একসময় মাস শেষে হাতে আসত মাত্র ৪০ রুপি। সেই সামান্য আয়ে সংসার চালানোই ছিল কঠিন। এমন দিনও গেছে, যখন এক বেলা খাবার জোটেনি। পানি খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তে হয়েছে। থাকার জায়গা বলতে ছিল একটি গাড়ির গ্যারেজ। সেখানে ছিল না শৌচাগার, ছিল না গোসলের ব্যবস্থা। সেই মানুষই আজ তেলুগু চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা, প্রযোজক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বাস এখন হায়দরাবাদের জালপল্লিতে ১০ একরের বিলাসবহুল এস্টেটে।
তিনি মোহন বাবু। পাঁচ দশকের বেশি অভিনয়জীবনে তিনি যেমন খ্যাতি অর্জন করেছেন, তেমনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্য। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত সংগ্রাম। শূন্য থেকে উঠে এসে যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম অনুপ্রেরণার গল্প।
বাবার কাছ থেকেই শৃঙ্খলার শিক্ষা
মোহন বাবুর বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক, পাশাপাশি মঞ্চনাটকের অভিনেতা। সেই বাবার কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মসম্মানের মূল্য।
কর্মজীবনের শুরুতে মোহন বাবুও ছিলেন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক। মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৪০ রুপি। অথচ সেই সময় তাঁর বাবার মাসিক আয়ও ছিল মাত্র ১৮০ রুপি। এত সীমিত আয়ের মধ্যেও ছেলের অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণে একটি বিজ্ঞাপন দেখে ৫০ রুপি খরচ করে অডিশনের আবেদন পাঠিয়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় মোহন বাবুর জীবন।
অভিনেতার ভাষায়, জীবনে এমন সময় গেছে, যখন একটি মাত্র পোশাক ছিল। একটি বেলা খাবারও জোটেনি। রাতভর শুধু পানি খেয়ে ঘুমিয়েছেন। তবু অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি।
গ্যারেজ থেকে প্রাসাদ
আজ সেই মানুষের বাড়ি যেন একটি ব্যক্তিগত রিসোর্ট। হায়দরাবাদের জালপল্লিতে অবস্থিত ১০ একরের বিশাল এস্টেটজুড়ে রয়েছে সবুজ লন, ব্যক্তিগত খামার, ইনফিনিটি সুইমিং পুল, আধুনিক হোম থিয়েটার, পুরস্কারের গ্যালারি, ব্যক্তিগত বার, সাউনা, স্টিম রুম এবং পারিবারিক স্মৃতিতে ভরা কক্ষ।

মেয়ে লক্ষ্মী মাঞ্চুর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মোহন বাবুর ষষ্ঠ বাড়ি। এর আগে তিনি চেন্নাই, তিরুপতি ও হায়দরাবাদে আরও পাঁচটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
বাড়ির প্রধান বসার ঘরে রয়েছে বিশাল ইনডোর ফোয়ারা এবং শিব-পার্বতীর বিশাল এক শিল্পকর্ম। বাড়িজুড়ে ছড়িয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্মারক, পুরস্কার এবং পরিবারের সদস্যদের অর্জনের নিদর্শন।
স্মৃতির জন্য আলাদা ঘর
এই বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ একটি বিশেষ খেলনার ঘর। সেখানে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে মোহন বাবুর সন্তানদের ছোটবেলার খেলনা। এখন সেই খেলনাগুলো নিয়ে খেলেন তাঁর নাতি-নাতনিরা।
এ ছাড়া রয়েছে একটি বিশাল হলরুম, যেখানে চলচ্চিত্রের গল্প নিয়ে আলোচনা, নাচের মহড়া, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং বিশেষ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
বাড়ির নিজস্ব হোম থিয়েটারে একসঙ্গে ২০ জনের বেশি বসে সিনেমা দেখতে পারেন। রয়েছে আলাদা ডিভিডি লাইব্রেরি, সাউনা ও স্টিম রুমও।
নিজের জমিতেই ফলান সবজি
বিলাসিতার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতিও রয়েছে মোহন বাবুর গভীর টান। বাড়ির ভেতরেই রয়েছে বিশাল কৃষিজমি। সেখানে চাষ হয় বাঁধাকপি, টমেটো, জুচিনিসহ বিভিন্ন সবজির। চারপাশে রয়েছে অসংখ্য নারকেলগাছ। শোবার ঘর থেকেও দেখা যায় বনাঞ্চলের মনোরম দৃশ্য।
কোটি টাকার বাড়ি, কিন্তু নিয়ম মাত্র দুটি
এত বড় বাড়ি হলেও মোহন বাবুর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শৃঙ্খলা।
বাড়িতে দুটি নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হয়। প্রথমত, বাড়ির ভেতরে কেউ জুতা পরে প্রবেশ করতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, খাওয়ার সময় কোনো ধরনের কথা বলা যাবে না।
প্রতিদিন সকালে অসুস্থ থাকলেও মোহন বাবু গোসল করে পূজা করেন। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে কলাপাতায় পরিবেশিত সকালের নাশতা খান। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে নাশতা এবং দুপুর ১২টা ৪৫ থেকে বেলা ১টার মধ্যে মধ্যাহ্নভোজ পরিবেশন করতে হয়। সময় পেরিয়ে গেলে তিনি অনেক সময় খাবারই খান না।

অভিনয়ের পাশাপাশি শিক্ষাসাম্রাজ্য
অভিনয়ের সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন মোহন বাবু। তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। পরে গড়ে তোলেন বিশ্ববিদ্যালয়ও।
আজ মোহন বাবুর প্রতিষ্ঠানে হাজারো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবন পরিচালনার জন্যই প্রায় ২৫ জন কর্মী রয়েছেন।
চলচ্চিত্রজগতের ঝলমলে আলো, বিশাল সম্পদ কিংবা বিলাসবহুল জীবন—এসবের আড়ালে মোহন বাবুর জীবনের আসল গল্পটি হলো সংগ্রাম।
মাত্র ৪০ রুপির চাকরি থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার এই পথ তৈরি হয়েছে কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং শৃঙ্খলার ওপর দাঁড়িয়ে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে








