বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে গিয়ে দুর্যোগের কবলে পড়ে প্রতিবছর নিখোঁজ হন বরগুনার পাথরঘাটার অসংখ্য জেলে। গত ৩৩ বছরে সাগরে গিয়ে ১৯২ জনের বেশি জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম দারিদ্র্যসহ নানা সংকট ও উৎকণ্ঠায় দিন পার করতে হচ্ছে তাঁদের পরিবারের।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বঙ্গোপসাগরে ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড়ে সাগরে নিখোঁজ হন ৯১ জন জেলে। এ ছাড়া ১৯৯৩ সালে ৫ জন, ১৯৯৪ সালে ২ জন, ২০০১ সালে ৫ জন, ২০০৬ সালে ১৪ জন, ২০১৪ সালে ৭ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হন।
সর্বশেষ চলতি বছরের ২৪ আগস্ট বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ‘এফবি বরকত’ ট্রলারডুবির ঘটনায় পাঁচ জেলে নিখোঁজ হন। পরে একজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও অন্যদের সন্ধান মেলেনি। এতে উপজেলা প্রশাসনের তালিকাভুক্ত নিখোঁজ জেলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯২ জনে।
সাগরে নিখোঁজ জেলে ইউসুফ আলীর পরিবারের সদস্য সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁর ছোট ভাই ইয়াকুব আলী বলেন, ‘ভাই দুই সন্তান রেখে সাগরে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। বাচ্চাগুলো সারা দিন বাবা বাবা করে কান্না করে। জীবিত আছে না মারা গেছে—এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটে আমাদের।’
সদর ইউনিয়নের রুহিতা গ্রামের নিখোঁজ জেলে কালু মাঝির মেয়ে ফাহিমা রিমু বলেন, ‘বাবা গেছে তিন বছর। প্রতিদিন মনে হয় দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক দেবে-“মা, আইছি”। আমরা না খেয়ে দিন কাটাই। মা অসুস্থ, ওষুধ কেনারও টাকা নেই। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাই না। আমাদের মতো যেন আর কোনো সন্তান বাবা হারিয়ে না কাঁদে।’
জেলে ও সংশ্লিষ্টদের মতে, গভীর সমুদ্রে অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও রেডিও যোগাযোগ কার্যকর না থাকায় আবহাওয়ার সতর্কবার্তা সময়মতো জেলেদের কাছে পৌঁছায় না। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ায় দিক হারিয়ে ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়ে অনেক জেলে আটক হন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় মিধিলির সময় নিখোঁজ হন বরগুনার ১৭ জেলে। প্রায় দুই বছর পর তাদের সন্ধান পাওয়া যায় ভারতের গুজরাটের একটি কারাগারে। একই বছরের ১৫ আগস্ট সাগরে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে ভাসতে ভারতের জলসীমায় চলে যায়। ট্রলার থেকে ১১ জেলেকে আটক করে ভারতীয় আইনে সাজা দেওয়া হয়। অন্য দেশের জলসীমায় আটক থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাগরে নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজের পর মৃত্যু সনদ পাওয়া যায় না। মরদেহ উদ্ধার না হওয়ায় অনেক পরিবার সরকারি সহায়তা, উত্তরাধিকার, ব্যাংক হিসাব, জমিজমা ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতার মুখে পড়ে। ফলে স্বজন হারানোর কষ্টের পাশাপাশি কাগজপত্রের জটিলতাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁদের।
জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সহসভাপতি আবুল হোসেন ফরাজী অভিযোগ করে বলেন, সাগরে দুর্ঘটনায় পড়া জেলেদের উদ্ধারে অতীতেও আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাইনি। দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের অভাবে অনেক সময় নিখোঁজ জেলেদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জেলেদের নিরাপত্তায় সরকারের কাছে একটি ‘সেফটি সেল’ গঠনের দাবি জানানো হলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গভীর সমুদ্রে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া ইনচার্জ মোহাম্মদ রায়হান বলেন, গভীর সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় নানা জটিলতা রয়েছে। এ ছাড়া অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ধারকারী সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে গভীর সমুদ্রে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।
জেলা প্রশাসক তাসলিমা আক্তার বলেন, সাগরে জেলে নিখোঁজের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ায় জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের পাশে প্রশাসন থাকবে।
প্রশাসক আরও বলেন, নিখোঁজ জেলেদের পরিবার যেন মৃত্যু সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে না পড়ে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে জেলেদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।








