জাতীয় র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয় সরকারি কলেজের স্বীকৃতি পেলেও সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে রয়ে গেছে দীর্ঘদিনের নানা সংকট। শতবর্ষী ভবন সংরক্ষণের অনিশ্চয়তা এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যান্টিন না থাকার বাস্তবতার মধ্যেই ১৩৫ বছরে পদার্পণ করল দেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

দেড়শত একরের সবুজ ক্যাম্পাস, শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ভবন এবং থ্যাকারে টিলার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ—এসব মিলিয়েই দাঁড়িয়ে আছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ। ২৭ জুন ১৩৪ বছর পূর্ণ করে ১৩৫ বছরে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গৌরবের এ দিনে যেমন রয়েছে জাতীয় র‌্যাংকিংয়ে সাফল্যের স্বীকৃতি, তেমনি রয়েছে শতবর্ষী ভবন রক্ষার শঙ্কা এবং দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্টিন না থাকার আক্ষেপ।

১৮৮৬ সালে ‘মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। তৎকালীন রাজা গিরিশচন্দ্র রায় তাঁর মাতামহ জমিদার মুরারিচাঁদ রায়ের স্মৃতিতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্ক (বর্তমান হাসান মার্কেট) এলাকায় বাঁশ ও নলখাগড়ার ঘরে শিক্ষা কার্যক্রম চলত। পরে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ১৮৯২ সালের ২৭ জুন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

১৯২১ সালে তৎকালীন আসামের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদের উদ্যোগে কলেজটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয় এবং টিলাগড়ের থ্যাকারে টিলায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয় প্রায় দেড়শত একরের বর্তমান ক্যাম্পাস।

১৩৫ বছরের পথচলায় এমসি কলেজ এখন জাতীয়ভাবেও স্বীকৃত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশের ৭০৮টি সরকারি কলেজকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হলে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে স্থান পাওয়া ৮১টি কলেজের মধ্যে এমসি কলেজের অবস্থান অষ্টম।

বর্তমানে কলেজটিতে ১১ হাজার ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিকে ৬০০ জন, স্নাতক (পাস) কোর্সে ৩ হাজার ৭৪০ জন, স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪ হাজার ৫০৬ জন এবং মাস্টার্সে প্রায় ৩ হাজার ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। কলেজে শিক্ষক আছেন ১০৮ জন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে কর্মরত ১৫১ জন।

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, “মুরারিচাঁদ কলেজের ১৩৫ বছরের পথচলা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এই কলেজের শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। এই গৌরবের পতাকা যেন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি, সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”

সবুজ টিলা, লাল-সাদা পদ্মে ভরা পুকুর এবং নান্দনিক পরিবেশের জন্য এমসি কলেজকে অনেকেই সিলেটের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষাঙ্গন হিসেবে বিবেচনা করেন। ক্যাম্পাসে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার বইসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, পুরোনো আদলের শহীদ মিনার এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদ।

তবে, এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে উদ্বেগও। কলেজের শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ভবনগুলো এখন অস্তিত্বের সংকটে। সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায়, বরং ভবনগুলো ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের আগ্রহ ঐতিহ্যবাহী এসব স্থাপনাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ভবনগুলো সংরক্ষণের দাবিতে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করছে।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, “আসাম প্যাটার্নের ভবনগুলো আমাদের অনন্য ঐতিহ্যের অংশ। মূল নকশা অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে এগুলো সংস্কার করে ব্যবহারোপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি।”

জাতীয় র‌্যাংকিংয়ে স্বীকৃতি মিললেও প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর এই কলেজে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নেই কোনো ক্যান্টিন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত ক্যান্টিন চালু থাকলেও তৎকালীন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন) নেতাদের বাকিতে খেয়ে বিল পরিশোধ না করায় ইজারাদার ব্যবসা গুটিয়ে নেন। পরে ২০১৭ সালে পরিত্যক্ত ক্যান্টিন ভবনটি ভেঙে সেখানে ১০ তলা ভবন নির্মাণ শুরু হলে ক্যান্টিনের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যায়। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের ভরসা ক্যাম্পাসের ভ্রাম্যমাণ দোকানের ঝালমুড়ি, ফুচকা কিংবা ক্যাম্পাসের বাইরের খাবার।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তানিম বলেন, “ক্লাসের ফাঁকে শিক্ষার্থীরা রাস্তার অস্বাস্থ্যকর ঝালমুড়ি ও ফুচকা খেয়ে প্রায়ই পেটের নানা সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন স্থাপনের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।”

দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন মালাকার শাওন বলেন, “ক্যান্টিন না থাকায় বাইরে গিয়ে খেতে হয়, যেখানে খাবারের মান ভালো নয়। ধূমপানের মতো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেও থাকতে হয়। এতে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।”

ক্যান্টিন চালুর বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি অনুসরণ করেই আমরা পুনরায় ক্যান্টিন স্থাপনের চেষ্টা করছি।”