ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে ৩ হাজার ২০০ পাউন্ড ওজনের একটি বিশাল অবজারভেটরি। নাম নিল গেহ্‌রেলস সুইফট অবজারভেটরি। প্রায় ২২ বছর ধরে এটি মহাকাশের হাজারো অজানা রহস্য ভেদ করে চলেছে। কিন্তু এখন সে নিজেই এক চরম সংকটের মুখে। বায়ুমণ্ডলের টান ও সাম্প্রতিক সৌরঝড়ের প্রভাবে এটি তার নির্ধারিত কক্ষপথ থেকে বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে গেছে। নাসা হিসাব করে দেখেছে, বাইরে থেকে কেউ গিয়ে যদি একে টেনে না তোলে, তবে এটি শিগগিরিই পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে ছাই হয়ে যাবে।

কিন্তু মহাকাশে গিয়ে একটি চলন্ত স্যাটেলাইটকে ধরে টেনে তোলা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! তাও আবার এমন একটি স্যাটেলাইট, যাকে মহাকাশে মেরামতের জন্য তৈরিই করা হয়নি। তবু নাসা হাল ছাড়তে রাজি নয়। মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি উদ্ধার অভিযানের সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে তারা।

জাতীয় মানমন্দির কেন প্রয়োজন
সূর্য তার নিজস্ব ১১ বছরের চক্রের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে ২০২৪ সালে। এ সময় সূর্য থেকে তীব্র সৌরঝড় বেরিয়ে আসে।

নেপথ্যের খলনায়ক সূর্য

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ২২ বছর ধরে যে স্যাটেলাইটটি ঠিকঠাক ঘুরছিল, সে হঠাৎ নিচে নেমে আসছে কেন? পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা সব স্যাটেলাইটকেই বায়ুমণ্ডলের একধরনের প্রাকৃতিক ঘর্ষণ সহ্য করতে হয়। বিশেষ করে যাদের নিজস্ব কোনো ইঞ্জিন নেই, তারা ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে। সুইফটের ক্ষেত্রে এই নিচে নামার গতি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে খোদ আমাদের সূর্য।

সূর্য তার নিজস্ব ১১ বছরের চক্রের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে ২০২৪ সালে। এ সময় সূর্য থেকে তীব্র সৌরঝড় বেরিয়ে আসে। এই প্রবল বিকিরণের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা প্রসারিত হয়ে যায়। বায়ুমণ্ডল প্রসারিত হওয়ার কারণেই সুইফটের ওপর ঘর্ষণের মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ইবারলি কলেজ অব সায়েন্সের গবেষকরা সুইফটের শক্তি ব্যবহার কমিয়ে একে কিছুটা সুরক্ষিত অবস্থানে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি। সুইফট এর মধ্যেই মাটি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উচ্চতার একটি বিপজ্জনক সীমানার নিচে নেমে গেছে।

মূল কাজ শুরুর আগেই ১১ হাজার গ্রহাণু আবিষ্কার করেছে ভেরা সি. রুবিন মানমন্দির
পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা সব স্যাটেলাইটকেই বায়ুমণ্ডলের একধরনের প্রাকৃতিক ঘর্ষণ সহ্য করতে হয়। বিশেষ করে যাদের নিজস্ব কোনো ইঞ্জিন নেই, তারা ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে।

৯ মাসের অসম্ভব মিশন

সুইফটের এই অকালমৃত্যু ঠেকাতে নাসা বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। নাসার অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পরিচালক শন ডোমাগাল-গোল্ডম্যান গত জুনের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘কক্ষপথ থেকে কোনো কিছু নিচে নেমে এলেই যে তাকে টেনে তুলতে হবে, আমরা এমন কোনো রীতি তৈরি করতে চাইনি। কিন্তু সুইফট কোনো সাধারণ মহাকাশযান নয়; অ্যাস্ট্রোফিজিকসের ক্ষেত্রে এর ক্ষমতা একেবারেই অনন্য।’

এই অনন্য মানমন্দিরকে বাঁচাতে নাসা গত সেপ্টেম্বরে অ্যারিজোনার প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট স্পেস টেকনোলজিসকে দায়িত্ব দেয়। তাদের হাতে সময় দেওয়া হয় মাত্র নয় মাস! এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের এমন একটি মহাকাশযান বানিয়ে উৎক্ষেপণ করতে হতো, যা মহাকাশে গিয়ে সুইফটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তাকে ওপরের দিকে ঠেলে তুলতে পারবে।

উদ্ধার অভিযানের জন্য তৈরি রোবোটিক স্যাটেলাইটটির নাম দেওয়া হয় লিংক। এর উৎক্ষেপণের পদ্ধতিটাও ছিল রীতিমতো রোমাঞ্চকর। সাধারণ রকেটের মতো এটি মাটি থেকে ওড়েনি।

এল-১০১১ মডেলের বিমান থেকেই নিচে ফেলা হয় নর্থরোপ গ্রুম্যান কোম্পানির পেগাসাস এক্সএল নামে একটি রকেট

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে মার্শাল আইল্যান্ডসের কোয়াজালেইন অ্যাটলের ঠিক ৪০ হাজার ফুট ওপরে উড়ছিল স্টারগেজার নামে একটি এল-১০১১ মডেলের বিশেষ বিমান। এই বিমান থেকেই নিচে ফেলা হয় নর্থরোপ গ্রুম্যান কোম্পানির পেগাসাস এক্সএল নামে একটি রকেট। শুক্রবার ইস্টার্ন টাইম ভোর ৪টা ৩৬ মিনিটে মাঝ আকাশে রকেটের ইঞ্জিন জ্বলে ওঠে এবং সেটি লিংক স্যাটেলাইটটিকে সরাসরি সুইফটের কক্ষপথে পৌঁছে দেয়। খারাপ আবহাওয়া এবং একটি সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে আগের দিন উৎক্ষেপণ বাতিল করতে হয়েছিল। তবে দ্রুত আপডেট দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়। কক্ষপথে পৌঁছানোর পরপরই গ্রাউন্ড টিমের সঙ্গে লিংকের সফল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।

দূরবীক্ষণ ও মানমন্দির
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে মার্শাল আইল্যান্ডসের কোয়াজালেইন অ্যাটলের ঠিক ৪০ হাজার ফুট ওপরে উড়ছিল স্টারগেজার নামে একটি এল-১০১১ মডেলের বিশেষ বিমান।

সুইফটকে ধরার চ্যালেঞ্জ

লিংক স্যাটেলাইটটির আকার সুইফটের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। ওজন প্রায় ৪০০ কেজি। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট। শক্তির জন্য এতে ২০ ফুটের সোলার প্যানেল ও সুইফটকে জাপটে ধরার জন্য তিনটি রোবোটিক হাত লাগানো আছে।

মহাকাশে পৌঁছানোর পর লিংক প্রথম কয়েক সপ্তাহ তার সেন্সর এবং নেভিগেশন সিস্টেম পরীক্ষা করবে। এরপর সে সুইফটের চারপাশ ঘুরে দেখবে, ঠিক কোন জায়গাটি ধরে তাকে টানা যায়। এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় বিপদের শঙ্কা। ক্যাটালিস্ট স্পেসের বিজ্ঞানীরা সুইফটের কিছু শক্ত জায়গা চিহ্নিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু ২২ বছর ধরে মহাকাশের বৈরী পরিবেশে থাকার কারণে সুইফটের বহিরাবরণ এখন আর আগের মতো নেই।

ক্যাটালিস্ট স্পেসের প্রধান গবেষক কিরান উইলসনের ভাষায়, হাবল টেলিস্কোপ মেরামতের সময় নভোচারীরা দেখেছিলেন, ওই আবরণটি কাচের মতো অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে যায়। সামান্য স্পর্শ লাগলেই তা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে। ২০ বছর আগে লাগানো সেই প্লাস্টিকের আবরণ এখন আর নমনীয় নেই। তাই লিংকের রোবোটিক হাতগুলোকে চরম সতর্কতার সঙ্গে সুইফটকে ধরতে হবে।

যন্তর-মন্তর ও ভেইনু বাপ্পু মানমন্দির
ক্যাটালিস্ট স্পেসের বিজ্ঞানীরা সুইফটের কিছু শক্ত জায়গা চিহ্নিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু ২২ বছর ধরে মহাকাশের বৈরী পরিবেশে থাকার কারণে সুইফটের বহিরাবরণ এখন আর আগের মতো নেই।

খুব সাবধানে সুইফটকে ধরার পর লিংক তার তিনটি আয়ন থ্রাস্টার চালু করবে। এরপর আগামী দুই থেকে তিন মাস ধরে খুব ধীরে ধীরে এটি সুইফটকে ঠেলে ৬০০ কিলোমিটার ওপরের নিরাপদ কক্ষপথে পৌঁছে দেবে। কাজ শেষ হলে লিংক নিজেকে সুইফট থেকে আলাদা করে নেবে এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে নিজে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। নিজের জীবন দিয়ে সে বাঁচিয়ে দিয়ে আসবে সুইফটকে।

ক্যাটালিস্ট স্পেসের সিইও ঘোনহি লি বলেন, ‘সুইফটকে মেরামতের জন্য তৈরি করা হয়নি। আমরা যদি দ্রুত এবং কম খরচে এর আয়ু বাড়াতে পারি, তবে এটি ভবিষ্যতে অন্যান্য স্যাটেলাইট মেরামতের একটি ব্লু-প্রিন্ট হয়ে থাকবে। মহাকাশে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে স্যাটেলাইটগুলোর অবস্থান পরিবর্তন, মেরামত বা রিফুয়েলিং করার এই প্রযুক্তি আমাদের লাগবেই।’

উইলসন ও পালোমার পর্বত মানমন্দির
সুইফটের প্রধান গবেষক এস. ব্র্যাডলি সেনকো জানান, ‘সুইফট এ পর্যন্ত এমন ২ হাজারেরও বেশি উচ্চশক্তির বিস্ফোরণের উৎস খুঁজে পেয়েছে।’

কেন সুইফট এত মূল্যবান

এত ঝুঁকি নিয়ে, এত কাঠখড় পুড়িয়ে একটি পুরোনো মানমন্দির বাঁচানোর আসল কারণটি লুকিয়ে আছে এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের মধ্যে। ২০০৪ সালে এটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল গামা-রে বার্স্ট বা মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর বিস্ফোরণগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য। সুইফটের প্রধান গবেষক এস. ব্র্যাডলি সেনকো জানান, ‘সুইফট এ পর্যন্ত এমন ২ হাজারেরও বেশি উচ্চশক্তির বিস্ফোরণের উৎস খুঁজে পেয়েছে।’ মজার ব্যাপার হলো, এই প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণগুলো থেকেই মহাবিশ্বে সোনা বা প্ল্যাটিনামের মতো ভারী মৌলগুলো তৈরি হয়।

মহাকাশে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সুইফট হলো নাসার জরুরি সাড়াদানকারী যান। হাবল টেলিস্কোপের ছবি হয়তো অনেক বেশি স্পষ্ট, কিন্তু কোনো একটি নতুন লক্ষ্যবস্তুর দিকে ঘুরে তাকাতে হাবলের এক থেকে দুই দিন সময় লেগে যায়। অন্যদিকে দ্রুতগামী সুইফট পাখির নামে নাম রাখা এই স্যাটেলাইটটি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই যেকোনো দিকে ঘুরে যেতে পারে!

উদ্ধার অভিযানটি সফল হলে এ বছরের মধ্যেই সুইফট তার পুরোনো রূপে বিজ্ঞান গবেষণায় ফিরে আসবে। তখন হাবল, জেমস ওয়েব কিংবা ভবিষ্যতের ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে কাজ করে যাবে।

তবে মহাকাশের এই রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযানের শেষটা কেমন হয়, লিংকের রোবোটিক হাতগুলো সত্যিই সুইফটকে পতন থেকে বাঁচাতে পারে কি না; সেটা দেখার জন্য বিজ্ঞানীদের আরও কয়েক মাস রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: সিএনএন

টাইকো ও গ্যালিলিওর মানমন্দির