যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের অবারিত সুযোগে এবার বড় ধাক্কা লাগতে যাচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থী, বিনিময় কর্মসূচির আওতাধীন দর্শনার্থী এবং সাংবাদিকদের ভিসার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে দেশটি। কয়েক দশক ধরে চলে আসা পুরোনো নিয়ম বাতিল করে ভিসার মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এর ফলে এখন থেকে অনির্দিষ্টকাল আর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) নতুন এই নিয়ম জারি করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী, এখন থেকে বিদেশি শিক্ষার্থী ও বিনিময় দর্শনার্থীরা সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাবেন। আর সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই মেয়াদ হবে মাত্র ২৪০ দিন। চীনা সাংবাদিকদের জন্য এই সময়সীমা আরও কমিয়ে মাত্র ৯০ দিন করা হয়েছে।
আরও পড়ুনবাংলাদেশিদের জন্য আরও কঠিন হলো অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা
নির্ধারিত সময়ের পরও কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চান, তবে তাকে নতুন করে আবেদন করতে হবে। অন্যথায় নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবারও ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
নতুন এই নিয়ম ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশের ৬০ দিন পর থেকে কার্যকর হবে। তবে এর আগে নিয়মটি কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যাবে।
কেন এই কঠোর সিদ্ধান্ত?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অবৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এটি সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই অংশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরোনো ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেকেই দশকের পর দশক ধরে শিক্ষার্থী সেজে অবস্থান করছিলেন। এতে মার্কিন নাগরিকদের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছিল এবং রাষ্ট্রের করদাতাদের কোটি কোটি ডলার অপচয় হচ্ছিল।
আরও পড়ুনযুক্তরাষ্ট্রে এক বছরে ৮৫ হাজার ভিসা বাতিল, চাপে শিক্ষার্থীরাও
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্যমতে, বিগত ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা ২ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ এখনো শিক্ষার্থী হিসেবেই দেশটিতে অবস্থান করছেন। তারা একের পর এক নতুন কোর্সে ভর্তি হয়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে নিজেদের অবস্থান দীর্ঘায়িত করছেন। নতুন এই নিয়ম চালুর ফলে এই ধরনের অপব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হবে বলে দাবি করছে মার্কিন প্রশাসন।
ডিএইচএস সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে চলে আসা পুরোনো ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থাটি জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। বহু মানুষ ‘চিরস্থায়ী ছাত্র’ হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করছেন। নতুন নিয়মের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।
নতুন নিয়মে প্রধান পরিবর্তনগুলো কী কী?
নতুন নিয়ম চালুর ফলে ভিসা ব্যবস্থায় বেশ কিছু আমূল পরিবর্তন আসছে। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিসা
শিক্ষার্থী (এফ ভিসা) এবং বিনিময় দর্শনার্থীরা (জে ভিসা) তাদের নিজ নিজ কোর্সের মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত থাকার অনুমতি পাবেন। আর কোনোভাবেই অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকার সুযোগ থাকবে না।
আরও পড়ুন
ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্ত / ফ্যাক্ট-চেকারদের ভিসা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র
মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কঠোর প্রক্রিয়া
যদি কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়, তবে তাকে সরাসরি ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের (ইউএসসিআইএস) কাছে আবেদন করতে হবে। এই আবেদন পর্যালোচনার সময় আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য পরীক্ষা করা হবে। সেই সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের কঠোর ধাপ পার হতে হবে।
দেশ ছাড়ার সময়সীমা কমলো
এতদিন পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর এফ-১ ভিসাধারী শিক্ষার্থীরা দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৬০ দিন সময় পেতেন। নতুন নিয়মে এই গ্রেস পিরিয়ড বা অতিরিক্ত সময় ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন ও কোর্স পরিবর্তনের ওপর কড়াকড়ি
নতুন নিয়মে শিক্ষার্থীরা চাইলেই সহজে এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কোর্স পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদনকারীদের জন্য নতুন নির্দেশনা
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য যারা পিএইচডি বা অন্যান্য বড় কোর্সে ভর্তি হন, তাদের পড়াশোনা শেষ হতে সাধারণত চার বছরের বেশি সময় লাগে। নতুন নিয়মে চার বছরের সীমা থাকায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় কোনো শিক্ষার্থীর যদি তার বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়, তবে তিনি সহজে অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। এছাড়া গ্রেস পিরিয়ড ৩০ দিন করার কারণে স্নাতক শেষ করেই তড়িঘড়ি করে চাকরির সন্ধান করতে হবে বা দেশে ফিরে আসতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিক ও মানসিকভাবে বড় চাপের মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
স্টুডেন্ট ভিসায় ইউরোপ-আমেরিকার কড়াকড়ি, বিকল্প হতে পারে যেসব দেশ
কড়াকড়ির কঠোর সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং অভিবাসন আইনজীবীরা এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ফি ও দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকবেন না। ফলে গবেষণার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব রয়েছে, তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গত জুন মাসে ট্রাম্পের প্রশাসন প্রায় এক লাখ ভিসা বাতিল করেছে, যার মধ্যে আট হাজারই ছিল শিক্ষার্থী ভিসা। রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের অনেকের ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। নতুন এই নিয়মের ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি আরও জোরদার হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, ডিএইচএস
কেএএ/








