দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‌নির্মিত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের শমশেরনগর বিমানবন্দরটি আজও অচল অবস্থায় পড়ে আছে। কবে চালু হবে তাও অজানা। এতে সবচেয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রবাসীরা। দ্রুত বিমানবন্দরটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা। বর্তমানে এটি ‘বাংলাদেশ বিমান বাহিনী স্টেশন শমশেরনগর’ নামে পরিচালিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতা দমদম ও শমশেরনগর বিমানবন্দর নামে দুটি বিমানবন্দর নির্মাণ করে ইংরেজরা। শমশেরনগর চা বাগানের ৬২২ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে বিমানবন্দরটি গড়ে তোলা হয়।

আরও পড়ুন

লাগেজ রাখার জায়গা নেই, যাত্রীও নেই শাহজালালের ফ্রি শাটল বাসে

শমশেরনগর বিমানবন্দর এশিয়ার তৎকালীন সবচেয়ে বড় সামরিক বিমান ঘাঁটি ছিল। তখন থেকেই সেসময় ব্রিটিশ ও আমেরিকান মিত্রশক্তির বিমানগুলো জাপান, চীন ও বার্মা (মিয়ানমার) ফ্রন্টে হামলা চালাতো। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নিওমিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টার ও এয়ার স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি এর অন্তর্গত বিএএফ শাহীন কলেজ প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

‘ব্রিটিশ আমলে বিমানবন্দরটি ‘দিলজান্দ বন্দর’ নামেই পরিচিত ছিল। তবে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর বিমানবন্দরটির নতুন নামকরণ করা হয় ‘শমশেরনগর বিমানবন্দর’। ১৯৬৮ সালে একটি বিমান দুর্ঘটনার পর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বিমানবন্দরটিতে নিয়মিত ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়’

ব্রিটিশ আমলে বিমানবন্দরটি ‘দিলজান্দ বন্দর’ নামেই পরিচিত ছিল। তবে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর বিমানবন্দরটির নতুন নামকরণ করা হয় ‘শমশেরনগর বিমানবন্দর’। ১৯৬৮ সালে একটি বিমান দুর্ঘটনার পর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বিমানবন্দরটিতে নিয়মিত ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিমান সংকট এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এটি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

আরও পড়ুন

শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রি শাটল সার্ভিস চালু

১৯৭৫ সালে এখানে বিমান বাহিনীর একটি ইউনিট স্থাপন করা হয়। ১৯৯৫ সালে অ্যারো-বেঙ্গল নামে একটি ফ্লাইট চুলু করা হয়েছিল। কিন্তু অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার কারণে এই ফ্লাইট যাত্রীদের আকর্ষণ করেনি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত বিমানবন্দরটিতে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) নিয়মিত অভ্যন্তরীণ বিমান ওঠানামা করতো। ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে এখানে অবতরণ করতো বিমান। শমশেরনগর বাজারে ছিল পিআইএর একটি স্থানীয় অফিস। প্রশস্ত রানওয়ে, বিশাল পরিসর, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও সব ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা এ বিমানবন্দরে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত ওঠানামা করতো বিমান। পরবর্তী শমশেরনগর বিমানবন্দরটি সংস্কারের পরিবর্তে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

বাণিজ্যমন্ত্রী / বিমানবন্দরে কার্গো জট নিরসনে ছুটির দিনেও সেবা চালু রাখতে চায় সরকার

বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য পাঁচ হাজার ২০০ ফুট ও প্রস্থ ৭৫ ফুট। তবে বিমান বাহিনীর আপত্তি থাকায় বিমানবন্দরটি সংস্কার করে পুনরায় চালু করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

‘মুক্তিযুদ্ধের সময় শমশেরনগর বিমানবন্দরে নামতেন পাকিস্তানি সেনারা। বলা যায়, এ বিমানবন্দরকে ঘিরেই তাদের ঘাঁটি গড়ে ওঠে। বিমানবন্দর এলকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের’

শমশেরনগর বিমানবন্দর এলাকায় রয়েছে বধ্যভূমি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় শমশেরনগর বিমানবন্দরে নামতেন পাকিস্তানি সেনারা। বলা যায়, এ বিমানবন্দরকে ঘিরেই তাদের ঘাঁটি গড়ে ওঠে। বিমানবন্দর এলকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

বিমানবন্দর চালু কতদূর

চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল শমশেরনগরে বেসামরিক বিমানবন্দর স্থাপনের দাবিতে জাতীয় সংসদে জরুরি নোটিশ উত্থাপন করেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, মৌলভীবাজার জেলার পর্যটকদের সুবিধার্থে শমশেরনগরে অবস্থিত বিমান বাহিনীর ঘাঁটির একটি অংশ ব্যবহার করে একটি ছোট বেসামরিক বিমানবন্দর স্থাপন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

আরও পড়ুন

দুবাইয়ে যেভাবে গ্রেফতার হন বেনজীর আহমেদ

জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে অবস্থিত বিমানবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রানওয়েকে সীমিতভাবে বেসামরিক ব্যবহারের উপযোগী করার দাবিও তোলেন এমপি। তিনি বলেন, বিভিন্ন পর্যটন এলাকাগুলোতে যাতায়াত সহজ করতে বিমানবন্দর চালু জরুরি। পাকিস্তান আমল থেকে ব্যবহৃত এই বিমানঘাঁটির অবকাঠামো থাকলেও স্বাধীনতার পর তা বেসামরিক ব্যবহারে আনা হয়নি। এতে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

jagonews24বিমানবন্দরের জমিতে চাষাবাদ/ছবি-জাগো নিউজ

এর জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা সংসদকে জানান, শমশেরনগর বিমানঘাঁটি বর্তমানে বিমানবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে একাধিক সামরিক স্থাপনা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান।

‘আমরা লোকমুখে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি যত সময় পর্যন্ত বিমান বাহিনী অনাপত্তিপত্র দেবে না, ততদিন পর্যন্ত শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু করা সম্ভব হবে না। তবে বর্তমান সরকার কয়েকটি বিমানবন্দর চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করি শমশেরনগর বিমানবন্দরটি আবার চালু হবে’

তিনি বলেন, বিমানবন্দরটির বাণিজ্যিক ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। স্টাডি শেষ হলে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক দিকও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

অবহেলায় বন্ধ শমশেরনগর বিমানবন্দরস্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বিমানবন্দরটিতে যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামা করতো/ছবি-সংগৃহীত

মন্ত্রী আরও জানান, সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান এবং বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল এখনই উপযোগী নয়। তবে পর্যটন উন্নয়নের বিষয়টি সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।

আরও পড়ুন

কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবি এমপি মনিরুল হকের

প্রতীক্ষায় প্রবাসীরা

সরেজমিন দেখা গেছে, বিমানবন্দরের পতিত ভূমি লিজ দিয়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে। গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল কৃষি খামার। স্থানীয়রা বলছেন, বিমানবন্দরটি চালু হলে জেলাবাসীর ভোগান্তি কমবে।

বুলবুল আহমেদ ও আব্দুল আউয়াল নামের দুই প্রবাসী জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘মৌলভীবাজারের প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রবাসে আছেন। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। প্রবাসীদের যাতায়াতের জন্য অনেক কষ্ট হয়। বিমানবন্দরটি চালু হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন প্রবাসীরা। প্রবাসীদের কথা চিন্তা করে বিমানবন্দরটি চালু করা প্রয়োজন।’

জেলার পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী অনুপম রায় ও জুয়েল আহমেদ বলেন, ‘শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে এখানে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠবে। সড়ক ও রেলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেহাল থাকায় অনেক পর্যটক আসেন না। প্রবাসী ও পর্যটনের কথা চিন্তা করে বিমানবন্দর চালু করা প্রয়োজন।’

jagonews24বিমানবন্দরের জমিতে মাছচাষ/ছবি-জাগো নিউজ

বিমানবন্দরটি চালুর দাবি জানান স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মনু মিয়া। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাকিস্তানিরা যুদ্ধের সময় নিরীহ মানুষদেরকে ধরে এনে ডাক বাংলোয় নির্যাতন করে শমশেরনগর বিমানবন্দর এলাকায় নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। এই বিমানবন্দর নিয়ে অনেক ইতিহাস রয়েছে। মরার আগে বিমানবন্দরটি চালু দেখতে পেলে অনেক খুশি হতাম।’

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু করার জন্য আমি নিজে সংসদে দাবি উপস্থাপন করেছি। এরইমধ্যে ডিও লেটার দিয়েছি। প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলার মানুষ উপকৃত হবে বিমানবন্দর চালু হলে।’

এসআর/জেআইএম