ব্লেসিং মুজারাবানি ক্যাচ ধরার পর হাত মুঠো করে উদযাপনে ব্যস্ত। মোস্তাফিজুর রহমানকে আউট করার পর বোলার রিচার্ড এনগারাভা শূন্যে কী যেন ইঙ্গিত করেন। হারারে স্টেডিয়ামের ডাগআউটে তখন জিম্বাবুয়ের দর্শকদের উচ্ছ্বাস। বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজের প্রথম ওয়ানডের সারমর্ম বর্ণনা করতে এটুকুই যথেষ্ট। ব্যাটিং ব্যর্থতায় ২৬ রানে হেরে গেল মেহেদী হাসান মিরাজের দল।

হারারে স্পোর্টস ক্লাবেই কদিন আগে সিরিজের একমাত্র টেস্টে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ও ৮৫ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগানোর সম্ভাবনা এবার তৈরি করেছিলেন নাহিদ রানা-তাসকিন আহমেদরা। কিন্তু ব্যাটারদের ব্যর্থতায় মাত্র ১৪২ রানের লক্ষ্যও তাড়া করতে গিয়ে ১১৬ রানে গুটিয়ে গেল বাংলাদেশ। ২৫ রানে জিতে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল জিম্বাবুয়ে।

১৪২ রানের লক্ষ্যে নেমে শুরু থেকেই ৪.১ ওভারে ৩ উইকেটে ১৭ রানে পরিণত হয় বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ের চেয়েও বাংলাদেশের ব্যাটারদের দায়টাই বেশি। যেখানে দ্বিতীয় ওভারের চতুর্থ বলে ব্লেজিং মুজারাবানিকে ফ্লিক করতে যান তানজিদ হাসান তামিম। ডিপ স্কয়ার লেগে নিউমান নিয়ামহুরি দুইবারের চেষ্টায় তালুবন্দী করেন।

তানজিদ তামিম করেছেন ৮ রান। তাঁর মতো এক অঙ্কের ঘরে আউট হয়েছেন সৌম্য সরকার (৬) ও নাজমুল হোসেন শান্ত (৩)। এরপর হাল ধরেন তাওহীদ হৃদয় ও নুরুল হাসান সোহান। যদিও দলীয় ২৩ রানেই বাংলাদেশ হারাতে পারত চতুর্থ উইকেট। অষ্টম ওভারের চতুর্থ বলে ব্রাড ইভান্সকে লেগ সাইডে ঘোরাতে যান সোহান। এজ হওয়া বল প্রথম স্লিপে তালুবন্দী করতে গিয়েও বলের নাগাল পাননি সিকান্দার রাজা।

ক্যাচ মিসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সোহান-হৃদয় যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, তাতে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল। ৮৮ বলে ৪৯ রানের জুটি গড়েন তাঁরা (সোহান-হৃদয়)। তবে হৃদয়কে ফেরানোর পর ম্যাচে ফিরতে থাকে জিম্বাবুয়ে। ১৯তম ওভারের পঞ্চম বলে নিয়ামহুরিকে স্ল্যাশ করতে গিয়ে ডিপ থার্ড ম্যানে বেন কারেন অসাধারণ ক্যাচ ধরেন। ৫৮ বলে ১ চারে ২৫ রান করেন হৃদয়।

হৃদয়ের ক্যাচ ধরার পর জিম্বাবুয়ে খেলোয়াড়দের উদযাপনেই বোঝা গেছে, উইকেটটা পেতে তাঁরা কতটা উদগ্রীব ছিলেন। নুরুল হাসান সোহান, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমানরা বাউন্ডারি মেরে বাংলাদেশের ভক্ত-সমর্থকদের হৃদয়ে আশার সঞ্চার করছিলেন ঠিকই। তবে সেটা ছিল সাময়িক সময়ের জন্যই।

ওভার নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা না থাকলেও চিন্তার ব্যাপার ছিল উইকেট। সেই উইকেটই ধরে রাখতে পারছিল না বাংলাদেশ। হৃদয়ের বিদায়ের পর ৫০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে সফরকারীরা ৩৩.১ ওভারে ১১৬ রানে গুটিয়ে যায়। ৩৪তম ওভারের প্রথম বলে এনগারাভাকে কাভারের ওপর দিয়ে তুলে মারতে যান মোস্তাফিজ। তবে টাইমিংয়ে গড়বড় হওয়া বল মিডঅফে সহজেই তালুবন্দী করেন মুজারাবানি। ২৫ রানে জয়ের পর জিম্বাবুয়ে দল তখন উদযাপনে মাতোয়ারা হয়ে যায়।

বাংলাদেশের ইনিংসে সর্বোচ্চ ৩৩ রান আসে সোহানের ব্যাট থেকে। হৃদয় ও মিরাজ করেন ২৫ ও ১০ রান। বাকি আট ব্যাটারের কেউই দুই অঙ্ক পেরোতে পারেননি। অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচসেরা হয়েছেন জিম্বাবুয়ের বাঁহাতি পেসার নিয়ামহুরি। ব্যাটিংয়ে ৫১ বলে করেছেন ৩৩ রান। বোলিংয়ে ৬ ওভারে ২২ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট। দুই ওভার মেডেনও দিয়েছেন। ফিল্ডিংয়ে ধরেছেন দুই ক্যাচ। নিয়ামহুরির মতো ২ উইকেট নিয়েছেন মুজারাবানিও। তিনটি করে উইকেট নিয়েছেন এনগারাভা ও ইভান্সও।

এর আগে টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মিরাজ। সফরকারীদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ১৯.৫ ওভারে ৮ উইকেটে ৭০ রানে পরিণত হয় জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে দ্বিতীয়বারের মতো ১০০-এর আগে গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল জিম্বাবুয়ে। যেখানে ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ৪৪ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। যা এখনো আফ্রিকার দলটির সর্বনিম্ন। তবে এবার আর তা হয়নি। নবম উইকেটে দুই টেলএন্ডার ব্যাটার রিচার্ড এনগারাভা ও নিউমান নিয়ামহুরি গড়েন ৮১ বলে ৬৩ রানের জুটি।

এনগারাভা-নিয়ামহুরির ৬৩ রানের জুটির পেছনে বাংলাদেশের পিচ্ছিল ফিল্ডিংয়েরও অবদান রেখেছে। ৩০ ওভারের প্রথম বলে রিশাদকে তুলে মারতে যান এনগারাভা। লং অনে দাঁড়িয়ে থাকা তানজিদ হাসান তামিম বল হাতের নাগালে পেলেও তালুবন্দী করতে পারেননি।

তানজিদ তামিম ক্যাচ ধরতে পারলে ১১৪ রানে ৯ উইকেট পড়ে যেত জিম্বাবুয়ের। এই নবম উইকেট স্বাগতিকেরা হারিয়েছে ১৩৩ রানে। ৩৩তম ওভারের দ্বিতীয় বলে এনগারাভাকে দারুণ এক ডেলিভারিতে বোল্ড করে জুটি ভাঙেন রানা। অধিনায়ক এনগারাভা ৪১ বলে ৩ চারে করেন ২৭ রান।

১০ ওভারে ২১ রানে ৬ উইকেট নিয়ে বোলিং শেষ করেছেন রানা। দিয়েছেন ২ ওভার মেডেনও। আর ৩৭তম ওভারের চতুর্থ বলে নিয়ামহুরিকে ফিরিয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংসের ইতি টেনেছেন মিরাজ। এবার ডিপ মিড উইকেটে ঠিকই ক্যাচ ধরেন তানজিদ তামিম। ৫১ বলে ৫ চারে নিয়ামহুরির ৩৩ রানই জিম্বাবুয়ের ইনিংসে সর্বোচ্চ। রানার ৬ উইকেটের পাশাপাশি তাসকিন ও মিরাজ ২ ও ১ উইকেট নিয়েছেন।