উপসাগরীয় অঞ্চলে টানা চার মাসের যুদ্ধের প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে ব্যবসা ও বাণিজ্যে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নয়, অর্থনীতিকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক অনিশ্চয়তার কারণে বাণিজ্যে ধস নেমেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ব্যাংক, রিয়েল এস্টেট, পর্যটন ও খুচরা বিক্রি খাতে। তবে বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি খাত তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
এ সপ্তাহে দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশ শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাবেই যুদ্ধের এই অসম অর্থনৈতিক প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার ও ওমানসহ অঞ্চলের শীর্ষ কোম্পানিগুলো এ সপ্তাহ থেকে তাদের আয়-লাভের হিসাব প্রকাশ শুরু করবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন খাতে প্রভাব এক রকম হয়নি, কোথাও ক্ষতি বেড়েছে, আবার কোথাও জ্বালানির উচ্চমূল্য ক্ষতির বড় অংশ পুষিয়ে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এফএইচ ক্যাপিটালের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক কাকিশ বলেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকের ফলাফলই যুদ্ধের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকটাই হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। তাই সৌদি আরব ও ওমান তুলনামূলক সুবিধায় থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
খাতভেদে ভিন্ন প্রভাব : বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ব্যাংক ও রিয়েল এস্টেট খাতে। আগে থেকেই বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের চাপ যুক্ত হওয়ায় এ দুই খাতের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। অন্যদিকে টেলিযোগাযোগ খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহকচুক্তি এবং এই খাতের সেবার চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থির থাকায় বড় ধরনের ধাক্কা সামলাতে পেরেছে টেলিকম কোম্পানিগুলো। জ্বালানি খাতের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। চার মাসের সংঘাতে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি কোম্পানিগুলোর আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ব্যাংক ও রিয়েল এস্টেট খাতে মুনাফা কমার আশঙ্কা : ইএফজি হারমিসের ফাইন্যান্সিয়ালস ইকুইটি রিসার্চ বিভাগের প্রধান এলেনা সানচেজ-কাবেজুদোর জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যাংকগুলোর মুনাফা আগের তিন মাসের তুলনায় এক অঙ্কের হারে কমতে পারে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং বিদেশ ভ্রমণে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ফি-ভিত্তিক আয় কমেছে। এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের আগমন কমতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর আবাসন চাহিদাও দুর্বল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুমাত্রিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সিটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুবাইয়ের আবাসিক সম্পত্তি বিক্রি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবুধাবিতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে, যদিও সেখানে পতনের মাত্রা তুলনামূলক কম।
টেলিকম ও ভোক্তা খাতে মিশ্র চিত্র : সৌদি আরবের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এসটিসি এবং ইউএইর ই-অ্যান্ড যুদ্ধকালেও স্থিতিশীল পারফরম্যান্স ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রি ও পর্যটন খাতে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও ঘরে বসে পণ্য ও খাদ্য অর্ডারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় কিছু কোম্পানি লাভবান হয়েছে।








