সমর্থক হোক কিংবা খেলোয়াড়, ফুটবল সবাইকে আনন্দ দেয়, ব্যাথিতও করে। সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াতেও সহযোগিতা করে। তবে সবসময় এই ঘুরে দাঁড়ানো কেবল পরেরবারের চেষ্টার জন্যই। সেই পরেরবারও তো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে পাশে এসে সহায় হয় না। সামনে নিয়ে উপস্থিত হয় কেবলই পুরনো ব্যর্থতা। কথাগুলো সব নেইমার জুনিয়রের ফুটবল ক্যারিয়ারের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
কত অনিশ্চয়তার পর তিনি ফিরেছিলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে! দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে ছাড়া বিশ্ব আসরে সেলেসাওরা পা রাখবে, এমনটা ভাবাও ছিলো মুশকিল। দলে ফিরলেও মাঠে নেমে সেভাবে খেলা হয়নি। যতটুকু নেমেছেন, তাতেও হয়নি আগের আসরগুলোর ব্যতিক্রম। ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৫৮ মিনিট। এটুকু খেলে এবারও বিদায়টা হলো নেইমারের চোখের জলেই।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটায় জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে ফিরেছিলেন ৯৮১ দিনের দীর্ঘ বিরতি ভেঙে। কিন্তু স্মরণীয় করতে চাওয়া বিশ্বকাপটা হয়ে রইলো নেইমারের কাছে সবচেয়ে পীড়াদায়ক। জনশ্রুতি আছে এটাই নেইমারের ‘শেষ বিশ্বকাপ।’ সেদিন ৭৬তম মিনিটে মাঠে নেমে অতিরিক্ত সময়সহ মাঠে ছিলেন ২৬ মিনিট।
ক্যারিয়ারজুড়ে চোটের সঙ্গে লড়াই করে রাঙাতে পারেননি নিজেকে। জিততে চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপটা। কিন্তু, হলো না। শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হেরে আরেকবার অশ্রুসিক্ত নয়নে মাঠ ছাড়লেন ব্রাজিলের তারকা। অতিরিক্ত সময়সহ এই ম্যাচে ৩২ মিনিট খেলে পেনাল্টি থেকে গোল করে কমিয়েছেন কেবল ব্যবধান। তবে বিদায় এড়াতে তা মোটেও যথেষ্ট ছিলো না।
প্রাপ্তি কেবল কিংবদন্তী পেলের পাশে শেষ বিশ্বকাপে নিজের নামটা বসানো ছাড়া আরকিছুই নয়। ব্রাজিলের ইতিহাসে শুধু এ দু’জনই চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এই অর্জন তাকে তৃপ্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। দিলে তো এবারও অশ্রুসিক্ত নয়নে মাঠ ছাড়তেন না।
বারবার শরীরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চেষ্টা করে যাওয়া নেইমার ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও হতাশ হলেন। এবার তাই ইঙ্গিত দিলেন, যেখানে শুরু করেছিলেন সেখানেই থেমে যাওয়ার।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল তার। ১৬ বছর পর একই ভেন্যুতে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিলেন। যদিও এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি তার অবসরের খবরটি।
ঘরের মাঠে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া নেইমারের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার রাশিয়া, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রেও সমাপ্তি হয়েছে কেবলই হতাশা ও চোখের জলে। রোববার মধ্যরাতে (৫ জুলাই, বাংলাদেশ সময়) ব্রাজিলের বিদায় ও অশ্রুসিক্ত নেইমারকে তো দেখেছেনই। আগের তিন আসরের নেইমারের একই দৃশ্যও নিশ্চিতভাবেই ভুলে যাননি ভক্তরা।
ঘরের মাঠে মেরুদণ্ডের চোটে মাঠের বাইরে (কলম্বিয়া, কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৪)
২২ বছর বয়সে ঘরের মাঠে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের ৩-১ ব্যবধানে জয়ে নেইমারের পা থেকে আসে জোড়া গোল। গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচেও জোড়া গোল করেন ক্যামেরুনের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে। শেষ ষোলোতে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক শটটি নেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে থিয়াগো সিলভার করা প্রথম গোলটিতে নেইমার কর্নার থেকে অ্যাসিস্ট ছিল।

দল সেমিফাইনালে উঠলেও ওই ম্যাচের ৮৮ মিনিটেই চোট পেয়ে তিনি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার কামিলো জুনিগা পেছন থেকে হাঁটু দিয়ে আঘাত করেন তার মেরুদণ্ডে। ব্যথায় কাতরাতে থাকা নেইমার কাঁদতে কাঁদতে স্ট্রেচারে চড়ে মাঠ ছাড়েন। তরুণ ব্রাজিলিয়ানের জন্য সেটি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিন বললে মোটেও ভুল হবে না।
পরীক্ষায় দেখা যায় তার মেরুদণ্ডের তৃতীয় ল্যাম্বার কশেরুকা ভেঙে গেছে। আঘাতটি মেরুদণ্ডের মূল স্নায়ু থেকে মাত্র ২ সেন্টিমিটার দূরে ছিলো। চিকিৎসকদের মতে, আর সামান্য এদিক-ওদিক হলে তিনি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যেতে পারতেন। নেইমারকে ছাড়া সেমিফাইনালে নেমে ঘরের মাঠেই জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল।
টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ ৪ গোল করার পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্ট করেন নেইমার। দুটি ম্যাচে হন সেরা খেলোয়াড়। ছিলেন আসরের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা। নিজেদের মাঠে সেরা সাফল্য অর্জিত না হওয়ায় ভেঙে পড়ো ফুটবল পাগল ব্রাজিলিয়ানরা।
কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিদায়, আসরে নিষ্প্রভ নেইমার (প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম, ২০১৮)
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলতে নেমে রাশিয়ায় ৫ ম্যাচে দুই গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেন নেইমার। তবে ওই আসরে সমালোচিত হয়েছিলেন মাঠে মাত্রাতিরিক্ত ডাইভ দেওয়া এবং অতি-আবেগী আচরণের জন্য।
আসরের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ব্রাজিল। কোস্টারিকার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে দুই গোল করে ম্যাচ বের করে সেলেসাওরা। তার একটি করেন নেইমার। ম্যাচ শেষে আনন্দে আবেগাপ্লুতও হন তিনি।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সার্বিয়ার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয় পায় ব্রাজিল। শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষেও জয়ের ব্যবধানটা একই। একটি গোল আসে নেইমারের পা থেকে।
তবে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলের পরাজয়ে আসর থেকে বিদায়ঘণ্টা বাজে সেলেসাওদের। হেক্সা মিশনে আবারও ব্যর্থ। ম্যাচ শেষে হতাশাগ্রস্ত নেইমারকে সান্ত্বনা দিতে দেখা যায় বেলজিয়ামের খেলোয়াড়দের।
টাইব্রেকারে শট নেওয়ার অপেক্ষায় দেখলেন দলের বিদায় (প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া, কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০২২)
কাতার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দলের সেরা পেনাল্টি স্কোরার হয়েও নেইমার দেখলেন, তার দল যখন বিদায় নিয়েছে তখনও তিনি শটই নিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আর শট নেওয়াও হয়নি।
অতিরিক্ত সময় ৩০ মিনিটের প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন নেইমার। মিনিট দশেকের মধ্যে সমতা ফেরায় ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচের ভাগ্য চলে যায় টাইব্রেকারে। আর সেখানেই বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

রদ্রিগো ও মারকিনিওস পেনাল্টি মিস করলে শেষ শট নিতে অপেক্ষায় থাকা নেইমার সতীর্থদের ভীড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ে অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায় তাকে।
যুক্তরাষ্ট্রেও হলো না ব্রাজিলের হেক্সা বা নেইমারের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণ
সবশেষ চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর স্কোয়াডে জায়গা মিললেও নেইমারের বিদায়টা চোখের জলেই। পুরো আসরে দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে খেলেছেন মাত্র ৫৮ মিনিট। এক ঘণ্টারও কম সময় মাঠে অবস্থান করা নেইমার এবারও একরাশ হতাশাকে সঙ্গী করেই ছাড়লেন বিশ্বকাপের মঞ্চ।
পুরো ক্যারিয়ার চোটের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে বারবার কেঁদেছেন, ব্যথায় কিংবা মাঠ ছাড়ার বেদনায়। তবে টানা চার বিশ্বকাপ মাঠ থেকে বিদায়ে তার কান্নাটা নিজের একার নয়, জাতি হিসেবে পুরো ব্রাজিলেরই।
জাতীয় দলের অধ্যায়কে শেষ হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি যদিও, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত কি না। আর তেমনটা হলে নেইমার সত্যিই বিদায় নিয়ে নিলে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ জিততে না পারার আক্ষেপকে সঙ্গী করেই নিতে হবে।
আইএন/আইএইচএস/








