সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাজেটে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে সরকার। মূল বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা তো বটেই, পরে সংশোধিত বাজেটে বাড়ানো ব্যাংকঋণের সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থবছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এই ঋণের পুরোটাই নেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়া হয়নি; বরং আগের ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া, উন্নয়ন ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ, বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে ধীরগতি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত অর্থ না আসায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাপকভাবে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, স্বল্প মেয়াদে এটি সরকারের নগদ অর্থের চাহিদা পূরণে সহায়ক হলেও দীর্ঘ মেয়াদে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, সুদের হার এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরের মূল জাতীয় বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। পরে অর্থায়নের চাহিদা বাড়ায় জুনে ঘোষিত সংশোধিত বাজেটে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৭ হাজার ১২৯ কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশ এবং সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ হাজার ১২৯ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেই সরকারের ব্যয় ও ঘাটতির হিসাব করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার যদি ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। আর ঋণপ্রবাহ কমলে বিনিয়োগ বাড়বে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অর্জন কঠিন হবে।

সরকার সাধারণত বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের গতি কমে যাওয়া এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় ব্যাংকঋণই সরকারের প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন শেষে সরকারের মোট বকেয়া ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের শেষ সপ্তাহে ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ২৩ জুন পর্যন্ত নিট ব্যাংকঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা ৩০ জুন শেষে কমে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ শেষ সাত দিনে ঋণ কমেছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় ব্যাংকগুলো সরকারকে প্রয়োজনীয় ঋণ দিতে পেরেছে। তবে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের উচিত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক অর্থায়নের মতো বিকল্প উৎসে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারকে ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক বেশি সুদ পাচ্ছে। তবে এর প্রভাব বেসরকারি খাতের ওপর পড়ছে। সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে যাচ্ছে। তাঁর মতে, সরকারের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমাতে না পারলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা সহজে কমবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সরকার ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ ছিল লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২১ শতাংশ কম। অবশ্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়েছিল সরকার।

এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য ধরা হলেও চূড়ান্ত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে নতুন অর্থবছরেও ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের উচ্চনির্ভরতা অব্যাহত থাকতে পারে।