আজ থেকে ১১৮ বছর আগের এক গ্রীষ্মের সকাল। সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত এক অঞ্চলের আকাশ চিরে ধেয়ে এসেছিল রহস্যময় বস্তু। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সেটি ওলট–পালট করে দিয়েছিল ওই এলাকার পুরো ভূপ্রকৃতি। তবে সেখানে কোনো গর্ত সৃষ্টি হয়নি, উদ্ধার করা যায়নি কোনো উল্কাপিণ্ডের অবশিষ্টাংশও।
এমনকি ঘটনার পর প্রায় দুই দশক পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী বা অভিযাত্রী দল ওই দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতেও পারেনি। যা ছিল, তা হলো প্রত্যক্ষদর্শীদের কিছু বিবরণ। তাঁরা দেখেছিলেন সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল একটি জ্বলন্ত বস্তু, শুনেছিলেন বজ্রপাতের মতো একের পর এক বিকট শব্দ। সেই বিস্ফোরণে মাইলের পর মাইল বনাঞ্চল মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলা সেই রহস্য আজও উন্মোচন করা যায়নি।
রুশ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনকালে ১৯০৮ সালের ৩০ জুন সকাল সোয়া ৭টার দিকে মহাকাশ থেকে একটি বস্তু সাইবেরিয়ার বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে।
ওই অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল খুবই কম। মূলত এভেনকি যাযাবর হরিণপালকেরা সেখানে বাস করতেন। তাঁদের দেওয়া বর্ণনা থেকেই এ ঘটনার প্রথম বিবরণ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা পরের এক শতাব্দী ধরে সেই বিবরণের সূত্র ধরেই পুরো ঘটনা বোঝার চেষ্টা করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আকাশে প্রথমে ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে একটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলক ধেয়ে আসে। এরপর সূর্যের চেয়েও তীব্র এক আলো যেন পুরো আকাশকে ঝলসে দেয়। তার পরপরই শোনা যায় কান ফাটানো বিকট শব্দ।
বিস্ফোরণস্থলের সবচেয়ে কাছে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তীব্র ধাক্কায় তাঁরা ছিটকে পড়েছিলেন। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ায় অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। একটু দূরে থাকা অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা আকাশে ধোঁয়ার বিশাল এক স্তম্ভ খাড়া ওপরের দিকে উঠে যেতে দেখেন।
বিস্ফোরণটি ঘটেছিল রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পূর্বে ইয়েনিসেইস্ক গভর্নরেটের (বর্তমান ক্রাসনোইয়ারস্ক ক্রাই) পোডকামেনায়া তুঙ্গুসকা নদীর কাছে। ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় ঘটনাটি ‘তুঙ্গুসকা ঘটনা’ নামে পরিচিত।
বিস্ফোরণস্থলের সবচেয়ে কাছে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তীব্র ধাক্কায় তাঁরা ছিটকে পড়েছিলেন। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ায় অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। একটু দূরে থাকা অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা আকাশে ধোঁয়ার বিশাল এক স্তম্ভ খাড়া ওপরের দিকে উঠে যেতে দেখেন।
জানা যায়, ওই অঞ্চলের বুনো হরিণের বিশাল দল এ বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিল। শত শত মাইল দূরে থাকা ভূমিকম্প পরিমাপক যন্ত্রেও এই বিস্ফোরণের ধাক্কায় তৈরি হওয়া কম্পন ধরা পড়েছিল।
বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করেন, মহাজাগতিক বস্তুটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এরপর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় এটি বিস্ফোরিত হয়। বস্তুটি সরাসরি মাটিতে আঘাত না করে বায়ুমণ্ডলেই বিশাল পরিমাণ শক্তি অবমুক্ত করে।
—মার্টিন কনোর্স, কানাডার জ্যোতির্বিজ্ঞানীআমরা এ ঘটনা সম্পর্কে কত কম জানি এবং এটি নিয়ে এখনো কত বিতর্ক রয়ে গেছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। অত্যন্ত দুর্গম অবস্থানের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গবেষণা করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার অনেক বছর পর এটি নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয়।নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী গবেষণা অধ্যাপক মার্ক বসলো এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমরা বেশ জোরালভাবেই নিশ্চিত যে এটি একটি মেটিওরিটিক এয়ারবার্স্ট বা বায়ুমণ্ডলীয় উল্কাবিস্ফোরণ ছিল।’
মার্ক বসলো আরও বলেন, ‘এ ঘটনার ভয়াবহতার মাত্রা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। বস্তুটি আসলে কোনো গ্রহাণু নাকি ধূমকেতু ছিল, তা আমরা জানি না। তাই ঢালাওভাবে বোঝাতে আমি ‘মেটিওরিটিক’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটি ঠিক কখন ঘটেছিল ও কোন দিক থেকে এসেছিল, তা আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানি। তবে বস্তুটির গতিবেগ বা এর ভৌত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের জানা নেই।’
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আড়ালে থাকা রহস্য
বিস্ফোরণটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হতেই প্রায় ২০ বছর লেগে যায়। এর পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব ও পরে গৃহযুদ্ধের কারণে সাইবেরিয়ার এ নির্জন বনাঞ্চলের দিকে কারও নজর দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
১৯২১ সালে সোভিয়েত একাডেমি অব সায়েন্সেস ভূবিজ্ঞানী লিওনিড কুলিককে ওই এলাকায় পাঠায়। কিন্তু দুর্গম পথ ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। অবশেষে ঘটনার ১৯ বছর পর ১৯২৭ সালে সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন তিনি।
আধুনিক কম্পিউটার মডেলিংয়ের বহু আগেই তুঙ্গুসকার বাসিন্দারা যা দেখেছিলেন, তার বিবরণ দিয়ে গেছেন। তাঁদের সেই বর্ণনায় আগুনের এক বিশাল স্তম্ভ, একের পর এক বিকট বজ্রধ্বনি এবং দিনের পর দিন রাতের আকাশ উজ্জ্বল হয়ে থাকার কথা বলা হয়েছিল। আশ্চর্যজনক বিষয়, আধুনিক পদার্থবিদ্যা এখন সেই পর্যবেক্ষণগুলো পুরোপুরি সমর্থন করে।
দীর্ঘ দুই দশক পরও বনাঞ্চলে সেই বড় বিস্ফোরণের স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন রয়ে গিয়েছিল। বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরবর্তী সময়ে চিহ্নিত এলাকার কাছাকাছি গাছগুলো সোজা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনো ডালপালা বা ছাল ছিল না। অনেক গাছে পুড়ে যাওয়ার দাগও ছিল। তবে বারবার অভিযান চালানো সত্ত্বেও কুলিক সেখানে কোনো গর্ত বা উল্কাপিণ্ডের বড় কোনো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাননি, যা পাওয়ার আশা অনেকেই করেছিলেন।
কানাডীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মার্টিন কনোর্স মনে করেন, অনুসন্ধানের এ দীর্ঘ বিলম্বই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীদের বিতর্কের গতিপথ ঠিক করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ঘটনা সম্পর্কে কত কম জানি এবং এটি নিয়ে এখনো কত বিতর্ক রয়ে গেছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। অত্যন্ত দুর্গম অবস্থানের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গবেষণা করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার অনেক বছর পর এটি নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয়।’
শুরুর দিকে কোনো গর্তের সন্ধান না পাওয়ার বিষয়টি উল্কাপিণ্ডের আঘাত সম্পর্কে তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে মেলানো অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। কনোর্স বলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। চাঁদের বুকে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে যা ঘটে, অর্থাৎ একটি গর্ত তৈরি হওয়া এবং তার অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে থাকা—বিজ্ঞানীরা এখানেও তেমন কিছুই আশা করেছিলেন। কারণ, সেই সময়ে বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণের ধারণা বিজ্ঞানীদের কাছে তেমন পরিচিত ছিল না।’
এই অধ্যাপক জানান, তুঙ্গুসকার এ ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে বিস্ফোরক প্রযুক্তির উন্নয়ন বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণও কতটা মারাত্মক হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য কোনো বস্তুর সরাসরি মাটিতে এসে আঘাত করার প্রয়োজন নেই।’
তবে এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি প্রথম দিকের কোনো অভিযান থেকে আসেনি। বরং তা জানা গিয়েছিল পরে আকাশ থেকে তোলা কিছু আলোকচিত্রের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে ২৩ থেকে ৫৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাসে লাখ লাখ গাছ উপড়ে পড়ে আছে। এই পুরো এলাকার আয়তন ছিল প্রায় ২ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটার।
অধ্যাপক মার্ক বসলো বলেন, ‘তুঙ্গুসকা ঘটনার ক্ষেত্রে এ প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাস অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এক আবিষ্কার। এটি গবেষণাগারে পরীক্ষা ও কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে হুবহু তৈরি করে দেখা সম্ভব। এটি আমাদের জানায় যে মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফলে হওয়া বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণগুলো পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়ে বেশ আলাদা হয়।’
বসলো আরও বলেন, ‘এ প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাসের আকার ও ধরনটি মূলত নির্ভর করে ধেয়ে আসা বস্তুর শক্তি এবং সেটি কত ডিগ্রি কোণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল তার ওপর। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের মহাজাগতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দুর্যোগের পরিকল্পনা করার জন্য আমরা বিন্যাসটি ব্যবহার করতে পারি। এর মাধ্যমে কোন এলাকা কতটা বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।’
বিচিত্র বিষয় হলো, প্রচলিত কোনো প্রমাণ বা উল্কাপিণ্ডের অবশিষ্টাংশ না পাওয়ার বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত এ ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছিল।
অধ্যাপক বসলো বলেন, ‘প্রথম দিকের অভিযানগুলো কাঙ্ক্ষিত গর্ত বা উল্কাপিণ্ডের কোনো খণ্ড খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি আসে তখন, যখন আকাশ থেকে তোলা প্রথম আলোকচিত্রগুলো সামনে আসে। সেখানে দেখা যায়, বনের সব গাছ একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু থেকে বাইরের দিকে মুখ করে উপড়ে পড়ে আছে।’
ড. বসলো এটিকে ‘এটি যে একটি বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ছিল, তার প্রথম বড় সূত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
চেলিয়াবিনস্ক থেকে পাওয়া সম্ভাব্য সূত্র
তুঙ্গুসকা ঘটনার এক শতাব্দীর বেশি সময় পর, রাশিয়ার আকাশেই আরেকটি মহাজাগতিক বস্তু প্রবেশ করেছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চেলিয়াবিনস্কের আকাশে একটি গ্রহাণুর বিস্ফোরণ ঘটে। ইন্টারনেটে সেই ঘটনার দৃশ্যগুলো অনেককে মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছিল।
চেলিয়াবিনস্কের সেই বিস্ফোরণ তুঙ্গুসকার চেয়ে আকারে অনেক ছোট ছিল। তবু এটি বহু মানুষকে আহত এবং ঘরবাড়ির জানালার কাচ ভেঙে চুরমার করে দেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ছিল এটি। এ বিস্ফোরণের ফলে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের বহু ধারণা নতুন করে যাচাই করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়।
মার্ক বসলো বলেন, ‘তুঙ্গুসকার বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ চেলিয়াবিনস্কের ঘটনার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ (বা তারও বেশি) শক্তিশালী ছিল। এটি আরও খাড়া কোণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল এবং অনেক গভীরে চলে এসেছিল। ফলে বিস্ফোরণটি ভূপৃষ্ঠের বেশ কাছাকাছি ঘটেছিল। কম উচ্চতা ও আকারে বড় বিস্ফোরণ হওয়ায় চেলিয়াবিনস্কের তুলনায় তুঙ্গুসকার ঘটনায় ভূপৃষ্ঠে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।’
চেলিয়াবিনস্কের ঘটনাটি গবেষকদের মনে দানা বাঁধা আরেকটি সন্দেহকেও সত্যি বলে প্রমাণ করেছে। মার্ক বসলো বলেন, ‘ঘটনাটি আমাদের এই ধারণাকে আরও জোরাল করেছে যে বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ বা এয়ারবার্স্ট আমরা আগে যা ভাবতাম, তার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। এটি সুপারকম্পিউটারের তৈরি করা মডেল বা সিমুলেশনের ফলাফলগুলোর ওপর আমাদের বিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
ড. কনোর্স বলেন, ‘দুটি ঘটনাই ছিল মূলত বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ। তবে চেলিয়াবিনস্কের ঘটনার পর তুলনামূলক ছোট একটি উল্কাপিণ্ডের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। অন্যদিকে চেলিয়াবিনস্কের চেয়ে আকারে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও তুঙ্গুসকা ঘটনা থেকে আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘চেলিয়াবিনস্কে মূলত জানালার কাচের মতো সহজে ভেঙে যায় এমন জিনিসপত্র ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু তুঙ্গুসকায় আস্ত বনাঞ্চল মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত, তুঙ্গুসকার কাছাকাছি কোনো জনবসতি বা শহর ছিল না। যদি চেলিয়াবিনস্কের মতো কোনো বড় শহর সেখানে থাকত, তবে মানুষের প্রাণহানি হতো কল্পনাতীত।’
দানবীয় শক্তিতে কী ধেয়ে এসেছিল
তুঙ্গুসকা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিতর্কগুলোর একটি হলো, আসলে কোন বস্তু ধেয়ে এসেছিল? সেটি কি কোনো গ্রহাণু ছিল, নাকি ধূমকেতু? সূত্রের খোঁজে বিজ্ঞানীরা ঘটনাস্থলের গাছের আঠা, পিট কয়লার স্তর, আণুবীক্ষণিক কণা এবং আইসোটোপের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট উত্তরটি এখনো পাওয়া যায়নি।
মার্ক বসলো বলেন, ‘আমার মতে, এ বিতর্ককে একটু বেশিই বাড়িয়ে দেখা হয়েছে। গ্রহাণু ও ধূমকেতুর মধ্যকার পার্থক্য খুব অস্পষ্ট। কারণ, ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ অনেক সময় কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে গ্রহাণুর মতো আচরণ করতে পারে। আবার সময়ের সঙ্গে ধূমকেতুর বাষ্পীয় উপাদানগুলো উবে যাওয়ার পর সেগুলো দেখতে পুরোপুরি গ্রহাণুর মতোই হয়ে যায়।’
মার্ক বসলো আরও বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠ থেকে সংগ্রহ করা অনেক উপাদানকে ভুলবশত ১৯০৮ সালের ওই ঘটনার অংশ বলে মনে করা হয়েছে। অথচ সেগুলো প্রতিনিয়ত পৃথিবীজুড়ে ঝরে পড়া সাধারণ মহাজাগতিক ধূলিকণা বা উল্কার অংশও হতে পারে।’
কনোর্সও এ বিষয়ে তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এ ঘটনার ওপর বিগত প্রায় ১০০ বছরের গবেষণার এক বিশাল ও জটিল সাহিত্য বা নথিপত্র রয়েছে। তবে সংগৃহীত প্রমাণগুলোর কোনোটি দিয়েই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
আধুনিক কম্পিউটার মডেলিংয়ের বহু আগেই তুঙ্গুসকা অঞ্চলের বাসিন্দারা যা দেখেছিলেন, তার বিবরণ দিয়ে গেছেন। তাঁদের সেই বর্ণনায় আগুনের এক বিশাল স্তম্ভ, একের পর এক বিকট বজ্রধ্বনি এবং দিনের পর দিন রাতের আকাশ উজ্জ্বল হয়ে থাকার কথা বলা হয়েছিল। আশ্চর্যজনক বিষয়, আধুনিক পদার্থবিদ্যা এখন সেই পর্যবেক্ষণগুলো পুরোপুরি সমর্থন করে।
মার্ক বসলো বলেন, ‘আগুনের সেই স্তম্ভের বিষয়টি মূলত ধেয়ে আসা উল্কাপিণ্ডের বাষ্পীভূত জ্বলন্ত উপাদানের সঙ্গে মিলে যায়, যা বস্তুটির বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পথ দিয়ে তীব্র বেগে ওপরের দিকে ছিটকে উঠেছিল। আর একের পর এক বিকট শব্দ হওয়ার কারণ হলো, বস্তুটি বায়ুমণ্ডলে ভেঙে টুকরা টুকরা হওয়ার সময় বিভিন্ন অংশ থেকে আলাদা আলাদা সময়ে তৈরি হওয়া শব্দের তীব্র ধাক্কা বা সনিক বুম।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে দিনের পর দিন রাতের আকাশ উজ্জ্বল থাকার বিষয়টি ১৯৯৪ সালে বৃহস্পতি গ্রহে ‘শুমেকার-লেভি ৯’ ধূমকেতুর আঘাত হানার আগপর্যন্ত এক রহস্যই ছিল। ওই ঘটনার সময় আমরা দেখেছিলাম, মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফলে ধ্বংসাবশেষের এক বিশাল মেঘ বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়ে একটি নৈশোজ্জ্বল মেঘ তৈরি করে। আমরা ১৯৯৭ সালে তুঙ্গুসকার ক্ষেত্রেও এ ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেছিলাম এবং আমি মনে করি, এটি এখন সবার কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য।’
কনোর্স বলেন, আকাশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠার এ দৃশ্য শুধু সাইবেরিয়াতেই নয়, বরং তার চেয়ে অনেক দূর থেকে দেখা গিয়েছিল। এমনকি সেই উজ্জ্বল আকাশ সারা বিশ্ব থেকে দেখা গিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, বিস্ফোরণের ধূলিকণা বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে পৌঁছে গিয়েছিল এবং পরে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
এমন ঘটনা কি আবার ঘটতে পারে
তুঙ্গুসকার ঘটনাকে এখন আর শুধু ইতিহাসের একটি বিচ্ছিন্ন বা অদ্ভুত ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না। বিজ্ঞানীরা জানেন, ছোট আকারের মহাজাগতিক বস্তু নিয়মিতই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং এগুলোর বেশির ভাগই কোনো ক্ষতি না করে বাতাসে মিলিয়ে যায়।
আসল দুশ্চিন্তা হলো, সেসব বড় বস্তুকে নিয়ে, যেগুলো ধ্বংসাত্মক বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো সময় পর্যন্ত টিকে থাকে। এ ধরনের বিপদের ক্ষেত্রে কতক্ষণ আগে সতর্কসংকেত পাওয়া যাবে, তা মূলত নির্ভর করে বস্তুটি কোন দিক থেকে ধেয়ে আসছে তার ওপর।
মার্ক বসলো বলেন, ‘টেলিস্কোপের বর্তমান পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা অনুযায়ী, কোনো বস্তু যদি দিনের বেলার আকাশ দিয়ে ধেয়ে আসে (যেমন তুঙ্গুসকা ও চেলিয়াবিনস্কের ক্ষেত্রে হয়েছে), তবে কয়েক বছর আগে রাতের আকাশে সেটি ধরা না পড়লে কোনো আগাম সতর্কতা পাওয়া সম্ভব নয়।
তবে ‘নিও সার্ভেয়ার’ চালুর পর এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে। কারণ, এটি অন্য দিক থেকে আসা বস্তুও শনাক্ত করতে পারবে। তুঙ্গুসকার বস্তুটি কোনো মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের অংশ ছিল কি না এবং যদি তা-ই হয়, তবে তার বাকি অংশগুলো কবে ফিরে আসতে পারে, তা নিয়ে ভাবাটা বেশ রোমাঞ্চকর।
মার্ক বসলোর মতে, তুঙ্গুসকার বস্তুটি যদি পৃথিবীর সঙ্গে ৬১ বছরের কক্ষপথের সামঞ্জস্য থাকা কোনো বস্তুপুঞ্জের অংশ হয়ে থাকে, তবে এর সঙ্গী বস্তুগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ফিরে আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বস্তু থাকলে তা ১৯৬৯ সালের জুনে একবার ফিরে এসেছিল এবং ২০৩০ সালের জুনে আবার ফিরে আসবে।’
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্








