এক সময় গ্রামের মানুষের কাছে পাটকাঠির মূল্য ছিল রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া কিংবা শীতের আগুন পোহানোর উপকরণ হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে সেই চিত্রের। অবহেলিত পাটকাঠিই এখন দেশের শিল্পকারখানা ও কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। বাড়তি চাহিদার কারণে মাগুরার মধুমতি নদীর এলাংখালী ঘাটে গড়ে উঠেছে ব্যস্ত পাটকাঠি বাণিজ্য কেন্দ্র।

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মহম্মদপুর উপজেলার এলাংখালী ঘাট জুড়ে দেখা যায় পাটকাঠি বহনের ব্যস্ততা। কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা পাটকাঠি স্তূপ করে রাখা হয় নদীর তীরে। এরপর শ্রমিকরা সেগুলো ট্রলারে বোঝাই করেন। কয়েকদিন পরপরই ট্রলারভর্তি পাটকাঠি নদীপথে রওনা দেয় নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানা এবং বরিশালের পানচাষিদের উদ্দেশে।

এ ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ২৫ বছর ধরে জড়িত রয়েছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বেলজানী গ্রামের বাসিন্দা মো. জাফর মোল্যা (৬০)। মৃত পীর মহম্মদ আলীর ছেলে জাফর মোল্যা নিজের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন লাভজনক এ ব্যবসা।

অবহেলার পাটকাঠিতে এখন লাখ টাকার ব্যবসা

জাফর মোল্যা বলেন, ‘মাগুরা সদর, মহম্মদপুর ও নড়াইলের লোহাগড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ পাটকাঠি ৪৫০ টাকায় কেনা হয়। পরে সেগুলো এলাংখালী ঘাটে এনে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি ট্রলারে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার মণ পর্যন্ত পাটকাঠি বোঝাই করে নদীপথে পাঠানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পারটেক্স মিলে প্রতি মণ ৫৫০ টাকা দরে পাটকাঠি বিক্রি করি। এছাড়া বরিশালের পানচাষিদের কাছে প্রতি কাউন (১ হাজার ৪০৮টি) ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি চালানে প্রায় এক লাখ টাকা লাভ থাকে।’

জাফর মোল্যা আরও বলেন, ‘প্রতি বছর নারায়ণগঞ্জে ১০ থেকে ১২টি এবং বরিশালে ১২ থেকে ১৫টি ট্রলার পাটকাঠি পাঠানো হয়। বহু বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে আছি। এটি যেমন লাভজনক, তেমনি অনেক মানুষের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়েছে।’

স্থানীয় কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ‘আগে পাটকাঠির তেমন দাম ছিল না। এখন ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যান। এতে পাট চাষের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করেও বাড়তি আয় হচ্ছে।’

এলাংখালী ঘাটে কাজ করা শ্রমিক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘মৌসুমে প্রতিদিন শত শত মণ পাটকাঠি ট্রলারে তোলা হয়। এ কাজ করেই আমাদের সংসার চলে। এখানে ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। এ নদীপথের বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মাঝি-মাল্লার জীবন-জীবিকা।’

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা ব্যাপারীপাড়ার বাসিন্দা চান মিয়া মাঝি প্রায় ২০ বছর ধরে এ রুটে ট্রলার চালাচ্ছেন।

অবহেলার পাটকাঠিতে এখন লাখ টাকার ব্যবসা

তিনি বলেন, ‘এলাংখালী ঘাট থেকে নারায়ণগঞ্জ বা বরিশাল যেতে পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগে। ট্রলারের ওপরই রান্না করি, খাই, ঘুমাই। ঝড়-বৃষ্টি ও নদীর স্রোতের ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয়। তবুও এই পথই আমাদের রুটিরুজির প্রধান ভরসা।’

স্থানীয়রা জানান, এলাংখালী ঘাটকে কেন্দ্র করে শুধু পাটকাঠির ব্যবসাই নয়, শ্রমিক, মাঝি, ট্রলার মালিক, পরিবহণসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীসহ অনেক মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাট মৌসুমে পুরো এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বেড়ে যায়।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘পাটকাঠির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ায় এর বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি ও কাঁচামাল হিসেবে এবং বরিশাল অঞ্চলের পানের বরজে ব্যাপক চাহিদা থাকায় কৃষকরা এখন পাটকাঠিকে আলাদা অর্থকরী পণ্য হিসেবে দেখছেন।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা এবং এলাংখালী ঘাটে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মাগুরার এ পাটকাঠির বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনি কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

মো. মিনারুল ইসলাম জুয়েল/কেজে/এএসএম