আট দশক ধরে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসার নাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ। সীমিত জনবল, অবকাঠামোগত সংকট ও রোগীর অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

আজ প্রতিষ্ঠানটির ৮০ বছর পূর্তি। দিনটিতে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে যেমন উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় ইতিহাস, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রত্যাশায় আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত জনবল ও উন্নত অবকাঠামোর মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেলকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তাদের ভাষায়, ‘ঢাকা মেডিকেল থেকে কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না’— এই আস্থাই প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় পরিচয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৩৯তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. ফারুক আহমেদ বলেন, আশির দশকে যখন তারা পড়াশোনা শুরু করেন, তখন দেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। সেই সময় বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা, আড্ডা আর আন্দোলনের স্মৃতি আজও তার মনে গেঁথে আছে।

আরও পড়ুন

সার্বক্ষণিক নির্ভরতার জায়গা হলো ঢাকা মেডিকেল: প্রধানমন্ত্রী

তিনি বলেন, ‘আশির দশকে যখন আমরা ঢাকা মেডিকেলে পড়াশোনা শুরু করি, তখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খুবই উত্তাল ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা, আড্ডা— সবকিছুর মধ্য দিয়েই ছাত্রজীবন কেটেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের মানুষের কাছে আস্থার একটি নাম। আমরা সবসময় চাই, মানুষের সেই আস্থা যেন অটুট থাকে।’

ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে ডা. ফারুক আহমেদ বলেন, ১৯৮১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আমি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। তবে আমার ব্যাচের শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল একাডেমিক কার্যক্রমেও। ফলে ১৯৮৭ সালে পাস করার কথা থাকলেও প্রায় এক বছর বিলম্বে ১৯৮৮ সালে আমাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, একসময় চিকিৎসকদের জন্য ‘ইন-সার্ভিস ট্রেনিং’ ব্যবস্থা ছিল। ফলে পাস করার পরপরই চাকরির সুযোগ মিলতো। পরে বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হয়। আমার মতে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক ‘ইন-সার্ভিস’ নিয়োগের সুযোগ পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

আরও পড়ুন

স্বাস্থ্যমন্ত্রী / চিকিৎসকের হাসিমুখে কথা বলা রোগীকে অর্ধেক সুস্থ করে দিতে পারে

ঢাকা মেডিকেলের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯৪৬ সাল থেকে ঢাকা মেডিকেল শুধু চিকিৎসা শিক্ষাই নয়, দেশের উচ্চশিক্ষার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সারাদেশের মানুষ শেষ ভরসা নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসে। এখান থেকে কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তবে রোগীর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে চিকিৎসকের সংখ্যাও বাড়ানো প্রয়োজন।’

একই অনুভূতি প্রকাশ করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থী জাওয়াদ মুবাশর তোহা। খুলনার এ শিক্ষার্থীর কাছে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনটিই সবচেয়ে স্মরণীয়।

তোহা বলেন, ‘ওরিয়েন্টেশনের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলোর একটি। সেদিন মায়ের সঙ্গে প্রথম ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসেছিলাম। অনুষ্ঠানের পুরো পরিবেশই ছিল দারুণ।’

তিনি বলেন, স্কুল-কলেজ জীবন পর্যন্ত আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে বাসায় ছিলেন। তবে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় হোস্টেল জীবন। নতুন পরিবেশে সহপাঠীদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকা, একে অপরকে সহযোগিতা করা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতাই আমার মেডিকেল জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী / আমার মাকে যে মানবিক সেবা দেওয়া হয়েছে, বিদেশে তা পাওয়া যেত না

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার।’

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তোহা বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা আরও উন্নত করা গেলে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বমানের একটি চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারবে।’

তোহার সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সদ্য স্নাতক জান্নাতুল ফেরদৌস নিশাত। ৭৬তম ব্যাচের এ শিক্ষার্থী বলেন, মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় থেকেই ঢাকা মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখতাম।

তিনি বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার সময় আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ঢাকা মেডিকেলে পড়া। এখানে সুযোগ পাওয়ার পর বুঝেছি, এটি সত্যিই স্বপ্নের একটি ক্যাম্পাস। শিক্ষক, হাসপাতালের পরিবেশ ও শেখার সুযোগ— সবকিছুই অসাধারণ।’

আরও পড়ুন

ঢামেকের ৮০ বছর / একই ক্যাম্পাসে বাবা-মেয়ে, দুই প্রজন্মের স্বপ্ন-আবেগ যেন এক সুতোয় গাঁথা

ঢাকা মেডিকেলের ঐতিহ্য সম্পর্কে নিশাত বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী আসায় এখানে বাস্তব চিকিৎসা শেখার সুযোগ অনেক বেশি। পাশাপাশি শিক্ষকদের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব ও পাঠদানের ধরন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের আইটেম পরীক্ষার চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা, ক্লাস শেষে আড্ডা ও একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। হাসপাতালের পরিচিত গন্ধ আর করিডোরে হেঁটে বেড়ানোর স্মৃতিও এখন খুব মিস করি।’

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা জানিয়ে নিশাত বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসকেরা অত্যন্ত দক্ষ এবং রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে উন্নত দেশগুলোর মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির অভাব অনেক সময় চিকিৎসাসেবায় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। আমি চাই, ঢাকা মেডিকেলে আরও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হোক, যাতে এটি বিশ্বমানের চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।’

আরও পড়ুন

ঢাকা মেডিকেলে পড়ার ও ইন্টার্নশিপের নানা স্মৃতি তুলে ধরলেন ডা. জুবাইদা

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের সাক্ষী। দেশের চিকিৎসা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জাতীয় সংকটের প্রতিটি অধ্যায়ে এ প্রতিষ্ঠান গৌরবের সঙ্গে ভূমিকা রেখেছে। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেছে।

আমাদের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকেরা দেশে-বিদেশে চিকিৎসা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন)– সংক্রান্ত গবেষণায় এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অবদান যেমন রয়েছে, তেমনি চিকিৎসাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রয়োগ নিয়েও আমাদের সাবেক শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রতিদিন চার থেকে আট হাজার রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। অবকাঠামো, জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য— কোনো রোগী যেন মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য না হন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ যেন একাডেমিক উৎকর্ষের মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং দেশের কোনো মানুষ যেন চিকিৎসাসেবার অভাবে বঞ্চিত না থাকেন।

১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই যাত্রা শুরু করা ঢাকা মেডিকেল কলেজ ৮০ বছর পেরিয়ে পদার্পণ করেছে ৮১তম বছরে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ দেশের বিভিন্ন সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ প্রতিষ্ঠান আজও হাজারো মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসা। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত অবকাঠামোর সমন্বয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ভবিষ্যতেও দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে থাকবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

এমডিএএ/এমএএইচ/