শুধু বগুড়ার শিবগঞ্জ পৌরসভার জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ‘শিবগঞ্জ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ৪৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার। পরে একইজাতীয় আরেকটি প্রকল্পেও শিবগঞ্জ উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করায় প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি এরই মধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। শিবগঞ্জের নাম বাদ দিয়ে নতুনভাবে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জন্য আলাদা করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠাতে বলেছে কমিশন।
চলতি বছরের ১৭ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূইয়ার সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ‘বগুড়া জেলার বগুড়া, গাবতলী ও শিবগঞ্জ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের নানান বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
আরও পড়ুন
বগুড়ার বিতর্কিত সেই তিন ইউনিয়নের নতুন নাম ঘোষণা
কমিশন বলছে, একইজাতীয় প্রকল্প একই এলাকায় বারবার নেওয়া যায় না। এজন্য নতুনভাবে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রতিনিধি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে প্রস্তাবিত প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত উপস্থাপন করেন।
ডিপিপিতে উল্লেখিত প্রকল্পের উদ্দেশ্য অংশ যথাযথ হয়নি, যা প্রকল্পের প্রেক্ষাপট বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রকল্পের লগফ্রেমে বর্ণিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পুনর্লিখন প্রয়োজন।-অতিরিক্ত সচিব মো. আশরাফুজ্জামান
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আশরাফুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, “এলজিইডি ‘বগুড়া জেলার বগুড়া, গাবতলী ও শিবগঞ্জ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। আমরা এটা নিয়ে পিইসি সভা করেছি। প্রকল্পের কিছু বিষয়ে আমরা সুপারিশ দিয়েছি। প্রকল্পটি সংশোধন করে পুনরায় কমিশনে পাঠাতে বলেছি।”
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার জন্য আলাদা প্রকল্প দিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প দেওয়ার সময় সিটি করপোরেশন ঘোষণা হয়নি। তারা নতুন করে আবার প্রস্তাব পাঠাবে। যে ব্যয় চেয়েছে তাও থাকবে না। ব্যয় কম-বেশি হবে। তবে সিটি করপোরেশনের জন্য বড় প্রকল্প লাগবে।’
এই অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ‘ডিপিপিতে উল্লেখিত প্রকল্পের উদ্দেশ্য অংশ যথাযথ হয়নি, যা প্রকল্পের প্রেক্ষাপট বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রকল্পের লগফ্রেমে বর্ণিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পুনর্লিখন প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন
মীর শাহে আলম / বগুড়া ২০ বছর উন্নয়নবঞ্চিত ছিল, সেই বৈষম্য দূর করছে সরকার
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় এলজিইডি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত ‘বগুড়া জেলার বগুড়া, গাবতলী ও শিবগঞ্জ পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পটি জেলার তিনটি পৌরসভার ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য
প্রকল্পের সামগ্রিক উদ্দেশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিরুদ্ধে নগর এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে অবদান রাখা। প্রকল্পের নির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো- বন্যার বিরুদ্ধে নগর এলাকার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো, নগর এলাকায় সবুজ অবকাঠামো বিনিয়োগের উদ্দেশ্য অর্জন করা এবং পৌরসভাগুলোর ওঅ্যান্ডএম সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন বাড়ানো।
এছাড়া বগুড়া সদর, গাবতলী ও শিবগঞ্জ পৌরসভায় সড়ক, ড্রেন, ব্রিজ/কালভার্ট, স্ট্রিট লাইট, পাবলিক টয়লেট, সুপার মার্কেট, বাস টার্মিনাল মেরামতসহ অন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে মোট ৯৯৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩০ পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে।
আরও পড়ুন
শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদে পরিবর্তন
কমিশন জানায়, প্রকল্পটি বগুড়া সদর পৌরসভাসহ শিবগঞ্জ ও গাবতলী পৌরসভা নিয়ে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে বগুড়া পৌরসভাকে বগুড়া সিটি করপোরেশনে উন্নীত করেছে সরকার। গত ১৪ মে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গেজেট প্রকাশিত হয়।
একই এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না তা জানতে চাইলে এলজিইডির একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বগুড়া পৌরসভা আয়তনে অনেক বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ। এ পৌরসভায় বিগত সময়ে নাগরিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও বাস্তবায়নে কোনো অসুবিধা হবে না।’
এ পর্যায়ে পিইসি সভায় ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূইয়া বলেন, ‘বগুড়া জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করা জরুরি। এজন্য বগুড়া শহরের কোথায় কী ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, সে বিষয়ে একটি সমীক্ষা করে সমীক্ষার ভিত্তিতে দ্রুত একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন
ভাঙা পড়বে জীর্ণ ভবন, আধুনিক-পরিবেশবান্ধব হবে ঢামেক
তিনি বলেন, ‘এতে ভবিষ্যতে বগুড়াকে একটি মডেল শহর হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। যেহেতু ইতোমধ্যে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়েছে সেহেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষও পরিবর্তিত হয়েছে।’
পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শ
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, এ প্রকল্পের আওতায় মূলত পৌরসভার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য রাস্তা, ড্রেন, ব্রিজ/কালভার্টের (দৈর্ঘ্য-প্রস্থ) ডিজাইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সিটি করপোরেশন এলাকার নাগরিক চাহিদা ও ডিজাইনকে বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাব করা হয়নি।
এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশনকে একটি ‘মডেল সিটি করপোরেশন’ হিসেবে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বর্তমান অবকাঠামো প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধিকে মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনটি বিষয় বিবেচনা করে প্রকল্প পুনরায় উপস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
পরামর্শগুলো হলো- বগুড়া সিটি কপোরেশনের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা, জরুরি বিবেচনায় গাবতলী ও শিবগঞ্জ পৌরসভার জন্য আলাদা প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা এবং গাবতলী ও শিবগঞ্জসহ বগুড়া জেলার বাকি ৯টি পৌরসভা নিয়ে আলাদা প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
প্রকল্পটি প্রসঙ্গে এলজিইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়েছে। এখন বগুড়া সিটি করপোরেশন হয়েছে। সিটি করপোরেশনের জন্য আলাদা প্রকল্প নেওয়া হবে। আর বগুড়া জেলার ১১টি পৌরসভার জন্য প্রকল্প নেওয়া হবে নতুনভাবে।’
এমওএস/এএসএ/এমএফএ








