বলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লড়াইয়ে থাকা একজন তরুণীর কাছে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ কোনো কুপ্রস্তাব বা বাতিল হয়ে যাওয়া চরিত্র ছিল না। সেটি এসেছিল বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে—শুটিং সেটের চেনা মুখ, কাজের প্রতিশ্রুতি এবং উত্তর প্রদেশে যাওয়ার একটি আমন্ত্রণ। কিন্তু সেই যাত্রার শেষ হয়েছিল মুক্তিপণের দাবি, একটি মস্তকহীন দেহ এবং হিন্দি সিনেমা জগতের অন্যতম এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

আজ থেকে ঠিক ১৪ বছর আগে, ২০১২ সালের মার্চ মাসে নিখোঁজ হন ২৬ বছর বয়সী উদীয়মান অভিনেত্রী মীনাক্ষী থাপা। দেরাদুন থেকে মুম্বাইয়ে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইয়ে থাকা মীনাক্ষী সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘৪০৪’ এবং কারিনা কাপুর অভিনীত মধুর ভান্ডারকরের ‘হিরোইন’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন।

‘হিরোইন’ সিনেমার শুটিং সেটেই তাঁর পরিচয় হয়েছিল দুই জুনিয়র আর্টিস্ট অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনের সঙ্গে। পরবর্তীতে এই দুজনই পরিণত হন তাঁর খুনিতে।

মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, শুটিং সেটে মীনাক্ষীর পারিবারিক গল্প শুনে অমিত ও প্রীতি ধরে নিয়েছিলেন যে তিনি অত্যন্ত ধনী পরিবারের সন্তান। তাঁদের এই ধারণাটি ভুল ছিল, কিন্তু মীনাক্ষীকে অপহরণের পরিকল্পনা করার জন্য এটিই ছিল যথেষ্ট।

অভিযুক্তরা মীনাক্ষীকে জানান যে তাঁরা উত্তর প্রদেশে তাঁর জন্য একটি অভিনয়ের কাজের ব্যবস্থা করেছেন। বলিউডে পায়ের নিচে মাটি খোঁজা এক তরুণীর কাছে এই প্রস্তাবকে কোনো ফাঁদ মনে হয়নি। সরল বিশ্বাসে তিনি তাঁদের সঙ্গে রওনা হন।

ভ্রমণ শুরুর পর ২০১২ সালের ১৭ মার্চ মীনাক্ষীর মায়ের ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বার্তা আসে। অপহরণকারীরা তিন দিনের মধ্যে ১৫ লাখ রুপি মুক্তিপণ দাবি করে।

পরিবারকে চরম আতঙ্কে ফেলতে অপহরণকারীরা হুমকি দেয়, টাকা না দেওয়া হলে মীনাক্ষীকে দিয়ে জোরপূর্বক পর্নোগ্রাফি চলচ্চিত্রে কাজ করানো হবে।

কিন্তু মীনাক্ষীর পরিবারের পক্ষে এত বিশাল অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। তাঁরা কোনোমতে ধারদেনা করে মীনাক্ষীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬০ হাজার রুপি জমা দিতে সক্ষম হন। তবে এই সামান্য অর্থ মীনাক্ষীর জীবন বাঁচাতে পারেনি।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, টাকা পাওয়ার আগেই অমিত ও প্রীতি মীনাক্ষীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন এবং পরে তাঁর মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে প্রীতির পারিবারিক বাড়ির পাশের একটি সেপটিক ট্যাংকে মীনাক্ষীর খণ্ডিত ধড় ফেলে দেওয়া হয়।

এরপর খুনি যুগল বিচ্ছিন্ন মাথাটি একটি ব্যাগে ভরে বাসে করে লক্ষ্ণৌয়ের দিকে রওনা হন এবং যাত্রাপথের কোনো এক জায়গায় সেটি বাস থেকে ছুড়ে ফেলে দেন। সেই খণ্ডিত মাথাটি পুলিশ আর কখনোই উদ্ধার করতে পারেনি।

হত্যাকাণ্ডের পরও খুনিরা মীনাক্ষীর পরিবারের কাছে টাকা চেয়ে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁরা সমস্ত তথ্যপ্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও একটি বড় ভুল করে বসেন—তাঁরা মীনাক্ষীর ব্যবহৃত সিম কার্ডটি নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।

পুলিশ কল রেকর্ড এবং ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে শুরু করে। অবশেষে ১২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশনের কাছের একটি এটিএম বুথে অমিত ও প্রীতির আসার খবর পায় পুলিশ।

সেখানে ফাঁদ পেতে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছে মীনাক্ষীর সিম কার্ড এবং ডেবিট কার্ড পাওয়া যায়, যা দিয়ে তাঁরা টাকা তোলার চেষ্টা করছিলেন।

এর দুই দিন পর, ১৬ এপ্রিল পুলিশ এলাহাবাদের সেই সেপটিক ট্যাংক থেকে মীনাক্ষীর মস্তকহীন দেহ উদ্ধার করে।

ঘটনার পর মামলাটি দীর্ঘ ছয় বছর ধরে আদালতে বিচারাধীন ছিল।

অবশেষে ২০১৮ সালের ৯ মে মুম্বাইয়ের একটি দায়রা আদালত অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন) এবং ৩৬৪-এ (মুক্তিপণের জন্য অপহরণ) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে।

বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি উজ্জ্বল নিকম এই হত্যাকাণ্ডকে ‘বিরল থেকে বিরলতম’ অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে খুনিদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন। তবে আদালত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ শেষে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

মুম্বাইয়ের রূপালি পর্দায় নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে এসেছিলেন মীনাক্ষী থাপা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বন্ধুদের দেওয়া একটি ভুয়া কাজের আশ্বাসই শেষ পর্যন্ত তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।