পুলিশে বাধ্যতামূলক অবসর: মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘হতাশা’ডিবি হারুন ও বেনজীরসহ ‘দলবাজ পুলিশ’ কর্মকর্তারা পুরো বাহিনীকে ‘ক্ষতিগ্রস্থ’ করেছে: পুলিশএকদিকে বাধ্যতামূলক অবসর, অন্যদিকে একের পর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওএসডি ও গ্রেপ্তার। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্দরে এখন এক অভূতপূর্ব স্থবিরতা ও নীরব হাহাকার। মাঠ পর্যায়ের সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে জেঁকে বসেছে চরম হতাশা আর উৎকণ্ঠা।৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে শুরু হওয়া এই শুদ্ধি অভিযানে খাকি পোশাকের ভেতরের মনোবল যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। মাঠের অনেক কর্মকর্তাই এখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও সাহস পাচ্ছেন না, অনেকেই আবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।পুলিশের ভেতরের সাধারণ কর্মকর্তাদের মতে, বেনজীর আহমেদ ও ডিবি হারুনের মতো মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জন অতি-উত্সাহী ও দলবাজ কর্মকর্তার কারণে আজ দুই লাখেরও বেশি সদস্যের গোটা বাহিনী এক গভীর সংকটে পতিত হয়েছে।রাতের ভোটের খেসারত ও এক রাতের আদেশে ৩৩ জনের বিদায়সর্বশেষ ৫ জুলাই রোববার এক আদেশে ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এই তালিকায় থাকা একজন ডিআইজি ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "২০১৮ সালে জেলা এসপি থাকা অবস্থায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালন না করলেও বিপদ, আবার এখন পালন করার দায়ে ওএসডি থেকে অবসরে পাঠানো হলো। কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ বা দুর্নীতি করিনি। এখন চুপ থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।"অবসরে যাওয়া অন্য কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সরকার অবসরে পাঠিয়েছে, এখন আর কিছু বলতে চাই না। আবার কোন বিপদে পড়ি! তবে শুধু এইটুকুই বলব, নির্বাচনের সময় সবাই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করেছে। অন্য বাহিনীও নির্দেশ মেনেছে, কিন্তু বলির পাঁঠা হলাম আমরা।"বেনজীর-হারুনের পাপে খেসারত দিচ্ছে ২ লাখ পুলিশ সদস্যপুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ১২৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তাদের সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বিদায় দেওয়া হচ্ছে। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনসহ অনেক কর্মকর্তা এখন কারাগারে, আবার সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গুটি কয়েক দলবাজ কর্মকর্তার চাটুকারিতা আর অতি-রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে আজ পুরো বাহিনীকে কলঙ্কের ভাগীদার হতে হচ্ছে। প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের খুশি করতে গিয়ে যারা আইন হাতে তুলে নিয়েছিলেন, যারা পরিচিত ছিলেন 'রাতের ভোটের কারিগর' হিসেবে, তাদের অপরাধের খেসারত দিচ্ছে সততার সাথে ডিউটি করা সাধারণ পুলিশ সদস্যরা। এমনকি সর্বশেষ অবসরে পাঠানো ৩৩ জনের মধ্যেও ২ থেকে ৩ জন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও প্রভাবমুক্ত কর্মকর্তা ছিলেন বলে সহকর্মীরা আফসোস করছেন।ভেঙে পড়া মনোবল চাঙ্গা করার লড়াই: থানা পর্যায়ে এখনো কাটেনি ভীতি
শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই পরিণতিতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের মনোবল এতটাই দুর্বল হয়েছে যে, গ্রাম-গঞ্জে কোনো অপরাধের খবর দিলেও পুলিশ এখনো সহজে ঘটনাস্থলে যেতে চায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে আগের মতো টহল মিলছে না। তবে সদর দপ্তর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠের এই জড়তা কাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পুলিশ আগের চেয়ে অনেকটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।তবে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে প্রত্যন্ত ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে পুলিশের ভীতি দূর করে তাদের পুরোপুরি সক্রিয় করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। সাধারণ পুলিশ সদস্যদের এখন একটাই চাওয়া, পাপীদের শাস্তি হোক, কিন্তু রাজনৈতিক বলির পাঁঠা বানিয়ে যেন আর কোনো নিরপরাধ সৎ কর্মকর্তার ক্যারিয়ার ধ্বংস না করা হয়।








