হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন সংঘাত শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দিনের মতো পালটাপালটি হামলা হয়েছে। বুধবার রাতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান বলছে, তাদের অনেক বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। দুদিনে অন্তত ১৪ জন নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। জবাবে তারাও কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
এ অবস্থায় উপসাগরীয় অঞ্চলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ জুন যুদ্ধ বন্ধে ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার পর এটা ছিল সবচেয়ে তীব্র মার্কিন হামলা। বুধবার ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইরানশাহর, বন্দর আব্বাস, কোনারাক, চাবাহার, বুশেহর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর আক কালার ওপর হামলা হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন ঘিরে ছয় দিনে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই এসব হামলা পালটা হামলার ঘটনা ঘটছে। মিডল ইস্ট আই জানায়, আলী খামেনির দাফনের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন হামলায় মাশহাদ শহরের সঙ্গে তেহরানের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানায়, তারা ইরানের বিরুদ্ধে আরেক দফা হামলা চালিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল-হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরও কমিয়ে আনা।
সেন্টকম জানায়, ইরানের উপকূলে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নজরদারি সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত করার স্থান, নৌ-সক্ষমতা এবং সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামোসহ ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, চাবাহারে একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ও ডিপোর ওপর হামলা হয়েছে। আক কালা অঞ্চলে একটি রেলসেতুকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিস্ফোরণ হয়েছে বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশের কিছু এলাকায়ও।
এসব মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর বাহরাইনে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, রকেট ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পরে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস বা আইআরজিসি জানায়, তারা কুয়েতে দুটি এবং বাহরাইনে দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিতেও পালটা হামলা চালানো হতে পারে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সর্বশেষ হামলায় একজন আহত হয়েছেন।
জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া কমপক্ষে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকিয়েছে। এ অবস্থায় ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পালটা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি এক্স-এ লেখেন, ‘ইরানিদের কড়া চড় বা কঠোর জবাবের অপেক্ষা করুন।’
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে হামলার অভিযোগে মঙ্গলবার ইরানের ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওইদিন রাতেই ইরানের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইরানও হামলা চালায় বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্থাপনায়। ইরানের সেনাবাহিনীর বিবৃতির বরাতে বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, মঙ্গলবারের হামলায় ইরানের আট সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এসব হামলা বন্দর আব্বাস ও বুশেহর শহরের দক্ষিণাঞ্চলে চালানো হয়।
উভয়পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। ওই সময়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও কার্যত এখন নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘যুদ্ধবিরতি শেষ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
বিবাদের মূল বিষয়টি সম্ভবত সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম ধারায় নিহিত। এতে বলা হয়েছে-ইরান ‘পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগরে এবং বিপরীত পথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে এবং কেবল ৬০ দিনের জন্য এর কোনো মাশুল বা ফি নেবে না।’ তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলছেন ভিন্ন কথা। বুধবার তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নির্ধারণের ‘একচ্ছত্র দায়িত্ব’ ইরানেরই।
পেন্টাগনের ন্যাটোবিষয়ক কার্যক্রমের সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস আলজাজিরাকে বলেন, ইরান যখন জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছিল, তখন তারা সমঝোতা স্মারকের শর্তের বাইরে গিয়ে নতুন পরিস্থিতি বা নতুন স্বাভাবিকতা তৈরির চেষ্টা করছিল।
বুধবারের হামলার পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালি কেবল ‘ইরানের ব্যবস্থাপনায়’ খোলা থাকবে, কোনো মার্কিন হুমকির মুখে নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনো শেখেনি- অন্যদের ওপর আধিপত্য খাটানো বা ভয় দেখানো এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি এখন আর বিনা মাশুলে পার পাওয়া যায় না। বিষয়টি আমি সোজাসাপ্টাভাবেই বলছি-আপনি যদি আঘাত করেন, তবে পালটা আঘাতও আপনাকে সইতে হবে।’
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক কিম্বারলি হালকেট জানান, এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত জোরালো আঘাত হেনেছি। আমি বলব, আমাদের ওপর প্রত্যেক আঘাতের বিপরীতে ২০টি আঘাত করা হয়েছে।’ বিবিসি জানায়, ট্রাম্প দাবি করেছেন-ইরান ‘কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল’ এবং তারা ‘খুবই মরিয়া হয়ে’ একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। তবে বুধবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে।’
ইরানে আবার হামলার ঘটনায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নিন্দা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটলে আরও অনেক প্রাণহানি হবে; করদাতাদের আরও অর্থ অপচয় হবে। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনও ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে তার যুদ্ধের কারণে মার্কিনিদের প্রাণহানি ঘটেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে : সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৭৮ দশমিক ৫৫ ডলার। যুদ্ধবিরতির খবরে গত সপ্তাহে দাম কমে ব্যারেল ৭০ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল।








