ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ক্রোয়াশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যবর্তী দানিউব নদীর অববাহিকায় এক টুকরো দাবিহীন জমিকে (Terra nullius) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক স্বঘোষিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বা মাইক্রোনেশন (Micronation) হলো ‘ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্ডিস’ (Free Republic of Verdis)। ২০১৯ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সী (বর্তমানে ২১ বছর) ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান তরুণ ড্যানিয়েল জ্যাকসন নিজেকে এই দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শেখ তানিম হোসেন ও আল-মুজাহিদুল সাকিব নামে দুই যুবক ১৫-১৬ দিনের মধ্যে এই দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এরপর থেকেই মূলত ইন্টারনেটে ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, মাত্র ১০-১৫ কিংবা ২০ দিনের মধ্যেই এই দেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। এই বিষয়ের সত্যতা, আইনি ভিত্তি ও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
‘ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্ডিস’ কোনো আন্তর্জাতিকভাবে বা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত দেশ নয়। ভ্যাটিকান সিটির মতো আয়তনের এই অঞ্চলটি ক্রোয়াশিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যকার একটি পুরোনো সীমান্ত বিরোধের কারণে দীর্ঘকাল ধরে পরিত্যক্ত বা ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ হিসেবে পড়ে ছিল। ড্যানিয়েল জ্যাকসন নামের ওই তরুণ আন্তর্জাতিক আইনের একটি ফাঁকফোকর (কোনো জমি কেউ দাবি না করলে তা নিজের দাবি করা যায়) ব্যবহার করে এখানে নিজস্ব পতাকা ও রাষ্ট্রীয় প্রতীক তৈরি করেন।
বর্তমানে ইন্টারনেট-ভিত্তিক এই মাইক্রোনেশনের প্রায় ৪০০ জন ডিজিটাল নাগরিক রয়েছেন।
ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্ডিস- এর ‘পরিকল্পিত’ মানচিত্র/ ছবি: verdisgov.org
ইউরোপের সবচেয়ে সাশ্রয়ী দেশ কোনটি? কীভাবে পাবেন ভিসা
১০-১৫ দিনে নাগরিকত্ব: সত্যি নাকি বিভ্রান্তি?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ‘১০-১৫ দিনে নাগরিকত্ব পাওয়ার’ দাবিটি আংশিক সত্য কিন্তু বড় রকমের বিভ্রান্তিকর। ভার্ডিস সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল (verdisgov.org) অনুযায়ী, তাদের একটি ডিজিটাল নাগরিকত্ব বা ই-রেসিডেন্সি (e-Residency) প্রোগ্রাম চালু রয়েছে।
১৪ দিনের অনুমোদন প্রক্রিয়া: একজন ব্যক্তি যখন তাদের অনলাইন পোর্টাল বা ‘myGov’ অ্যাকাউন্টে ই-রেসিডেন্সির জন্য আবেদন করেন, তখন ট্রাফিকের ওপর ভিত্তি করে সরকারি কর্মকর্তাদের ম্যানুয়ালি সেই আবেদন বা অ্যাকাউন্ট অনুমোদন করতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে।
ভুল ব্যাখ্যা: মূলত এই অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বা ডিজিটাল পোর্টালের অনুমোদন পাওয়ার সময়সীমাটিকেই ইন্টারনেটে অনেকে ‘১০-১৫ দিনে ইউরোপের দেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট’ বলে ভুলভাবে প্রচার করছেন।
ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্ডিসের পতাকা হাতে দেশটির স্বঘোষিত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল জ্যাকসন/ ছবি: verdisgov.org
নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম কঠিন করছে সুইডেন
আসল নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি নিয়ম
ভার্ডিস সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, মাত্র ১৫ দিনে কোনো পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট পাওয়া যায় না। এর জন্য নির্দিষ্ট আইনি ধাপ রয়েছে:
ই-রেসিডেন্সি প্লাস (e-Residency Plus): প্রথমত, ২৫ থেকে ১০০ ইউরো ফি দিয়ে ই-রেসিডেন্সি নিতে হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকার কিছু বেশি। নাগরিকত্বের মূল পথটি তৈরি হয় ‘ই-রেসিডেন্সি প্লাস’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে।
১১ মাসের শর্ত: নাগরিকত্বের আবেদন করার যোগ্য হতে হলে আবেদনকারীকে ন্যূনতম ১১ মাস ধরে এই দেশের ই-রেসিডেন্সির সক্রিয় সদস্য হিসেবে থাকতে হবে।
আবেদন ফি ও স্ক্রিনিং: ১১ মাস পর ৩০০ ইউরো বা প্রায় সাড়ে ৪২ হাজার টাকা ফি দিয়ে নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়। কঠোর নিরাপত্তা স্ক্রিনিং ও ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের পর কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিরাই নাগরিকত্ব পান।
সতর্কতা: নাগরিকত্ব আবেদনের ৩০০ ইউরো ফি কিন্তু অফেরতযোগ্য। অর্থাৎ, আপনার আবেদন বাতিল হলে এই টাকা আর ফেরত পাবেন না।
পাসপোর্টের কার্যকারিতা ও বাস্তব সংকট
ভার্ডিস তাদের নাগরিকদের জন্য ৮০ ডলার বা প্রায় ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ফিজিক্যাল পাসপোর্ট ইস্যু করা শুরু করেছিল। তবে এই পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।
ক্রোয়েশিয়ার নিষেধাজ্ঞা
২০২৩ সালের অক্টোবরে কিছু নাগরিক নিয়ে ড্যানিয়েল জ্যাকসন ওই জমিতে সশরীরে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করলে ক্রোয়েশিয়ান পুলিশ তাদের সবাইকে আটক করে। ড্যানিয়েল জ্যাকসনকে ক্রোয়েশিয়ায় আজীবন ও বাকিদের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
অবরোধ ও বর্তমান অবস্থা:
২০২৪ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়া এই অঞ্চলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। ফলে বর্তমানে সেখানে সশরীরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সবশেষে বলা যায়, ফ্রি রিপাবলিক অব ভার্ডিস মূলত একটি ইন্টারনেট-ভিত্তিক প্রতীকী রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক প্রকল্প। প্রযুক্তিগতভাবে তাদের পোর্টালে যুক্ত হতে ১০-১৪ দিন সময় লাগলেও, এটি দিয়ে ইউরোপের কোনো দেশে যাতায়াত করা বা বসবাস করা আইনিভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। কোনো ব্যক্তি যদি একে লিগ্যাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব ভেবে টাকা লেনদেন করেন, তবে তিনি চরম প্রতারণার শিকার হবেন। এটি কেবলই একটি ডিজিটাল কমিউনিটি ও এর পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক কোনো আইনি মূল্য নেই।
সূত্র: verdisgov, ভার্ডিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট, দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন,
এসএএইচ








