পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর চিরচেনা কোলাহলের মাঝে পাটুয়াটুলীতে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়াতে হয় একটি লাল রঙের ব্রিটিশ স্থাপত্যের সামনে। উচ্চতায় প্রায় দোতলার সমান হলেও, এটি আসলে একতলা একটি ভবন। এটি কোনো সাধারণ প্রাচীন বসতবাড়ি নয়; এটি হলো ঐতিহাসিক ব্রাহ্মসমাজ মন্দির।১৮৬৯ সাল থেকে কালের খেয়ায় চড়ে আজ অবধি দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি তৎকালীন ঢাকার সমাজ সংস্কার, মুক্তবুদ্ধির চর্চা আর আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে।ইতিহাসের গন্ধমাখা ইট আর মণীষীদের পদচারণাআজ থেকে দেড়শত বছরেরও বেশি সময় আগে, ১৮৬৯ সালে ব্রজ সুন্দর মিত্র ও দীননাথ সেনের নেতৃত্বে এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কেন্দ্রে বসেই সে যুগের চিন্তাবিদেরা ঢাকার বুকে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বপ্ন বুনেছিলেন। বর্তমানের ঐতিহ্যবাহী ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর আদি রূপ তথা ‘ব্রাহ্ম স্কুল’-এর পথচলা শুরু হয়েছিল এই চত্বর থেকেই।শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, ঢাকার প্রথম সাধারণ পাঠাগার ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এই প্রাঙ্গণেই। এই মন্দিরের প্রতিটি ইটের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের সব কিংবদন্তিদের নাম। ১৯২৬ সালে খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে এসে এক মহতী নারী সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। আবার ১৯৩০ সালের মে মাসে বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ ও লাবণ্য দাশের চার হাত এক হয়েছিল এই মন্দিরের শান্ত সুনিবিড় পরিবেশেই।নিরাকার উপাসনার অলিন্দে সুরের মূর্ছনাঐতিহাসিক এই মন্দিরের ভেতরে পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় এক বিশাল হলঘর দেখে। চারপাশের সুপ্রশস্ত বারান্দা থেকে ভেতরের মূল হলঘরে প্রবেশের জন্য রয়েছে ১৬টি তোরণ বা পথ। ব্রাহ্মরা যেহেতু নিরাকার একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করেন, তাই মন্দিরের ভেতরে কোনো দেব-দেবীর মূর্তি বা প্রতিমা নেই। চারদিকের দেয়ালজুড়ে কেবল এক শান্ত ও গম্ভীর আবহ। মন্দিরের উত্তর দিকের শ্বেতপাথরের বেদিতে বসে প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় এখনো নিয়মিত চলে বিশেষ প্রার্থনাসঙ্গীত আর তত্ত্বকথা আলোচনা।একাত্তরের দগদগে ক্ষত আর বর্তমানের একাকীত্বজ্ঞানের যে বিপুল আধার নিয়ে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরিটি আলো ছড়াত, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর দেওয়া অগ্নিসংযোগে তার বহু দুষ্প্রাপ্য বই ও পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর লাইব্রেরিটি আর আগের গৌরব ফিরে পায়নি; এখন সেখানে বইয়ের পাতা ওল্টানোর মতো কোনো পাঠক চোখে পড়ে না।প্রতি রবিবার যখন শূন্য হলঘরে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে’ কিংবা ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানগুলো সুরের সুতোয় বেজে ওঠে, তখন মুহূর্তের জন্য মনে হয় সময়টা যেন অতীতে ফিরে গেছে। তবে প্রার্থনা শেষ হতেই যখন বাতিগুলো একে একে নিভে যায়, তখন ইতিহাসের এই মহান সাক্ষীটি জনাকীর্ণ পুরান ঢাকায় যেন আবার বড় বেশি একা হয়ে পড়ে। সুমনা হাসপাতালের কাছে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই লাল দালানটি আজও জানান দিচ্ছে— জাঁকজমকপূর্ণ কোনো বড় আয়োজন না থাকলেও, তারা টিকে আছে পরম পরিপাটি হয়ে, ইতিহাসের এক বুক নীরব দীর্ঘশ্বাস নিয়ে।
রাজনীতি
যেখানে জীবনানন্দ দাশের বিয়ে আর রবিঠাকুরের পদধূলি পড়েছিল

শেয়ার করুন







