বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পর্বত জয়ের ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন নির্মল পুরজা। মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত জয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন পর্বতারোহণ বিশ্বকে।

সেই নেপালি পর্বতারোহী ও সাবেক ব্রিটিশ বিশেষ বাহিনীর সদস্য নির্মল পুরজা আর নেই। পাকিস্তানের ব্রড পিকে তুষারধসে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর।

শনিবার (১ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পুরজার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এলিট এক্সপেডিশন। বিবৃতিতে বলা হয়, ৩০ জুলাই ব্রড পিকে অভিযানের সময় তুষারধসে নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা প্রাণ হারিয়েছেন। একই ঘটনায় অভিযানের আরও কয়েকজন সদস্যও মারা গেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পাকিস্তানের পর্বতারোহণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তুষারধসের পর থেকে ওই দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। নেপালের সংসদ সদস্য ও পুরজার ব্যবসায়িক অংশীদার মিংমা গিয়াবু শেরপা জানান, ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী তুষারধসের পর পুরজার অবস্থান বদলে গিয়েছিল। প্রথমে তাকে নিচের দিকে ভেসে যেতে দেখা যায়, পরে সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যাওয়া স্থান থেকেও অবস্থান পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায়।

‘নিমসদাই’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি

নেপাল ও আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ অঙ্গনে ‘নিমসদাই’ নামে পরিচিত ছিলেন পুরজা। ২০১৯ সালে তিনি শুরু করেন ‘প্রজেক্ট পসিবল’। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত সাত মাসের মধ্যে জয় করা।

কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়েরও আগে সেই লক্ষ্য পূরণ করেন। মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে ১৪টি পর্বত জয় করে আগের রেকর্ডের চেয়ে সাত বছরেরও বেশি সময় কমিয়ে দেন।

পুরজা মনে করতেন, দৃঢ় সংকল্প থাকলে মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব কাজও সম্ভব। নিজের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ ও ইতিবাচক মানসিকতাকেও তিনি সাফল্যের বড় কারণ হিসেবে দেখতেন।

গুর্খা থেকে বিশেষ বাহিনীতে

১৯৮৩ সালের ২৫ জুলাই নেপালের মিয়াগদি জেলার দানা গ্রামে জন্ম পুরজার। তার বেড়ে ওঠার বড় অংশ কেটেছে চিতওয়ানে।

পুরজার পরিবারে সামরিক চাকরির দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। তার বাবা ও তিন বড় ভাই নেপালের গুর্খা রেজিমেন্টে কাজ করেছেন। তিনিও সেই পথ অনুসরণ করেন।

প্রায় ১৬ বছরের সামরিক জীবনে তিনি ছয় বছর ব্রিটিশ গুর্খা বাহিনীতে কাজ করেন। পরে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির বিশেষ বাহিনী স্পেশাল বোট সার্ভিসে (এসবিএস) যোগ দেওয়া প্রথম নেপালি হন তিনি।

এসবিএসের মাউন্টেন ইউনিটে চরম ঠান্ডা পরিবেশে যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ হিসেবেও কাজ করেন পুরজা। সামরিক ও পর্বতারোহণে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাকে মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (এমবিই) সম্মানে ভূষিত করা হয়।

চাকরি, পেনশন ও বাড়ি বিক্রি করে শুরু অভিযান

২০১৯ সালের ১৪টি আট-হাজারি পর্বত জয়ের অভিযানের জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন পুরজা। তিনি স্পেশাল বোট সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে দেন, সামরিক পেনশন ত্যাগ করেন এবং যুক্তরাজ্যে নিজের বাড়ি বিক্রি করেন।

তখন তিনি বলেছিলেন, এই উচ্চগতির অভিযানে কেউ বিশ্বাস করেনি যে তিনি সফল হতে পারবেন। অভিযান শুরু করার সময় অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

পুরজার পর্বতারোহণের শুরুটাও ছিল অন্যদের মতো নয়। ২০১২ সালে সাধারণভাবে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার মধ্যে পাহাড় জয়ের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। পরে সেই আগ্রহই তাকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত পর্বতারোহীতে পরিণত করে।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট

এমএসএম