আট জুলাই গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) ২৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। রজতজয়ন্তীর এই মুহূর্তে অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে গবেষণামুখী, আধুনিক ও শিক্ষার্থী-বান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গোবিপ্রবিকে গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
দীর্ঘ এ পথচলায় পাঠক্রম বিন্যাস, সেশনজট নিরসন, আবাসন সুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবহন ও চিকিৎসাসেবা, ক্রীড়া এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে অর্জনের পাশাপাশি এখনো রয়ে গেছে নানা সীমাবদ্ধতা। শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান, গবেষণার প্রসার এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সেই প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাই অতীতের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা সবার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন রাইজিংবিডির বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি টি. এ. এস. মুছাদ্দিক।
শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশা
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী এহসানুল হক রকি বলেন "প্রাণের এই বিদ্যাপীঠের ২৫ বছরে পদার্পণের সাক্ষী হতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত। বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়তন ছোট হওয়ায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যে রয়েছে বন্ধুসুলভ আচরণ ও দৃঢ় বন্ধন। প্রাপ্তির খাতায় প্রতিনিয়তই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন অর্জন যুক্ত হচ্ছে। ডিজিটাল ক্লাসরুম, নিরাপদ ক্যাম্পাস, স্বাস্থ্যকর ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠা এবং নতুন নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক, সাংগঠনিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমেও বরাবরই অনেকটা এগিয়ে রয়েছে গোবিপ্রবি। সামনের দিনগুলোতেও গোবিপ্রবির এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশ-বিদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়টির ঐতিহ্যময় খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে।"
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাছিন জায়েফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে নানা ধরনের সংকট ও অনিয়ম। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে গবেষণা খাত। তাই গোবিপ্রবির গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও গোবিপ্রবির ওয়েবসাইট এখনো মানসম্মত ও আধুনিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে চাহিদা অনুযায়ী বই নেই। চিকিৎসাকেন্দ্রে পাওয়া যায় না মানসম্মত ও জরুরি চিকিৎসাসেবা। সার্টিফিকেট তুলতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।”
শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এছাড়া আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। সব আবাসিক হলে দ্রুতগতির ওয়াই-ফাই নিশ্চিত করতে হবে। ডাইনিং ও ক্যান্টিনে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত খাবার খেতে পারে। আশা করি, এসব সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং অপূর্ণতাগুলো কাটিয়ে এগিয়ে যাবে গোবিপ্রবি। আমাদের সবার কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আমাদের প্রিয় গোবিপ্রবি।"
ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের স্বর্ণলতা সরকার বলেন, “প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং আগামী দিনের স্বপ্নকে নতুন করে দেখার দিন। আজ আমি গোবিপ্রবিকে দেখি ঠিক একটি সংবাদপত্রের মতো—যেখানে প্রথম পাতায় আছে সাফল্যের খবর, ভেতরের পাতায় আছে কিছু অমীমাংসিত সংকট, আর শেষ পাতায় লেখা আছে আগামী দিনের সম্ভাবনার গল্প।”
তার ভাষ্যে, “গোবিপ্রবি আজ দেশের উচ্চশিক্ষায় একটি পরিচিত নাম। নতুন ভবন, একাডেমিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাফল্য আমাদের গর্বিত করে। ক্যাম্পাসের খোলা পরিবেশ, আন্তরিক শিক্ষক এবং বন্ধুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে সুন্দর করে তোলে। ব্যক্তিগতভাবে বাসে করে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগে। প্রতিদিনের সেই যাত্রা যেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়। তবে পরিবর্তনের গল্প তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মৌলিক প্রয়োজনগুলোও নিশ্চিত হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশরুম, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ এবং আধুনিক ল্যাব সুবিধা এখন সময়ের দাবি।”
তিনি আরো বলেন, “আর একটি বিষয় আমাকে সত্যিই অবাক করে। বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল, অথচ আমাদের ক্যাম্পাসে একটি কাঁঠালগাছও নেই! এটি হয়তো ছোট একটি বিষয়, কিন্তু এর মধ্যেই পরিবেশ, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের একটি বার্তা লুকিয়ে আছে। আমরা চাই আরও সবুজ, আরও প্রাণবন্ত একটি ক্যাম্পাস। আমাদের স্বপ্ন, আগামী দিনে গোবিপ্রবি হবে একটি স্মার্ট, গবেষণামুখী এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়; যেখানে আধুনিক ল্যাব, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত পরিবহন, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং সবুজ ক্যাম্পাস মিলিয়ে গড়ে উঠবে একটি আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমাদের প্রত্যাশা—আমরা শুধু অতীতের সাফল্য উদযাপন করব না, বরং ভবিষ্যতের দায়িত্বও গ্রহণ করব। কারণ আজকের ছোট ছোট পরিবর্তনই আগামী দিনের বড় সাফল্যের ভিত্তি।"
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত আলম ভাষ্য "অনেক অপ্রাপ্তি আছে, অনেক অভিযোগে পূর্ণ আমার নিজের ক্যাম্পাস। কখনো কখনো অভিমান করে বসি। তবে দিনশেষে আমাদের ঠিকানা এই চারণভূমিটাই। একেই আমি পরিচয় করিয়ে দেব আপন ঠিকানা রূপে। শত অভিমান, অপ্রাপ্তি, ভালো লাগা আর অর্জন মিশিয়ে দিনশেষে আমার ক্যাম্পাসই আমার পরিচয়। দেখতে দেখতে রজতজয়ন্তী চলে এলো। সেদিন শূন্য থেকে শুরু হওয়া এই ক্যাম্পাস দেখতে দেখতে আজ প্রায় পূর্ণ। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আপন ঠিকানা হয়ে উঠছে, শত শত শিক্ষার্থীকে স্বপ্ন দেখিয়েছে, স্বপ্নচারীদের স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখতে শিখিয়েছে। আরও দুর্দান্ত গতিতে ছুটে যাক, অগ্রগামী গন্তব্যে পৌঁছে দিক তাকে ধারণ করা শিক্ষার্থীদের ও স্বপ্নচারীদের।”
তিনি আরো বলেন, “নতুন গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাসে শুরুতে হয়তো এতটা সুন্দর পরিবেশ ছিল না। কিন্তু আজ এখানে কী নেই? মাঠ, ঘাট, সুন্দর পরিবেশ—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস আজ ভরপুর। আপন ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইঞ্চি পূর্ণ হোক পুণ্য দিয়ে। রজতজয়ন্তীর ক্ষণে এই আমাদের প্রত্যাশা।”








