাশে ইটপাথরের দেয়াল।
ওটা আবার এদিকেই ফিরে আসবে।
বাবা-ছেলে গেটের দুই খুঁটির মধ্যে সরে যেতে গেল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই থমকে গেল তারা—নির্বাক।
ট্রাইসেরাটপসটা থামল না। ওটা পাথরের পাঁচিলে মাথা ঠেলে দিল, আর অবলীলায় ঢুকে গেল পাথরের ভেতর—কাঁধের ঢাল, সামনের পা, পিঠের উঁচু অংশ, পশ্চাদ্দেশ, এমনকি লেজ—ইঞ্চি ইঞ্চি করে শরীরের প্রতিটি অংশ পাথরে মিলিয়ে গেল।
ছায়াভূমি বহির্ভূমিদশ মিটার দূরে ট্রাইসেরাটপসের পাহাড়সদৃশ পা দুটো দুলে দুলে এগিয়ে যাচ্ছিল। ওটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল টেলিফোনের খুঁটির মতো পুরু লেজ।
৩.
সকালে বাবা কাজে যাওয়ার জন্য বের হলেন আর ছেলে স্কুলে যাওয়ার জন্য—একসঙ্গে।
দুজনে চোখাচোখি করে রাস্তার শেষ প্রান্তে থাকা সেই পাথরের পাঁচিলের দিকে হেঁটে গেল। অটল দেয়ালটা দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই।
তারা হাত বুলিয়ে দেখল—কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
চুন-সুরকি লাগানো দেয়ালের গায়ে কিংবা ওপারের বাড়িটার জানালার কাচে কোথাও কোনো দাগও নেই।
‘ডাইমেনশনাল ফাটলের কথা আমি পড়েছি,’ ছেলে বলল।
‘হুম। কিন্তু সেসব তো তত্ত্ব মাত্র।’
‘তত্ত্ব?’
‘মানে, যেসব জিনিস আছে কি নেই, প্রমাণ করা যায় না, সেগুলোকে তত্ত্ব বলা হয়।’
‘তাহলে কি ডাইমেনশনাল ফাটল বলে কিছু নেই?’
‘কেউ একজন ওটা ভেবে বের করেছে। হয়তো আছে, হয়তো নেই। যদি ধরা হয় আছে, তাহলে এই দেয়ালের পৃষ্ঠটা নিশ্চয়ই ওই ফাটল বরাবর পড়েছে। আমাদের পৃথিবী আর ট্রাইসেরাটপসের সাত কোটি বছর পুরোনো পৃথিবীর মাঝের ফাটল বরাবর। তবে আসলে এটাকে তুমি চাইলে যেভাবে খুশি ব্যাখ্যা করতে পারো।’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো—হয়তো আমাদের এই পৃথিবী আর ট্রাইসেরাটপসের পৃথিবী আসলে একই সঙ্গে বর্তমান। মাঝেমধ্যে ফাটল দিয়ে কেউ ঢুকে পড়ার বদলে বরং আমরা হয়তো একটু সময়ের পার্থক্যে পড়ে আছি। তাই আমরা কোনো এক কারণে ওদের দুনিয়ায় উঁকি দিতে পারি, আর ওরাও আমাদের দেখতে পায়। তখন পার্থক্যটা খুব সামান্য হবে—মাত্র এটুকুই।’
‘হ্যাঁ?’
‘আজ সকালেই যখন ঘরে এক রকম ভারী, উষ্ণ, জান্তব গন্ধ পেলাম, তখন থেকেই ভাবতে শুরু করেছিলাম। আসলে এটাই প্রথম নয়। অন্তত দু-তিন মাস ধরে এ রকম হচ্ছে। এখানে যারা থাকে, তারাও নিশ্চয়ই একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।’
‘তাহলে ট্রাইসেরাটপসটা ওদের বাড়ির ভেতর দিয়ে ঢুকে গেছে?’
‘এই তো বুঝেছ এখন।’
‘তাহলে ওরাও কি আমাদের মতোই সেটা দেখতে পায়?’
জুয়ি'আমাদের পৃথিবী আর ট্রাইসেরাটপসের সাত কোটি বছর পুরোনো পৃথিবীর মাঝের ফাটল বরাবর। তবে আসলে এটাকে তুমি চাইলে যেভাবে খুশি ব্যাখ্যা করতে পারো।’
‘সেটা সম্ভব। কিন্তু জানোই তো মানুষের মন কেমন—আমরা যা বিশ্বাস করি না, তা অস্বীকার করতে চাই। এটা একরকম আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি। তাই যদি কোনোভাবে তেমন কিছু দেখেও ফেলি বা টেরও পাই, আমরা নিজের অজান্তেই সেটাকে উপেক্ষা করে ফেলি। দেখি না, ভাবি না—এভাবেই নিজেকে বাঁচাই। দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার যদি আবার দেখি, তখন আমাদের সাধারণ বোধবুদ্ধি এসে বলে—‘ধুর, আজেবাজে কল্পনা!’—হেসে উড়িয়ে দিই। ব্যস, ব্যাপার শেষ।’
‘কিন্তু যদি এরপরও বন্ধ না হয়?’
‘তাহলে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলতে করে। তার পক্ষে তখন আর সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখা সম্ভব হয় না।’
ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, তারপর হেসে ফেলল।
‘কী এমন মজার কথা ভাবছ?’
‘তেমন কিছু না। মায়ের কথা ভাবছিলাম। আমি তো কাল রাতে কী দেখেছি, মাকে কিছুই বলিনি। বললে কী হাল হতো তুমি বুঝতে পারছ?’
বাবাও হেসে ফেললেন।
‘বললে তোমার কপালে দুঃখ ছিল! অবশ্য ও নিজে না দেখে থাকলে আরকি।’
‘তাহলে আমার বন্ধুবান্ধবকেও তো বলতে পারব না।’
‘তা তো বলাই বাহুল্য। চলো এখন, বাড়ি ফিরে পরে এ নিয়ে কথা বলা যাবে।’
বাবা-ছেলে হাঁটতে লাগল।
মাঝেমধ্যে কথা বলতে লাগল, হাসাহাসি করতে লাগল।
পথে যতবারই কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হলো—
‘সুপ্রভাত!’
‘সুপ্রভাত!’
সব দিকে প্রাণবন্ত শুভেচ্ছা ছড়িয়ে যেতে লাগল।
মহামান্য ভার্নিসের দ্বিতীয় থিওরিদেখার বাইরে অনুভব করার মতোও অনেক কিছু ছিল—পশুর মতো গন্ধ, নিচু গর্জন। শীতল সকালের হিমেল বাতাসে দৌড়ে ট্রেন ধরতে যাওয়ার সময় অসম্ভব সব ফুলের পরাগরেণুতে দম আটকে আসত।
৪.
এর পর থেকে প্রায়ই ডাইনোসর দেখতে পেত তারা।
সন্ধ্যায় আকাশের দিকে তাকালে কখনো কখনো বিশাল ডানাওয়ালা টেরানোডনের মতো একটা প্রাণীর ছায়ামূর্তি আকাশজুড়ে উড়ে যেতে দেখত তারা। তবে মাটিতে শুধু ট্রাইসেরাটপসই দেখত।
সম্ভবত তাদের এলাকার পরিবেশ ওই প্রাণীদের জন্যই সবচেয়ে উপযুক্ত। গ্যারেজে শুয়ে থাকা ডাইনোসরের মাথা গাড়ির সঙ্গে এমনভাবে মিলে যেত যেন শিংওয়ালা কোনো অদ্ভুত গাড়ি হাস্যকরভাবে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা শিশুর মাথার ওপর দিয়ে পেরিয়ে যেত বিশাল দেহ। সবই শুধু ট্রাইসেরাটপস।
মাঝেমধ্যে বাবা-ছেলে ওগুলোকে দিনের বেলাও রাস্তা পার হতে দেখত—যদিও স্বচ্ছ, প্রায় ছায়ার মতো লাগত দেখতে।
দেখার বাইরে অনুভব করার মতোও অনেক কিছু ছিল—পশুর মতো গন্ধ, নিচু গর্জন। শীতল সকালের হিমেল বাতাসে দৌড়ে ট্রেন ধরতে যাওয়ার সময় অসম্ভব সব ফুলের পরাগরেণুতে দম আটকে আসত। রাতভর মেয়ে ট্রাইসেরাটপসের সঙ্গীকে ডাকা গম্ভীর বাঁশির মতো গর্জন শোনা যেত।
তুমি আর তোমার বাবা তো এখন অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছ। কী চলছে বলো তো?
মা কখনো কখনো এভাবে জিজ্ঞাসা করতেন। ছেলে কেবল হাসত।
‘কিছু না, এমনি।’ এর বেশি কিছু সে বলত না।
এমনই আরেক রোববার সন্ধ্যায় তারা সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিল। তবে সেই প্রথম ট্রাইসেরাটপস দেখার দিনের মতো এত দূর যায়নি। টিলার ওপরের গাছগুলো পেরিয়ে তাদের এলাকার সামনে এসে ওপর থেকে তাকিয়ে তারা থমকে গেল—কিছু বলতে পারল না, নড়তেও পারল না।
মায়াসন্ধ্যায় আকাশের দিকে তাকালে কখনো কখনো বিশাল ডানাওয়ালা টেরানোডনের মতো একটা প্রাণীর ছায়ামূর্তি আকাশজুড়ে উড়ে যেতে দেখত তারা। তবে মাটিতে শুধু ট্রাইসেরাটপসই দেখত।
পুরো শহরের প্রতিটি বাড়ির ওপরে যেন একটা করে ট্রাইসেরাটপস জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে। পারদবাতির আলোয় ঝলমলে সবুজ চামড়া শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দে ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। কখনো কখনো একটা সরু ফাঁক করে চোখ খুলছে, আর তখন সেই চোখে ঝলক দিচ্ছে গাঢ় গোলাপি দীপ্তি—সম্ভবত কুমিরদের চোখে থাকা রোডপসিন নামক রঞ্জকের মতো কোনো পদার্থের জন্য।
এ যেন স্বপ্নের মতো দৃশ্য—যেন বিশাল বিশাল জোনাকির ঝিকিমিকি।
‘ওপারের জায়গাগুলোও কি আমাদের শহরের মতোই?’
‘হয়তো ওরাও আমাদের মতোই আমাদের এই এলাকা দেখতে পায়, টের পায়। হয়তো একটু তাপের আশায় ওভাবে গিয়ে বসেছে।’
‘তা হতে পারে।’
‘অদ্ভুত না? সবাই এক একটা ডাইনোসরের পেট থেকে বের হয়ে স্কুল বা কাজে যাচ্ছে, আবার সেই পেটে ফিরে আসছে, খাচ্ছে, টিভি দেখছে।’
‘তা-ই তো হচ্ছে।’
‘আরে, আমার ঘরটা ওর বাথরুমের রাস্তায় পড়েছে।’
‘এত কষ্ট পেয়ো না।’
‘তবু ব্যাপারটা খুব শান্তিপূর্ণ, তাই না? দেখতে দশাসই হলেও আমি কখনো কোনো ট্রাইসেরাটপসকে লড়তে দেখিনি।’
‘এমনকি দৌড়াতেও দেখিনি।’
‘একটা ছাড়া, যেটা আমরা প্রথম দেখেছিলাম অন্য শহরে।’
‘ওটা তখন কেন দৌড়াচ্ছিল কে জানে।’
‘যা–ই হোক, আজ তো সব বেশ শান্তিপূর্ণ।’
‘শান্তির চেয়ে বড় কিছু নেই।’
বিপ্লবকখনো কখনো একটা সরু ফাঁক করে চোখ খুলছে, আর তখন সেই চোখে ঝলক দিচ্ছে গাঢ় গোলাপি দীপ্তি—সম্ভবত কুমিরদের চোখে থাকা রোডপসিন নামক রঞ্জকের মতো কোনো পদার্থের জন্য।
৫.
কিন্তু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না।
একদিন বাতাসে উড়ে আসা হলুদ বালুতে আকাশ ছেয়ে গেল, সূর্য রক্তাভ হয়ে উঠল—দিনটি শুষ্ক, অপ্রীতিকর হয়ে উঠল।
সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে ছেলেটা পাহাড়ের মাথা থেকে জাতীয় সড়কের দিকে তাকিয়ে দেখল ডজনখানেক ডাইনোসর ধুলার ঝড় তুলে উটপাখির মতো অদ্ভুত দুই পায়ে দৌড়াচ্ছে—লম্বা লেজ উঁচু হয়ে আছে।
‘ওগুলো নিশ্চয়ই টাইরানোসরাস! বিশাল মোটা পেছনের পা, আর সামনে খুদে খুদে হাত—যেন এমনি লাগানো। সুচালো মুখ। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই টাইরানোসরাস। আর ওগুলো দৌড়ে যাচ্ছিল ভয়ানক গতিতে। অন্তত স্টেশন পর্যন্ত এসেছে নিশ্চয়ই।’
‘আমরা তো স্টেশনের কাছেই থাকি, কিন্তু আমি তো কোনো টাইরানোসরাসের আভাস পাইনি। গ্যারেজের ট্রাইসেরাটপসটাও বরাবরের মতো কেবল চোখ খুলে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।’
‘কিন্তু আমি তো সত্যিই ওদের দেখেছি।’
‘হয়তো ওরা শহরের ভেতর দিয়ে ছুটে অন্য কোথাও চলে গেছে?’
‘কিন্তু কেন? ওরা স্টেশনের কাছে গিয়েই চোখের আড়াল হয়ে গেল।’
‘হুম।’
বাবা হাত ভাঁজ করে বুকে রাখলেন।
‘তাহলে এখনো ওরা হয়তো কোথাও কাছাকাছি আছে। কিংবা...’
‘চলো দেখে আসি,’ ছেলে বলল।
‘আবার কোনো মতলব আছে তোমাদের, তাই না?’
পেছন থেকে মা চিৎকার করলেন। বাবা-ছেলে হেসে হাত নেড়ে সাইকেলে চড়ে বসল।
তারা স্টেশন পর্যন্ত গেল, কিন্তু টাইরানোসরাসের কোনো চিহ্ন খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ স্টেশনের চত্বরে নজর রেখে তারা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরল।
স্টেশনের কাছ দিয়ে একটা ছোট্ট খাল বয়ে গেছে―পুরোপুরি কংক্রিট দিয়ে ঢাকা। তার ওপরে একটা খেলার মাঠ বানানো হয়েছিল। এই ঢেকে রাখা ড্রেনটাই যেন আরেকটা রাস্তার মতো, যা প্রায় তাদের এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
‘চলো, এই পথে ফিরে যাই।’
বাবা-ছেলে ধীরে ধীরে কংক্রিটের স্ল্যাবের ওপর দিয়ে সাইকেল চালাতে লাগল। প্রতিবার স্ল্যাবের ফাঁক পেরোনোর সময় চাকাগুলো ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে উঠছিল।
তাদের হেডলাইটের আলো এদিক-সেদিক দুলছিল।
রক্ষক‘আমরা তো স্টেশনের কাছেই থাকি, কিন্তু আমি তো কোনো টাইরানোসরাসের আভাস পাইনি। গ্যারেজের ট্রাইসেরাটপসটাও বরাবরের মতো কেবল চোখ খুলে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।’
হঠাৎই তারা এক অদ্ভুত শব্দ খেয়াল করল—জল ছুটে চলার ছপছপ শব্দ, আর তার চেয়ে আরেকটু নিচু অসংখ্য শূকরের গোঁ গোঁ আওয়াজের মতো। একমুহূর্ত পরেই তারা টের পেল মাটি কাঁপছে।
চট করে তারা নিচের দিকে তাকাল। ছুটে গেল বাতাস চলাচলের গর্তের ধাতব ঢাকনার দিকে।
ধাতব ঝাঁঝরির নিচ দিয়ে সেই প্রাণীগুলো জল ছিটিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। গায়ে আলো পড়ে ভেজা চামড়া চকচক করছিল; গলা সামনে বাড়ানো। একের পর এক টাইরানোসরাস দৌড়ে যাচ্ছিল তাদের এলাকার দিকেই, যেন এক অন্তহীন কনভেয়ার বেল্ট।
ওগুলো জলের ধারা অনুসরণ করছিল। বড় রাস্তার ধারে যেগুলোকে দেখা গিয়েছিল, সেগুলো ছিল মূল দলের মাত্র একটা বিচ্ছিন্ন অংশ। স্টেশনের কাছে এসে সেগুলো মিশে গেছে মূল বাহিনীর সঙ্গে।
‘খারাপ ব্যাপার।’
ছুটে গেলেও কোনো লাভ হতো না, তবু বাবা-ছেলে দুজনে মরিয়া হয়ে প্যাডেল মারতে লাগল।
তাদের এলাকার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখা গেল কংক্রিটের স্ল্যাব ভেদ করে কাদামাটির প্রস্রবণের মতো অসংখ্য টাইরানোসরাস ওপরে উঠে আসছে।
পাহাড়ি ঢালে থাকা সারি সারি বাড়ির ছাদ যেন দুলে উঠে নড়তে শুরু করল।
ট্রাইসেরাটপসগুলো উঠতে শুরু করেছে।
লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
তাদের চোখের সামনেই মাথা নিচু করে একটা ট্রাইসেরাটপস ধেয়ে গিয়ে এক টাইরানোসরাসের গলার ধমনিতে শিং ঢুকিয়ে দিল। রক্ত যেন দমকলের পাইপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। আহত শিকারি পশ্চাদপসরণ করল, লেজ ঝাপটাল, তারপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল, সামনের পায়ের চাবি আকৃতির নখের এক ঝটকায় ট্রাইসেরাটপসটার চোখ উপড়ে নিল।
তাদের বাড়ি থেকে মাত্র ছয় মিটার দূরে ধরাশায়ী হওয়া সেই বিশাল দেহের ওপর আরও তিনটা টাইরানোসরাস ঝাঁপিয়ে পড়ল। নখের টানে ইতিমধ্যেই ফালা ফালা হয়ে যাওয়া পেটের মাংস ধারালো দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। চারপাশ ভরে উঠল ঘন গাঢ় রক্তের স্রোতে।
‘ওটা আমাদের ট্রাইসেরাটপস না?’ কাঁপা কণ্ঠে চিৎকার করল ছেলেটা।
‘হ্যাঁ।’
বাড়ির গেটের সামনেই পড়ে ছিল একটা টাইরানোসরাস। বাবা-ছেলে সতর্ক চোখে সেটার বিরাট রক্তাভ চোখ আর কেঁপে কেঁপে ওঠা পেটের দিকে নজর রেখে সাইকেল চালাতে চালাতে নিজেদের ড্রাইভওয়েতে ঢুকে পড়ল।
পুরো রাত ধরে চলল লড়াই।
টেলিভিশনের গানবাজনার উচ্চ হাসির মধ্যেও বাবা-ছেলে শুনতে পাচ্ছিল যুদ্ধের ডাক, গায়ের চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ, মৃত্যুর মুহূর্তের আর্তনাদ।
ফিজিকস টিচারতাদের চোখের সামনেই মাথা নিচু করে একটা ট্রাইসেরাটপস ধেয়ে গিয়ে এক টাইরানোসরাসের গলার ধমনিতে শিং ঢুকিয়ে দিল। রক্ত যেন দমকলের পাইপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল।
ভোরবেলায় লড়াই প্রায় থেমে এসেছিল। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল অগণিত ট্রাইসেরাটপস আর টাইরানোসরাসের মৃতদেহ, কোনো কোনোটার লেজের ডগা তখনো কাঁপছিল, কোনো কোনোটা নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়া পেট টেনেহিঁচড়ে চলছিল।
প্রায় সব ট্রাইসেরাটপসই মারা গেছে বীভৎসভাবে—পেট আঁচড়ে ছিঁড়ে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হয়েছে, পাঁজর বের হয়ে আছে, গলার ঢাল চিরে ফাল ফালা করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ টাইরানোসরাসের গলায় বা পেটে কেবল গভীর ছিদ্র। সেগুলোর দেহ কিন্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি।
কয়েকটা বেঁচে ছিল, তবে অক্ষত নয়। সব কটিরই শক্তি ফুরিয়ে গেছে—আর লড়ার ক্ষমতা নেই।
ঊরু থেকে পায়ের বাকিটা কিমার মতো হয়ে যাওয়া একটা টাইরানোসরাস তখনো সেটার শিকার করা একটা ট্রাইসেরাটপসের পেটের নাড়িভুঁড়ি টেনে খাচ্ছিল।
সেটার পেছনে পড়ে ছিল সেটার এক সঙ্গীর মৃতদেহ। গলায় এফোঁড়–ওফোঁড় ছিদ্র, দেহজুড়ে শুকনা রক্ত। আর মাত্র পাঁচ মিটার দূরেই একটা ট্রাইসেরাটপস ঘাস খাচ্ছিল নিঃশব্দে—সেটার এক চোখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল।
মাঝেমধ্যে সেই টাইরানোসরাসটা মাথা তুলে বিষণ্ন দৃষ্টিতে―নাকি সেটা তাদের কল্পনা?―ট্রাইসেরাটপসটার দিকে তাকাচ্ছিল।
তোরা যদি ওই জিনিসই খাবি, তবে আমাদের মারলি কেন?
বাবা-ছেলের মনে হচ্ছিল যেন সেটার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে।
খাওয়ার জিনিস এত থাকতেও বারবার আমাদের খুন করিস কেন?
ট্রাইসেরাটপসের অক্ষত চোখে যেন সেই প্রশ্ন জ্বলছিল।
বাবা-ছেলে ধীরে ধীরে স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগল। যেসব লাশ থেকে রক্ত ঝরছিল না সেগুলোকে সহ্য করা যাচ্ছিল। কিন্তু রাস্তাজুড়ে একটা টাইরানোসরাসের পুরো বৃহদন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে আছে দেখে মনে হচ্ছিল, ফেটে যাওয়া পেট থেকে ছিটকে বের হয়েছে—তারা সেখানে থেমে দাঁড়াতে বাধ্য হলো। একটু চুপ করে থেকে রাস্তার পাশ দিয়ে পার হলো।
বাহারি সাদা প্যান্ট পরা একজন নারী বাবা-ছেলের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে চেয়ে সেই রক্তমাখা দৃশ্যের ভেতর দিয়ে জুতা ঠকঠক করে হেঁটে চলে গেল।
কেজি স্কুলের বাচ্চাভর্তি একটা মাইক্রোবাস সেই দৃশ্যের ভেতর দিয়ে চলে গেল। ভেতর থেকে প্রাণবন্ত কোলাহল ভেসে এল।
প্রাইমারি স্কুলের একটা বাচ্চা গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে সেই দৃশ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেল।
আকাশে নাচে শালিক।
আকাশে রাজত্ব করেন ঈশ্বর।
পৃথিবী, এই পৃথিবী—তুচ্ছ এক খেলা।







