বিদেশে উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশের অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। কেউ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষা রাখেন, কেউ উন্নত গবেষণার সুযোগ খোঁজেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চান। নিঃসন্দেহে এটি একটি সম্ভাবনাময় সিদ্ধান্ত। তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো নানা ভুল ধারণা, অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা ও অসম্পূর্ণ তথ্য প্রচলিত রয়েছে।

অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই ভিসা নিশ্চিত বা ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা দেখালেই সব শর্ত পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উচ্চশিক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা এবং নিজের প্রোফাইলের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন।

বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনার শুরুতে শুধু কোন দেশে ভিসা সহজ—এই প্রশ্নকে পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি করা ঠিক নয়। বরং ভাবতে হবে নিজের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অনুযায়ী কোন দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স সবচেয়ে উপযুক্ত। পূর্ববর্তী পড়াশোনা, কাজের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনার মধ্যে যৌক্তিক ধারাবাহিকতা থাকা ভালো। যেমন, ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী যদি বিপণন নিয়ে কাজ করেন এবং একই ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা নিতে চান, তবে তা স্বাভাবিক। তবে হঠাৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলে তার পেছনে উপযুক্ত কারণ ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকতে হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভিসা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তারা শুধু প্রোফাইল মূল্যায়ন, উপযুক্ত কোর্স নির্বাচন ও আবেদন প্রস্তুত করতে সহায়তা করতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের। তাই ‘শতভাগ ভিসা নিশ্চিত’ জাতীয় প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকা উচিত। একজন পেশাদার পরামর্শকের দায়িত্ব প্রয়োজনে শিক্ষার্থীকে সঠিক ঝুঁকির কথা জানানো এবং অপূর্ণাঙ্গ প্রোফাইলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।

আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেখানোই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থের বৈধ উৎস এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচ বহনের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। টিউশন ফি, বাসস্থান, খাবার ও যাতায়াত ব্যয়ের একটি বাস্তবসম্মত বাজেট আগে থেকে তৈরি করা আবশ্যক। পার্টটাইম কাজকে পুরো শিক্ষাজীবনের আর্থিক ভিত্তি হিসেবে ধরা ঝুঁকিপূর্ণ।। খণ্ডকালীন কাজ অতিরিক্ত সহায়তা হতে পারে, তবে পুরো শিক্ষাজীবনের মূল ভিত্তি তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

পুরো দায়িত্ব কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীকে নিজেকেও প্রস্তুত করতে হবে। নিজস্ব কোর্স, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পড়াশোনা শেষে সংশ্লিষ্ট দেশে বা দেশে ফিরে সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা প্রয়োজন। ভিসা সাক্ষাৎকারে মুখস্থ উত্তরের চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তের যৌক্তিক কারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা কোনো ভাগ্যের খেলা নয়, আবার অসম্ভব কোনো স্বপ্নও নয়। কতজন বিদেশে গেল তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন সঠিক কোর্স ও সঠিক তথ্য নিয়ে যেতে পারল। সঠিক প্রোফাইল মূল্যায়ন, উপযুক্ত কোর্স নির্বাচন, বাস্তবসম্মত আর্থিক পরিকল্পনা এবং সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার লক্ষ্য থাকলে এটি হতে পারে জীবনের অন্যতম সেরা বিনিয়োগ। তাই সহজ উপায়ের খোঁজে না হেঁটে, নিজের মেধা ও ভবিষ্যতের জন্য কোন পথটি সত্যিই সঠিক—তা নির্ধারণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সৈয়দ মাহমুদ মুসা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমএমএস গ্লোবাল সার্ভিসেস)