‘এআই কনট্রোলড রোবোটিক অটোমেশন ইন হেলথ কেয়ার’ নামের প্রকল্পের ভাবনাটি তৈরি করেছে সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী। দুই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তৈরি এই উদ্ভাবনী প্রকল্পে সাশ্রয়ী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা (ইকোসিস্টেম) উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে রয়েছে ইএসপি-৩২ সমন্বিত স্ট্রোক পুনর্বাসন (রিহ্যাবিলিটেশন) গ্লাভ এবং ভয়েস ও জেসচার-নিয়ন্ত্রিত অভিযোজিত (অ্যাডাপ্টিভ) বায়োনিক আর্ম, যা থেরাপিভিত্তিক চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করবে।

স্মার্ট গ্লাভটি অনুশীলনের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে একটি কেন্দ্রীয় ওয়েব প্ল্যাটফর্মে পাঠায়। এর মাধ্যমে চিকিৎসকেরা রোগীকে বারবার হাসপাতালে বা চেম্বারে না ডেকেই তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দূর থেকেই থেরাপির নির্দেশনা পরিবর্তন করতে পারবেন। অন্যদিকে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বায়োনিক আর্মটি রোগীর স্বাভাবিক নড়াচড়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। ফলে ঘরে বসেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সাশ্রয়ী সহায়ক সেবা পাওয়া সম্ভব হবে।

উদ্ভাবকদের ভাষ্য, সাশ্রয়ী আইওটি প্রযুক্তি ও অভিযোজিত রোবোটিকসের সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থা হাসপাতালের বেডের ওপর নির্ভরতা কমাতে, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যয় কমাতে এবং ব্যয়বহুল ক্লিনিকভিত্তিক সেবার পরিবর্তে রোগীর নিজস্ব পরিবেশেই কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

সারা দেশে তিন ধাপে আয়োজিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’-এ সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই উদ্ভাবনী ভাবনাটি দেশসেরা নির্বাচিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ধারণা, বিজ্ঞান প্রকল্প ও স্টার্টআপ আইডিয়া তৈরি করে আরও নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী দলসেরা হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে।

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০টি দলের প্রত্যেক শিক্ষার্থী ২০ হাজার টাকা ও সনদ পেয়েছে। বিজয়ী প্রতিটি দলের শিক্ষক পেয়েছেন ৩০ হাজার টাকা ও সনদ। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসব উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দলে তিনজন শিক্ষার্থী ও দুজন শিক্ষক ছিলেন।

আজ সোমবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বিজয়ী অন্য ৯ প্রতিষ্ঠান

‘স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম’ ধারণা তৈরি করে দ্বিতীয় হয়েছে মেহেরপুরের সন্ধানী স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যোগাযোগ সহজ করতে ‘নিউরোসাইন’ ধারণা তৈরি করে তৃতীয় হয়েছে দিনাজপুর সরকারি কলেজ। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতের ইশারাকে তাৎক্ষণিকভাবে বোধগম্য ভাষায় এবং সাধারণ মানুষের কথাকে তাৎক্ষণিকভাবে ইশারা ভাষার ছবিতে রূপান্তর করা যায়। ‘নেক্সজেন অ্যাগ্রিকালচার’ প্রকল্পের ধারণা তৈরি করে চতুর্থ হয়েছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান প্রদর্শনীর স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য অতিথিরাও ছিলেন। ২৯ জুন

এ ছাড়া বিভিন্ন উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করে পঞ্চম হয়েছে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ষষ্ঠ নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের শরীফাবাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সপ্তম চট্টগ্রামের ফুলকি সহজপাঠ বিদ্যালয়, অষ্টম কুষ্টিয়া জিলা স্কুল, নবম নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং দশম হয়েছে পটুয়াখালীর গলাচিপা নতুন জামে মসজিদ-সংলগ্ন আলিয়া মাদ্রাসা।

তিন ধাপে শেষ হলো প্রতিযোগিতা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো এ আয়োজন করা হয়। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতাটি উপজেলা বা থানা, জেলা এবং জাতীয়—এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শেষ হলো কিশোর ও তরুণদের মেধা, বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্যোক্তা চিন্তার এক প্রাণবন্ত উৎসব।

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ১২ জুন দেশের ৫২১টি উপজেলা ও মহানগরীর শিক্ষা থানায় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৮ হাজার ২৯টি দলে ২৭ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী এবং ১৬ হাজার ৫৮ জন শিক্ষক অংশ নেন। পরে উপজেলা থেকে নির্বাচিত ৫৪৬টি দল ১৪ জুন জেলা পর্যায়ে অংশ নেয়। সেখান থেকে বাছাই হয়ে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বে আসে ১০১টি দল।

অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ২৯ জুন

জাতীয় পর্যায়ে গতকাল রোববার প্রদর্শনী ও বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার হয় চূড়ান্ত প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ। এতে জেলা ও মহানগর পর্যায় থেকে নির্বাচিত ১০১টি দল তাদের উদ্ভাবনী ধারণা, বিজ্ঞান প্রকল্প ও স্টার্টআপ উপস্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্যান্য অতিথি প্রদর্শনীর স্টলগুলো ঘুরে দেখেন।

এর আগে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশের মাধ্যমিক স্তরের ২৯ হাজার ৬২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি ফলদ, একটি বনজ ও একটি ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় যোগ দেন।

‘তোমরা বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে যাবে’

সমাপনী অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা এবং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের কোনো একটা কাজের আউটপুট থাকতে হবে; যেটা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে সামনে টেনে নিয়ে যাবে।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দেন। ২৯ জুন

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা যা করতে চাচ্ছি, কমবেশি যেটাই করতে চাচ্ছি, সবকিছু তোমাদের ঘিরে।...তোমরা বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে যাবে। তোমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে।’

অনুষ্ঠানে বিজয়ী প্রতিটি দল থেকে একজন শিক্ষার্থী নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।

অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন।