বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে উদ্যোগ নিতে চান এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখেন, তাহলে শুধু এই অদম্য আগ্রহটুকুই তাঁকে এসএমই ফাউন্ডেশনের সেবা পাওয়ার যোগ্য করে তোলে। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক এসএমই দিবস উপলক্ষে দেশের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি এই খাত ও এসএমই ফাউন্ডেশনের অবদান উল্লেখযোগ্য।
উদ্যোক্তা তৈরিতে ফাউন্ডেশন
নতুন যাঁরা ব্যবসা শুরু করতে চান, তাঁদের পথপ্রদর্শন করতে ফাউন্ডেশনের রয়েছে ‘নতুন উদ্যোক্তা তৈরি’, ‘নতুন ব্যবসা সৃষ্টি’ ও ‘এসো উদ্যোক্তা হই’-এর মতো দারুণ সব কর্মসূচি। এখান থেকে একজন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা তাঁর ব্যবসার পরিকল্পনা, চ্যালেঞ্জ ও প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান।
যাঁরা অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করেছেন, কিন্তু নিজস্ব অফিস বা বসার জায়গা নেই, তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা। ফাউন্ডেশনের ইনকিউবেশন সেন্টারে তাঁরা পাচ্ছেন ডেস্ক, ইন্টারনেটসহ কম্পিউটার ব্যবহারের সুবিধা, সফল উদ্যোক্তাদের কারখানা পরিদর্শন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ।
ডিজিটাল বিপণন ও অর্থায়নের মেলবন্ধন
পণ্য উৎপাদন করলেই তো আর হবে না, তা ক্রেতার কাছে পৌঁছানো চাই। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল মার্কেটিং, ফেসবুক মার্কেটিং, ওয়েবসাইট তৈরি ও ক্যাটালগ ডিজাইনের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। এই বাধা দূর করতে এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি এবং ব্যাংকারদের সঙ্গে ম্যাচমেকিংয়ের সুবিধা দিচ্ছে। ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার ২৫ শতাংশই পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা।
মেলা ও বাজারের পরিধি বিস্তার
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের পরিধি বাড়াতে পণ্যের ডিজাইন উন্নয়ন ও বহুমুখীকরণ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় এসএমই পণ্য মেলায় প্রায় ৪ হাজার এবং ৯৫টি আঞ্চলিক ও বিভাগীয় মেলায় প্রায় ৫ হাজার ব্যক্তি উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন।

উদ্যোক্তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে এ পর্যন্ত ৬৩ জন সফল উদ্যোক্তাকে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ৩৫ জন নারী, ২৭ জন পুরুষ ও ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা রয়েছেন। এ ছাড়া রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রস্তুত হলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সহায়তায় আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগও করে দিচ্ছে ফাউন্ডেশন।
ক্লাস্টার উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ছোঁয়া
২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় দেশে ১৭৭টি ‘এসএমই ক্লাস্টার’ চিহ্নিত করা হয়। ইতিমধ্যে প্রায় ১০০টি ক্লাস্টারের চাহিদা নিরূপণ করে জুতা, ফাউন্ড্রি, অগ্নিনিরাপত্তা, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
দেশের প্রথম কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি)
রাজশাহীর কালুহাতি পাদুকা ক্লাস্টারে দেশের প্রথম কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি) স্থাপন করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। বর্তমানে আরও কয়েকটি ক্লাস্টারে এই সুবিধা চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ৭০টি প্রতিষ্ঠানে কাইজেন ও এনার্জি এফিসিয়েন্সি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ৩৭টি প্রতিষ্ঠান আইএসও সনদ অর্জন করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘এসএমইএফ সাপ্লায়ার্স প্লাটফর্ম এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘অন্বেষা’ তৈরি করা হয়েছে, যা করপোরেট হাউসগুলোর সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের বাজারের সংযোগ ঘটিয়ে দিচ্ছে।
জিডিপিতে অবদান ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশ অবদান এই সিএমএসএমই খাতের। তবে দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ উদ্যোক্তার জিডিপিতে অবদান মাত্র ৩০ শতাংশ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়:
বিভিন্ন দেশের তথ্য অনুযায়ী জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান— চীনে ৬০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫২, জাপানে ৫০, ভিয়েতনামে ৪৫, পাকিস্তানে ৪০, ভারতে ৩৭ ও বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ।
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫ লাখ উদ্যোক্তা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ফাউন্ডেশনের সেবা পেয়েছেন। যেহেতু ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তাই ঢাকার বাইরে থাকেন, তাই জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় চেম্বারের মাধ্যমে এই সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নীতিগত সহায়তা ও আগামীর প্রত্যাশা
উদ্যোক্তাদের করকাঠামো সহজ করতে ২০১১-১২ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত এসএমই ফাউন্ডেশনের ৮১০টি প্রস্তাবের মধ্যে ১৬১টি প্রস্তাব সরকার ও এনবিআরের মাধ্যমে গৃহীত ও বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নে ‘এসএমই নীতিমালা ২০১৯’-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ‘এমএসএমই নীতিমালা ২০২৬’ এখন মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই নীতিমালার সফল বাস্তবায়ন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। তবেই সরকারের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নের অঙ্গীকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, শুরু থেকে আমদানি-রপ্তানি পর্যন্ত যেকোনো প্রয়োজনে উদ্যোক্তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও সেবা দিতে প্রস্তুতি আছে এসএমই ফাউন্ডেশনের।
এই ফাউন্ডেশনের আরও বিস্তারিত জানতে ওয়েবসাইট: www.smef.gov.bd ও ফেসবুক পেজ: SME Foundation Official–তে দেখতে পারেন নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারা।
লেখক: উপমহাব্যবস্থাপক, এসএমই ফাউন্ডেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়








