দক্ষিণে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, নদী-খাল, বিস্তীর্ণ চিংড়িঘের, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির, সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত তীর্থস্থান ও সীমান্তসংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধন সাতক্ষীরা। প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই বৈচিত্র্য জেলাটিকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ অপর্যাপ্ত প্রচার, দুর্বল অবকাঠামো ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনো পর্যটকদের কাছে আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্ভাবনা আর বাস্তবতার এই ব্যবধান ঘোচাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, টেকসই পরিকল্পনা এবং পর্যটনবান্ধব বিনিয়োগ।

প্রকৃতি, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনাময় জেলা সাতক্ষীরা। একই জেলায় ম্যানগ্রোভ বন, নদী, উপকূলীয় জীবন, সীমান্ত, প্রত্নঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্থাপনার এমন সমন্বয় দেশের খুব কম অঞ্চলেই দেখা যায়। শীত মৌসুম, সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন। কেউ সুন্দরবনের গভীর সবুজ, হরিণ, বানর ও নদীপথের সৌন্দর্য দেখতে চান; কেউ ছুটে যান ঐতিহাসিক মন্দির, মসজিদ ও সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে। আবার অনেকের আগ্রহ উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম, চিংড়ি ও কাঁকড়াভিত্তিক অর্থনীতি, মৌয়াল-বাওয়ালিদের জীবন এবং সীমান্তসংস্কৃতি ঘিরে।

তবে এত বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরা এখনো দেশের মূল পর্যটন মানচিত্রে তার প্রাপ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। পর্যাপ্ত প্রচার, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ নৌযান, প্রশিক্ষিত গাইড, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও পর্যটকবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অনেকটাই অজানা।

বিশেষ করে সাতক্ষীরার পথ দিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণের সুযোগ তুলনামূলক সহজ ও আকর্ষণীয় হলেও জাতীয় পর্যায়ে এ রুটের প্রচার সীমিত। ফলে সম্ভাবনার তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা কম, আর পর্যটননির্ভর স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোকে একটি সমন্বিত পর্যটন কেন্দ্র রুপান্তর করা সম্ভব। এজন্য পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর প্রচারণা চালানো গেলে সাতক্ষীরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

‘সুন্দরবন ছাড়াও সাতক্ষীরায় ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব স্থানকে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, আবাসন এবং তথ্যসেবা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে। পর্যটনের উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

এতে শুধু জেলার পরিচিতিই বাড়বে না, স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও তৈরি হবে নতুন আয়ের সুযোগ। একই সঙ্গে সুন্দরবন, উপকূলীয় প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করে টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা গেলে সাতক্ষীরার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

যা আছে এই জেলায়

পর্যটকদের একটি বড় অংশ সুন্দরবন বলতে কেবল খুলনা-মোংলার পথকেই চেনে। কিন্তু সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করলে অল্প সময়েই নদী, বন ও বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। এই পথের দুপাশে দেখা মেলে কেওড়া, গরান, গেওয়া ও গোলপাতার বন, নদীতে ভেসে চলা জেলে নৌকা; কাঁকড়া ও চিংড়ি চাষের ঘের; আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা উপকূলীয় মানুষের জীবন। সুন্দরবনের পাশাপাশি সাতক্ষীরাজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জমিদারবাড়ি, সুফি সাধকের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, ঐতিহাসিক মসজিদ ও মন্দির।

সুন্দরবনের পশ্চিম দুয়ার

সাতক্ষীরা জেলার পর্যটনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সুন্দরবন। জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জকে বলা হয় সুন্দরবনের পশ্চিম দুয়ার। জেলা শহর থেকে সড়কপথে শ্যামনগর হয়ে মুন্সিগঞ্জে পৌঁছালেই চোখে পড়ে নদীর ওপারে সুন্দরবনের ঘন সবুজ রেখা।

অবকাঠামো সংকটে থমকে আছে সাতক্ষীরার পর্যটন সম্ভাবনা

মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা পর্যটকবাহী ট্রলারে কলাগাছিয়া, দোবেকি এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল ঘুরে দেখা যায়। সাতক্ষীরা ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রকাশিত তথ্যে নীলডুমুর খেয়াঘাট থেকে কলাগাছিয়া যেতে সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ মিনিট সময় লাগার কথা উল্লেখ রয়েছে।

‘আগে এই এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা খুব বেশি ছিল না। এখন ছুটির দিন ও শীত মৌসুমে অনেক মানুষ আসেন। এতে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে পর্যটকদের থাকার জন্য ভালো আবাসন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার।’

ট্রলার বা নৌকায় নদীর বুক চিরে এগিয়ে গেলে দুই পাশে দৃশ্যমান হয় নিস্তব্ধ বন। কখনো পাড়ের কাদায় রোদ পোহায় কুমির, কখনো গাছের ফাঁকে লাফিয়ে বেড়ায় বানর। ভাগ্য ভালো হলে বাঘ, হরিণের পাল, বন্য শূকর, গুইসাপ কিংবা নানা প্রজাতির জলচর পাখির দেখা মেলে। তবে সুন্দরবনের প্রকৃত আকর্ষণ শুধু বন্যপ্রাণী নয়; এর নীরবতা, জোয়ার-ভাটার ছন্দ এবং নদী ও বনের সম্মিলিত রূপ পর্যটকদের অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।

কলাগাছিয়া: অল্প সময়ে বনের স্বাদ

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক। নদীর ঘাট থেকে কংক্রিটের তৈরি হাঁটার পথ ধরে বনের ভেতরে প্রবেশ করা যায়। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারপাশের বন, নদী এবং বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অঞ্চল দেখা যায়। বর্তমানে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে সেখানে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে হরিণ ও কুমির রাখা হয়েছে। এখানে বানর ও হরিণের উপস্থিতি পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

আরও পড়ুন

ডাকাত আতঙ্কে অশান্ত হাওর

আকাশলীনা: নদী, বন ও সূর্যাস্তে

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে মালঞ্চ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার। নদীর ওপারেই সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। বিকেলের শেষ আলোয় নদী ও বনের ওপর সূর্যের রং বদলের দৃশ্য দেখতে এখানে প্রতিদিন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্তের পর্যটকেরা ভিড় করেন। সবুজ গাছপালা, বসার স্থান, নদীর তীরের পথ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ আকাশলীনাকে পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের জায়গা করে তুলেছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে রাত্রি যাপণের ব্যবস্থাও। এটি দক্ষিণাঞ্চলের আকর্ষণীয় ইকোট্যুরিজম স্থানগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

এছাড়া আকাশলীনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে খাবারের দোকান, নৌভ্রমণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পরিবহনসেবা তৈরি হয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এটি সুন্দরবনে প্রবেশকারী পর্যটকদের প্রধান বিরতিস্থল হতে পারে।

নীলডুমুর ও বুড়িগোয়ালিনীর নদীমাতৃক জীবন

শ্যামনগরের নীলডুমুর, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ এলাকায় পর্যটনের সঙ্গে মিশে আছে উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রা। নদীতে মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ, গোলপাতা ও মধু আহরণ, নৌকা মেরামত এবং চিংড়িঘেরকেন্দ্রিক কর্মব্যস্ততা পর্যটকদের কাছে জীবন্ত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। পর্যটকরা এখানে শুধু প্রকৃতি দেখবেন না, জানতে পারবেন মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে ও বনজীবীদের সংগ্রামের গল্প। বাঘের ভয়, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ত পানি ও জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাদের জীবন চলতে থাকে। স্থানীয় মানুষের এই জীবন ও সংস্কৃতিকে যুক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন চালু করা গেলে পর্যটন থেকে আয় সরাসরি উপকূলীয় পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাবে।

মান্দারবাড়িয়া: দুর্গম সৌন্দর্যের হাতছানি

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত। এটি দেশের পরিচিত সমুদ্রসৈকতগুলোর তুলনায় অনেকটাই নির্জন ও দুর্গম। সুন্দরবনের নদীপথ অতিক্রম করে সেখানে যেতে হয়। হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা, বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি এবং পাশে সুন্দরবনের সবুজ বন, এই তিনের মিলিত দৃশ্য মান্দারবাড়িয়াকে অনন্য করেছে। পর্যটনবিষয়ক বিভিন্ন গাইডে এটিকে সাতক্ষীরার অন্যতম নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

‘মুন্সিগঞ্জ ঘাটকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটন ঘাটে রূপান্তর করা প্রয়োজন। পর্যটকদের বসার স্থান, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, টিকিট কাউন্টার ও তথ্যকেন্দ্র থাকলে সেবার মান বাড়বে। একই সঙ্গে ট্রলারের ভাড়া নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা দরকার।’

তবে দুর্গম পথ, জোয়ার-ভাটার ঝুঁকি, বন বিভাগের অনুমতি, নিরাপদ নৌযান এবং আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে এখানে ভ্রমণ করা উচিত নয়। অভিজ্ঞ গাইড ও অনুমোদিত নৌযান ছাড়া মান্দারবাড়িয়া যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

যশোরেশ্বরী কালী মন্দির: বিশ্বাস ও ইতিহাসের মিলন

শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে ধুমঘাট গ্রাম, রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ছিল। তিনি বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম এবং দক্ষিণবঙ্গের একজন প্রতাপশালী শাসক ছিলেন। তার সময়ে প্রতিষ্ঠিত যশোরেশ্বরী কালীমন্দির সাতক্ষীরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান। দেশ-বিদেশ থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। মন্দিরকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরীপুর এলাকায় রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যের আরও কিছু নিদর্শন। এর মধ্যে ঐতিহাসিক হাম্মামখানা ও পুরোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ উল্লেখযোগ্য। পরিকল্পিত সংরক্ষণ, তথ্যকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত গাইডের ব্যবস্থা করা গেলে ঈশ্বরীপুরকে একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্য পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সাতক্ষীরার সরকারি ও বেসরকারি পর্যটন তালিকায় যশোরেশ্বরী কালীমন্দির ও ঈশ্বরীপুরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান হিসেবে স্থান পেয়েছে।

মুঘল আমলের মসজিদ

ঈশ্বরীপুর এলাকাতেই রয়েছে ঈশ্বরীপুর শাহী জামে মসজিদ, মসজিদটি মোঘল সম্রাট আকবরের শাষনকালে সময়ে তৈরি করা হয়। এছাড়া কালিগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে প্রবাজপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ জেলার মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন। মসজিদের নকশা, গম্বুজ, খিলান এবং কারুকাজ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। সাতক্ষীরা শহর থেকে সড়কপথে সহজেই সেখানে যাওয়া যায়।

অবকাঠামো সংকটে থমকে আছে সাতক্ষীরার পর্যটন সম্ভাবনা

তালা ও আশপাশের প্রাচীন স্থাপনা, গ্রামীণ হাট, নদী এবং স্থানীয় খাবারের সঙ্গে যুক্ত করলে পর্যটকেরা এক দিনের মধ্যেই ইতিহাস ও গ্রামীণ সংস্কৃতির স্বাদ নিতে পারবেন। তেঁতুলিয়া মসজিদ সাতক্ষীরার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের তালিকাভুক্ত।

সোনাবাড়িয়া মঠ ও সীমান্তের প্রত্নঐতিহ্য

কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দির প্রাচীন স্থাপত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। টেরাকোটা কারুকাজ ও পুরোনো নির্মাণশৈলীর কারণে স্থানটি ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে।

কলারোয়া সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে রয়েছে দুই বাংলার ভাষা, খাবার, পোশাক ও লোকাচারের প্রভাব।

আরও পড়ুন

বর্ষায় ঘুরে আসুন মৌলভীবাজারের ৯৩টি চা বাগান

নলতা শরীফ: আধ্যাত্মিক পর্যটন কেন্দ্র

কালীগঞ্জ উপজেলার নলতায় অবস্থিত খানবাহাদুর আহছানউল্লার স্মৃতিবিজড়িত নলতা শরীফ দেশের পরিচিত ধর্মীয় ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। প্রতিবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ওরসকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন।

পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ধর্মীয় আবহ এবং মানবসেবামূলক কার্যক্রমের কারণে নলতা শুধু তীর্থযাত্রী নয়, সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয়। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকায় নলতা শরীফকে জেলার দর্শনীয় স্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

দেবহাটার রূপসী ম্যানগ্রোভ ও ইছামতীর পাড়

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ইছামতী নদীর তীরে দেবহাটায় গড়ে ওঠা রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটনকেন্দ্র সাতক্ষীরার পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নদীর পাড়, কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, হাঁটার পথ এবং সীমান্তের দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

নদীর ওপারে ভারতের জনপদ দেখা যায়। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল, নদীতে জেলেদের চলাচল এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য মিলিয়ে জায়গাটি স্বতন্ত্র আবহ তৈরি করে। সীমান্তের স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় পর্যটকদের অবশ্যই নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হয়।

মোজাফফর গার্ডেন ও শহরকেন্দ্রিক বিনোদন

সাতক্ষীরা শহরের অদূরে মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্ট পরিবার ও শিশুদের বিনোদনের পরিচিত স্থান। শহরে আসা পর্যটকদের জন্য এটি স্বল্প সময়ের ভ্রমণ ও অবকাশযাপনের সুযোগ তৈরি করে। জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও মোজাফফর গার্ডেনকে সাতক্ষীরার পরিচিত পর্যটন ও বিনোদন স্থাপনার একটি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শহরকেন্দ্রিক পর্যটনের অংশ হিসেবে স্থানীয় বাজার, প্রাণসায়ের খাল, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান, চিংড়ি ও উপকূলীয় খাবারকেও পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়া যেতে পারে।

স্বাদের সাতক্ষীরা

পর্যটন শুধু স্থান দেখার বিষয় নয়; স্থানীয় খাবারও ভ্রমণের বড় অংশ। সাতক্ষীরা চিংড়ি, কাঁকড়া ও বিভিন্ন নদীর মাছের জন্য বিখ্যাত। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় কাঁকড়ার ঝোল, চিংড়ি ভুনা, পারশে, ভেটকি, ট্যাংরা ও চিতল মাছ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। এ ছাড়া খেজুরের রস ও গুড়, নারকেলনির্ভর খাবার এবং গ্রামীণ পিঠার ঐতিহ্য রয়েছে। ।

এছাড়া পর্যটনের সঙ্গে চোখে পড়বে উপকূলের সংগ্রাম। সাতক্ষীরার সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা। লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়ার ঘটনা উপকূলের মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় জেলার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় তুলনামূলক বেশি লবণাক্ততা এবং বহু বছর ধরে লবণাক্ততার বিস্তারের প্রবণতা উঠে এসেছে। এই সংকটকেই শিক্ষামূলক পর্যটনের অংশ করা যেতে পারে। জলবায়ু অভিযোজন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, লবণসহিষ্ণু কৃষি, উঁচু বসতঘর এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় উদ্ভাবন দেখার জন্য গবেষক, শিক্ষার্থী ও উন্নয়নকর্মীদের নিয়ে বিশেষ ভ্রমণ কার্যক্রম চালু করা সম্ভব।

এদিকে অপার সম্ভাবনা থাকলেও সাতক্ষীরার পর্যটন বিকাশে বেশ কিছু সংকট রয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মানসম্মত আবাসন সীমিত। পর্যটকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত গাইড, নিরাপদ ও মানসম্মত নৌযান, পর্যাপ্ত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল। অনেক স্থানে নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড নেই। জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে নির্ভুল মানচিত্র, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ কিংবা একীভূত বুকিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

পর্যটনে বদলাচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি

সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু পর্যটক সুন্দরবন দেখতে আসেন। পর্যটকদের আগমন বাড়লে স্থানীয় দোকান, হোটেল, নৌযান, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকদের আয়ও বাড়ে।

তিনি বলেন, আগে এই এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা খুব বেশি ছিল না। এখন ছুটির দিন ও শীত মৌসুমে অনেক মানুষ আসেন। এতে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে পর্যটকদের থাকার জন্য ভালো আবাসন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার।

মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মোমেনা বেগম বলেন, পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নারীদের জন্যও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। উপকূলীয় নারীদের তৈরি কেওড়ার আঁচার, নকশিকাঁথা, হাতের কাজের সামগ্রী ও স্থানীয় খাবার পর্যটকদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে অনেক পরিবার উপকৃত হবে। অথচ পণ্য বিক্রির নির্দিষ্ট জায়গা নেই। পর্যটনকেন্দ্রের পাশে নারীদের জন্য ছোট ছোট দোকান বা বিক্রয়কেন্দ্র করা হলে তারা নিজেরা আয় করতে পারবেন।

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার আরেক বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, পর্যটন বাড়লেও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট নদী এবং বনাঞ্চলের পরিবেশের ক্ষতি করছে।

তিনি বলেন, সুন্দরবন আমাদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। পর্যটক আসুক, এলাকার উন্নয়ন হোক, এটা আমরা চাই। কিন্তু এমনভাবে পর্যটন পরিচালনা করতে হবে, যাতে বন, নদী ও বন্যপ্রাণীর কোনো ক্ষতি না হয়। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটকদের সচেতন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

নিরাপদ নৌযান ও নির্ধারিত ভাড়ার দাবি

মুন্সিগঞ্জ ফরেস্ট ঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেছেন, মুন্সিগঞ্জ ঘাট থেকে কলাগাছিয়া, দোবেকি এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে পর্যটকদের নিয়ে নিয়মিত ট্রলার চলাচল করে। শীত মৌসুম ও সরকারি ছুটির দিনে পর্যটকের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

অবকাঠামো সংকটে থমকে আছে সাতক্ষীরার পর্যটন সম্ভাবনা

তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জ ঘাটকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটন ঘাটে রূপান্তর করা প্রয়োজন। পর্যটকদের বসার স্থান, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, টিকিট কাউন্টার ও তথ্যকেন্দ্র থাকলে সেবার মান বাড়বে। একই সঙ্গে ট্রলারের ভাড়া নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা দরকার।

আনিছুর রহমান আরও বলেন, পর্যটকবাহী প্রতিটি নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স এবং প্রশিক্ষিত চালক থাকা জরুরি। প্রতিকূল আবহাওয়া ও জোয়ার-ভাটার সময় নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘাটভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে সাতক্ষীরার পথ দিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে। এতে ট্রলার মালিক-শ্রমিকদের পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান এবং পরিবহন খাতের মানুষও লাভবান হবে।

সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জেলা শহর, তালা, কলারোয়া, দেবহাটা, কালীগঞ্জ ও শ্যামনগরের দর্শনীয় স্থানগুলোকে কয়েকটি পর্যটন সার্কিটে ভাগ করা যেতে পারে। এজন্য সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট ভাড়া, প্রশিক্ষিত গাইড, নিরাপদ পরিবহন, আবাসন, স্থানীয় খাবার এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা যুক্ত করা গেলে পর্যটকদের ভ্রমণ সহজ হবে। এছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাকে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করতে হবে।

আরও পড়ুন

পর্যটক সংকটে ম্লান হাওরের পর্যটন

তিনি বলেন, পর্যটনের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন স্থানীয় মানুষ সরাসরি এর সুফল পাবেন। উপকূলের নারীদের তৈরি হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, গোলপাতা ও প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি পণ্য পর্যটকদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইড, নৌযানচালক, রেস্তোরাঁকর্মী ও পর্যটন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় বাড়িতে নিরাপদ হোমস্টে চালু হলে পর্যটকেরা উপকূলীয় পরিবারের সঙ্গে থেকে তাদের জীবন, খাবার ও সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাবেন। এতে বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গ্রামের সাধারণ পরিবারও পর্যটন থেকে আয় করতে পারবে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেছেন, সুন্দরবন ছাড়াও সাতক্ষীরায় ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব স্থানকে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, আবাসন এবং তথ্যসেবা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে। পর্যটনের উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, সাতক্ষীরাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও পরিচিত করতে জেলার পর্যটন স্থানগুলোর প্রচার, মানসম্মত তথ্যচিত্র তৈরি, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং ডিজিটাল তথ্যসেবা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এনএইচআর/এএসএম