অক্সিজেনের অভাব ও চরম অবহেলার কারণেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। হাসপাতালটিতে যখন শিশুরা বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, তখন সেখানে কোনো অক্সিজেন ছিল না এবং কোনো চিকিৎসকও আসেননি বলে তিনি জানান।

আজ রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার কড়া জবাব দেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ছয়টা শিশু যখন হাত-পা বাইরে বের করে বাঁচার জন্য কাঁদছিল, সেই হাইপারক্যাপনিয়ায় কর্তৃপক্ষ এসি বন্ধ করে দিয়েছে, ঘরে জানালা নেই, কোনো অক্সিজেন নেই। ১৬-১৭ জন মানুষ, মায়েরা কাঁদছে, ছোটাছুটি করছে; একজন ডাক্তার আসেনি। সেই বাচ্চা গুলি ছটফট করতে করতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের জন্য মৃত্যুর কোলে পড়েছে।

বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাঁরা কোভিড টাইমে ইউনাইটেড হসপিটালে এবং বার্ন ইউনিটে আগুনের ঘটনার কথা বলেছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে একমত, ওগুলো ছিল দুর্ঘটনা, বিদ্যুতের কারণে। কিন্তু আদ্-দ্বীনে যে ঘটনা ঘটেছে, আপনারা কেউ সেখানে যাননি। আজকে সংসদে কথা বলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পর হাসপাতালের মালিক দেখতে পর্যন্ত যাননি। কিন্তু তিনি নিজে পরের দিনই সেখানে গিয়েছেন এবং চিকিৎসকেরা তাঁর কাছে অবহেলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আজকে অনেক মাননীয় সংসদ সদস্য বলেছেন—২০০ থেকে ২৫০ টাকায় তারা ডায়ালাইসিস করায়। সত্য। কিন্তু মাথাব্যথায় কি মাথা কেটে ফেলা যায়? না, কাটা যায় না। আমরা লাইসেন্স স্থগিত করেছি, হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিইনি। আপনারা প্রতিটি জিনিসকে কেন নিজেদের দলীয় আদর্শের সঙ্গে একীভূত করেন? দলীয় আদর্শ দিয়ে দেশের বিরোধিতা করা যায় না।

হাসপাতালের ভেতরের চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে বলেন, যেখানে হাসপাতালের অনুমতি নেওয়া হয়েছে, সেই ছয় তলার মধ্যে একটা বেকারি কারখানা করা হয়েছে। গন্ধে ঢোকা যায় না। এমন স্তূপ, প্লাস্টিকের বর্জ্য যে, আগুন লাগলে একটা রোগী বা অভিভাবক বাঁচতে পারবে না। মালিকের অবহেলার কারণে, তাঁর একগুঁয়েমির কারণে পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করে তাঁর স্ত্রীকে চিফ এক্সিকিউটিভ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় সরকার বসে থাকতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা সব হাসপাতালকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাই। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে দেশের ১৮ কোটি মানুষ। মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের মূল্য সরকারকে দেখতে হবে।

নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আই মাস্ট ডাই ফর মাই নেশন। আমি আমার প্রধানমন্ত্রীর নিয়োজিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আমার বাচ্চাগুলো মরে যাবে বিনা চিকিৎসায়, দ্যাট ক্যান্ট বি।

এর আগে প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এটি শুধু সংখ্যার বাজেট নয়; গুণগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। গরিব মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাজেটে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর পাশাপাশি মানুষের ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্স’ বা পকেটের খরচ কমানোর বিষয়টি এবার বাজেটে আনা হয়েছে।

একই সঙ্গে জলবায়ু দূষণ রোধে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রাইম মিনিস্টার ঘোষণা করেছেন, ‘ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি’—একটা সন্তান, একটা গাছ। প্রত্যেকটা প্রাইমারি স্কুলের শিশু তার আঙিনায় বা উঠানে একটি চারা গাছ লাগিয়ে ভবিষ্যৎ পরিবেশ উন্নত করবে।

উল্লেখ্য, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মালিকানাধীন। এই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সেখ মহিউদ্দিন। তিনি আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সেখ আকিজ উদ্দিনের বড় ছেলে।