আজ ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী। ১৭৭৬ সালের এই দিনে ওই সময়ের ১৩টি ব্রিটিশ কলোনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটেনের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে আট বছর যুদ্ধের পর। এ যুদ্ধ কেবল ১৩টি উপনিবেশের মধ্যেই সীমিত থাকেনি। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ফরাসি, স্প্যানিশ ও ক্যারিবিয়ানরাও। দীর্ঘ লড়াই ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে মোকাবিলা করেছে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। অবলুপ্তি ঘটেছে দাস প্রথার। অবকাঠামোর অভিনব উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিকাশ ঘটেছে গণতন্ত্রের। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় এখন ক্ষমতায় আছে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট। আইন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসন পারস্পরিক ভারসাম্য বজায় রাখছে রাষ্ট্র পরিচালনায়। দীর্ঘ আড়াই শতাব্দীতে নানা উত্থান-পতন, যুদ্ধ বিগ্রহের পরও অটুট রয়েছে আমেরিকার মূল সংবিধান, যা বিশ্বের বহু দেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে, বিশেষ করে যে দেশগুলোতে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রায় একশ বছর পরও সাংবিধানিক প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি।

আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী ঘিরে গত প্রায় এক বছর ধরে যে ব্যাপক হইচই চলছে, তা যেন দেশটির ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার একটি দুর্ভাগ্যজনক দৃষ্টান্ত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সহযোগীদের প্রচারিত ‘মেইক অ্যামেরিকা গ্রেট এগেইনে’র আড়ালে তা আমেরিকায় ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব’ বা ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা বলে সমালোচিত হলেও এ সংকীর্ণ প্রচারণা ও উদ্যোগ থেমে নেই। সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর ওপর ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা বিদ্বেষমূলক তৎপরতার কারণে দেশটির প্রতিষ্ঠাতাদের উচ্চাভিলাষী উদারনৈতিক আদর্শের কোনোকিছুর অস্তিত্বই যেন আর টিকে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন এবং চলমান ঘটনাগুলোকে ভুলে যেতে বলছে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণবাদী দাবিদাররা। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা হয়েছে : ‘এটাই স্বতঃসিদ্ধ সত্য যে, সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট; তারা তাদের স্রষ্টার কাছ থেকে কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার লাভ করেছে; এ অধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অধিকার। এ অধিকারগুলো সুরক্ষিত করার জন্য মানুষের মধ্যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শাসিতদের সম্মতি থেকে তাদের ন্যায্য ক্ষমতা লাভ করে। যখন কোনো সরকার এ উদ্দেশ্যগুলোর জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে, তখন জনগণের অধিকার রয়েছে সেই সরকারকে পরিবর্তন বা বিলুপ্ত করার এবং এমন নীতির ওপর তার ভিত্তি স্থাপন করার, যা তাদের নিরাপত্তা ও সুখ নিশ্চিত করতে সর্বাধিক উপযুক্ত বলে মনে হয়।’

যে অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমেরিকানরা লড়ে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছিল, ট্রাম্পযুগে অথবা যখন শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের প্রবক্তারা মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে, তখন নানা ধরনের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে জনমনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। তারা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে, আমেরিকানরা ভাবতে বাধ্য হয়েছে, তারা এক জরুরি যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আছে। তারা বিস্মৃত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ভাবতে শুরু করে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র কোনো গন্তব্য বা স্থায়ী কিছু নয়, বরং এগুলো একটি ভঙ্গুর সম্ভাবনা। আমেরিকার ইতিহাস সম্পর্কে প্রশাসনজুড়ে থাকা ক্ষমতাধরদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রতিশ্রুত স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট উদযাপন করা দূরের কথা, একশ্রেণির শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান মনে হয় একধরনের পৌরাণিক কল্পকাহিনি আঁকড়ে আছে। তাদের মাথায় এসব কাহিনি স্থান করে নিয়েছে যে, ‘তাদের পূর্বপুরুষরা সবাই স্বাধীনতাপ্রেমী বীর ছিলেন; তারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেশে জন্মেছেন; অথবা আমেরিকানরা যুদ্ধে অজেয় এবং শান্তির সময়ে প্রজ্ঞাবান’ ইত্যাদি।

কিন্তু এসব কাহিনি ও উগ্র শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের বিশ্বাস কতটা সত্য? প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির আফ্রিকান-আমেরিকান স্টাডিজের প্রফেসর এডি স্টিভেন গ্লদ তার সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘ডেমোক্রেসি ইন ব্ল্যাক : হাউ রেস স্টিল এনস্লেভস দি অ্যামেরিকান সোল’-এ আমেরিকানদের সমষ্টিগত বিস্মৃতির কঠোর সমালোচনা করেছেন, বিশেষ করে সেই বিস্মৃতি যেভাবে আমেরিকান জাতির মর্মমূলে বিদ্যমান বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য ও বিদ্বেষকে আড়াল করে। তিনি বলেছেন, শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা এ বৈষম্য চিরাচরিতভাবে লালন করে এসেছে। সাংবিধানিক অধিকার, বৈষম্যহীন সমাজ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের নামে সাধারণ আমেরিকান ও বিশ্ববাসীর চোখে পর্দা বেঁধে প্রকৃত অর্থে তারা তাদের বর্ণবাদী উত্তরাধিকারকেই বহন করছে। সেই উত্তরাধিকার কী এবং বর্তমান সময়ে তারা আসলে কী করছে? ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বর্তমান আমেরিকান ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিক শক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়, যখন তারা আদিবাসীদের, আমাদের কাছে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ হিসাবে পরিচিত ‘নেটিভ আমেরিকান’দের নির্মূল এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে দাসত্বে আবদ্ধ করেছে। ঔপনিবেশিক যুগজুড়ে এবং স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চলা পর্যন্ত নতুন ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনকারীরা আদিবাসীদের নির্মূল করতে সব কৌশল অবলম্বন করেছিল।

বিস্ময়ের কিছু নেই যে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তোলা হয়েছিল, তার একটি ছিল ‘নিষ্ঠুর আদিবাসী বর্বরদের দ্বারা বিদ্রোহ উসকে দেওয়া’; পরবর্তীকালে এ ঘোষণাপত্রের রচয়িতারাই আদিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্মম নির্মূল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ঘোষণাপত্রের মূল রচয়িতা টমাস জেফারসন ১৮০৭ সালে তার যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হেনরি ডিয়ারবর্নকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে। জেফারসন তাকে লিখেছিলেন : ‘যদি কখনো আমরা কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কুঠার তুলতে বাধ্য হই, কিন্তু সেই গোত্র নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত, অথবা মিসিসিপির ওপারে তাড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কুঠার নামাব না।’ কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রাখার অন্যতম একজন হিসাবে জেফারসন জানতেন-নিলামে বাজারে হোক অথবা দাস শ্রমশিবিরে-কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের প্রতিনিয়ত কী ধরনের নিপীড়ন সহ্য করতে হতো। আমেরিকান জাতির প্রতিষ্ঠায় সমর্থনকারী আইনগত ও রাজনৈতিক দলিলপত্রে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের ওপর সেই সহিংস বাস্তবতাকে আড়াল করা হয়েছিল এবং বর্ণবাদী মতাদর্শকে দেওয়া হয়েছিল যৌক্তিক রূপ।

অতএব, আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন দ্বিচারিতারও একটি প্রকাশ, যে স্বাধীনতার ঘোষণায় সব মানুষের সমতার মহিমা ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু মানব ইতিহাসে নিপীড়নের জঘন্যতম কলঙ্ক কীভাবে মুছবে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা? ক্রীতদাসদের যারা উত্তরাধিকারী, তাদের কাছে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা বা ৪ জুলাই কী? আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্টের অন্যতম নেতা ফ্রেডারিক ডগলাসের মতে, ‘এটি এমন একটি দিন, যা বছরের অন্য যে কোনো দিনের চেয়ে বেশি উন্মোচিত করে আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা মানুষের ওপর চালানো সেই চরম অবিচার ও নিষ্ঠুরতাকে। এ দিবস উদযাপন একটি প্রহসন, শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের অহঙ্কারের স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থে এক অপবিত্র উচ্ছৃঙ্খলতা। অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের নিন্দা জানানো আসলে নির্লজ্জ ধৃষ্টতা। তাদের মুখে স্বাধীনতা ও সমতার স্লোগান ফাঁপা বিদ্রুপ; তাদের প্রার্থনা, ধর্মোপদেশ কেবলই বাগাড়ম্বর, প্রতারণা, ছলনা, ধর্মদ্রোহিতা ও ভণ্ডামি।’

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তার বর্ণবাদ ও অভিবাসী-বিদ্বেষে কোনো রাখঢাক করেন না, তখন স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের হইচই ও জাঁকজমককে এক ধরনের ছলনা ও প্রতারণা হিসাবে দেখা হলেও হয়তো খুব বাড়াবাড়ি হবে না। ট্রাম্পের অভিবাসী-বিদ্বেষী যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটাধিকার ও অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের সমর্থনে আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকটি রায়। অতীতকে সমষ্টিগতভাবে ভুলে যাওয়ার আমেরিকান বিস্মৃতির আরেকটি দিক হলো, বর্তমান রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে যদি ভবিষ্যতের নির্দেশনা হিসাবে কাজে লাগানোর মতো কিছু অংশ উদ্ধার করার থাকে, তাহলে সেটি হচ্ছে : ‘যখনই কোনো সরকার মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যগুলোকে ধ্বংসাত্মক করে তোলে, তখন জনগণের অধিকার থাকে সেই সরকারকে পরিবর্তন বা বিলুপ্ত করার।’ এদিক থেকে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ ঘোষণা আমেরিকানদের বুঝতে সাহায্য করে যে, সমতা বিধান করা ছাড়া স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করা সম্ভব নয়।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক