বিশ্বকাপ আসলে কী? অনেকের চোখেই বিশ্বকাপ ‘স্বপ্নলোক’। আসলেই কি তাই? ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ শুধু স্বপ্নের আসরই নয়। বিশ্বকাপ ভীষণ নিষ্ঠুরও। সবাইকে ধরা দেয় না। চার বছর পরপর হওয়া এ আসর কাউকে করে দেয় রাজা, আবার কেউ অনেক আশা নিয়ে এসে হয়ে যান নিঃস্ব।

বিশ্বকাপ কারও জন্য নায়ক থেকে মহানায়ক হওয়ার মঞ্চ। আবার কেউ এ আসর খেলতে এসে নায়ক থেকে হয়ে যান খলনায়ক। আবার কারও কারও কাছে বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত না পাওয়ার, অতৃপ্তি নিয়ে দেশে ফেরার এক আসর হিসেবেই থেকে যায়।

ইয়োহান ক্রুয়েফ, জিকো, সক্রেটিস, মিশেল প্লাতিনি, পুসকাস, ককসিস- কত বড় বড় ফুটবলারের ভাগ্যেই বিশ্বকাপ ধরা দেয়নি। মহাতারকা হওয়ার বাসনা নিয়ে এসে তারা ফিরে গেছেন না পাওয়ার বেদনা নিয়ে। সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হলেন- নেইমার।

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে কারও যে কৃতিত্ব নেই- পেলে, জিকো, রোমারিও আর রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরাও যা করে দেখাতে পারেননি, সেই কৃতিত্বটা আছে নেইমারের।

zico

একটি বিশেষ কৃতিত্ব ও অর্জনে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার এবং ব্রাজিলকে তিনবার বিশ্বকাপ উপহার দেওয়া পেলে, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অন্যতম রূপকার রোমারিও, ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সেরা তারকা রোনালদোসহ ব্রাজিলের সব ফরোয়ার্ড ও স্ট্রাইকারের চেয়ে এগিয়ে নেইমার।

ভাবছেন, কী সেই কৃতিত্ব ও বিশাল অর্জন, যা শুধু আছে নেইমারের? ঠিক ধরেছেন। ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে সবচেয়ে বেশি ৮০টি গোল করার কৃতিত্বটি শুধু নেইমারের।

গোলের খেলা ফুটবলে গোলই শেষ কথা। একজন ফুটবলার হিসেবে ১৩০ ম্যাচে ফুটবল মহারাজ পেলের করা ৭৭ গোলের রেকর্ড ভেঙে নিজ দেশের হয়ে সর্বাধিক গোল করার কৃতিত্বটি নিজের করে নিয়েছেন নেইমার। একজন দক্ষ ফুটবলার, মাস্টার ড্রিবলার ও প্লে-মেকার হিসেবেও কিন্তু নেইমার বিশ্বে সমাদৃত।

লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলার কিংবা ব্যালন ডি’অর খেতাব জেতা হয়নি। তবে উভয় খেতাবের জন্য বেশ কয়েকবারই মনোনীত হয়েছেন নেইমার। সেরা দুই-তিনেও থেকেছেন বেশ কয়েকবার। কিন্তু সে পুরস্কার ওঠেনি এ ব্রাজিলিয়ান অলটাইম গ্রেটের হাতে।

তারপরও ব্রাজিলীয় ফুটবলে নেইমার অনেক বড় নাম। যার অর্জন ও কৃতিত্বও কিন্তু কম নয়, অনেক। ২০১৩ সালে ব্রাজিল যে কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছিল, নেইমার ছিলেন সে বিরাট সাফল্যের অন্যতম রূপকার। এরপর ২০১৬ সালে অলিম্পিক ফুটবলে ব্রাজিলের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের স্থপতিও ধরা হয় নেইমারকে।

কিন্তু হায়! ব্রাজিলীয় ফুটবলে গত পাঁচ যুগের বেশি সময়ে যারা গ্রেট ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, সমাদৃত ও পরিগণিত, তাদের অন্যতম হয়েও নেইমার বিশ্বকাপ থেকে শূন্য হাতেই ফিরে যাচ্ছেন। পেলে, রোমারিও, রোনালদিনহো, কাকাদের মতো তার হাতে ওঠেনি বিশ্বকাপ। চার চারবার (২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) বিশ্বকাপ খেলেও ট্রফি জিততে না পারার আক্ষেপ আর হতাশা নিয়েই গতকাল ৫ জুলাই আমেরিকার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ হলো নেইমারের বিশ্বকাপ অভিযাত্রা।

ভাবুন একবার, বিশ্বকাপে চারবার অংশ নিয়ে ১৫ ম্যাচে ৯ গোল যার, যিনি পা ও মাথা দিয়ে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবার চেয়ে বেশি গোল করেছেন, অনেক গোলের উৎসও রচনা করেছেন, সেই তিনিই বিশ্বকাপ থেকে ফিরলেন খালি হাতে। ঠিক যেমনটি ফিরেছেন তার দুই পূর্বসূরি, দুই কিংবদন্তী জিকো এবং সক্রেটিস।

ফর্মের তুঙ্গে থাকা জিকো আর সক্রেটিস ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে পরপর দুই বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসেছিলেন তারকার তকমা গায়ে এঁটে। দুজনকেই ওই দুই বিশ্বকাপের সম্ভাব্য সেরা পারফরমার ধরা হয়েছিল; কিন্তু হায়! কেউই সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেননি। উল্টো ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ফিরে গেছেন।

এই তো আগের রাতে ব্রাজিলের বিপক্ষে আহামরি কিছু না খেলেও দুটি চমৎকার সুযোগসন্ধানী গোল দিয়ে ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে নরওয়েকে সেরা আটে পৌঁছে এখন পাদপ্রদীপের আলোয় আরলিং হালান্ড। অথচ ব্রাজিলের জার্সি গায়ে এত গোল করার কৃতিত্বের পরও নেইমার এখন শুধুই ‘ট্র্যাজেডি কিং’।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গত এক যুগে ব্রাজিলের সবচেয়ে নামী ও দামি ফুটবলার হয়ে সারা ফুটবল বিশ্ব দাপিয়ে বেড়িয়েও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সোনালী সাফল্যের দেখা পেলেন না নেইমার। ব্রাজিলীয় ফুটবলে সোনার ছেলে হয়ে থাকাও হলো না নেইমারের।

নেইমারের এই খালি হাতে বিশ্বকাপ শেষ করা দেখে প্রশ্ন জাগে, বিশ্বকাপ আসলে কী? এটা কি শুধুই ফুটবলের স্বপ্নলোক? মর্ত্যের এ সর্ববৃহৎ যজ্ঞ কি শুধুই বিশ্ব ফুটবলের সেরা দল নির্ধারণের সর্বোত্তম ক্ষেত্র?

চার বছর পরপর এই ফুটবল আসরের মধ্য দিয়েই কি ফুটবলের সেরা শক্তির দেখা মেলে? নাকি বিশ্বকাপ গ্রেট ফুটবলারদের অমর করে রাখার অনুপম ক্ষেত্র? আমার তো মনে হয়, শেষটাই ঠিক। বিশ্বকাপে চার বছর পরপর শুধু বিশ্বসেরা আর চ্যাম্পিয়নের দেখাই মেলে না, ফুটবলের রাজ্যজয়ী বীরেরও দেখা মেলে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মেধা, প্রতিভা, ফুটবল স্কিল, দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা, ড্রিবল করার ক্ষমতা, সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার পাশাপাশি গোল করার দক্ষতায় মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর খুব কাছাকাছি থেকেও নেইমারের আর মহাতারকা হওয়া হলো না।

গতকাল নরওয়ের কাছে হারের পর কান্নাভেজা নেইমারের মুখাবয়ব যেন তাই বলে দিল, ‘আমি পারলাম না। দলকে বিশ্বকাপ জেতানো সম্ভব হলো না। আমি নিজেও মহানায়ক হতে পারলাম না।’

এআরবি/আইএইচএস/