সারা দেশে আইনশৃঙ্খলার চলমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে নতুন এক শঙ্কা দেখছে পুলিশ সদর দপ্তর। সেটি হলো ‘সাদা পতাকা মিছিল’। হঠাৎ করেই কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে সাদা পতাকা মিছিলের আয়োজন করা হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে পিস মার্চের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে রোববার পুলিশ সদর দপ্তরে বিস্তারিত অলোচনা হয়। আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ক্রাইম কনফারেন্সের বড় অংশজুড়ে আলোচনার বিষয় ছিল সাদা পতাকা মিছিল। এ কনফারেন্সে সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, এসপিরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রান্তে ছিলেন পদস্থ কর্মকর্তারা। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আইজিপির বক্তব্যের বরাত দিয়ে কনফারেন্স সূত্র জানায়, যে কোনো মূল্যে সাদা পতাকা মিছিল বন্ধ করতে হবে। হামাস বা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নামে সাদা পতাকা মিছিল কোনোভাবে সহ্য করা যাবে না। এ ধরনের কাজে যুক্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি জঙ্গি সংগঠনের বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে। আইজিপি বলেছেন, পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হবে। কুকুরের গলায় ইট বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য নরসিংদীর ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ আক্রান্ত সংক্রান্ত মামলাগুলোও নিবিড় তদন্তের নির্দেশ দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।

গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে ক্রাইম কনফারেন্সে বলা হয়, ‘সাদা পতাকাকে সামনে রেখে একটি বিশেষ মহল মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের জমায়েত করার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে এই মিছিলের আড়ালে আকস্মিক বিশৃঙ্খলা বা নাশকতা সৃষ্টি করা হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং গাজীপুরের মতো জনবহুল শিল্পাঞ্চলগুলোতে এই মিছিলকে কেন্দ করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ বিষয়টিকে আমলে নিয়ে আইজিপি দেশের সব রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপার এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারদের উদ্দেশে বলেন, অনুমতি ছাড়া সমাবেশ বরদাশত করা যাবে না। মিছিলের নামে কেউ রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে বা উসকানিমূলক তৎপরতা চালালে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আটক করতে হবে। স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি প্রয়োজনে যৌথ বাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে।

ক্রাইম কনফারেন্সে আইজিপি বলেন, একটি সভ্য সমাজে মানুষের পাশাপাশি অন্য প্রাণীদেরও নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কুকুরের গলায় ইট বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া বা পিটিয়ে মারার মতো অমানবিক ঘটনা সমাজকে নাড়া দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ এবং আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, যে মানুষ একটি প্রাণীকে সহজে হত্যা করতে পারে, সে সমাজের অন্য মানুষের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই এসব ঘটনায় জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না।

কনফারেন্স সূত্র জানায়, ২৫ জুন কুমিল্লার কাটাবিলে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ করে দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে ইথান আহমেদ নামে এক স্কুলশিক্ষার্থী। এর আগে ২০ জুন ঢাকার বনানীতে চলন্ত ট্রেনে এক কলেজছাত্রকে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করা হয়। এ দুই ঘটনাসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কনফারেন্সে উদ্বেগ প্রকাশ করে পুলিশ সদর দপ্তর। এ পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা জানিয়েছেন, সারা দেশে সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতির খুব বেশি তারতম্য না ঘটলেও মে মাসে এপ্রিলের তুলনায় মামলার সংখ্যা প্রায় এক হাজার বেড়েছে। আর এই মামলা বৃদ্ধির নেপথ্যে পুলিশের জোরদার উদ্ধার অভিযান। মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারজনিত কারণে মামলা বৃদ্ধি পাওয়াকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন তারা।

সূত্র জানায়, মামলা বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে মামলার নিষ্পত্তির হার বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে ক্রাইম কনফারেন্সে।

বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি এবং দস্যুতার মতো গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো যেন সঠিকভাবে এবং দ্রুত তদন্ত করা হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্লু-লেস মামলার ঘটনার পরপরই উদঘাটন সম্ভব হলেও, যেগুলো এখনো উদঘাটিত হয়নি, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদারকি করে রহস্য উদঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সভায় ধর্মীয় উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।

ক্রাইম কনফারেন্স থেকে মাঠ পর্যায়ে কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল বা পক্ষ যেন সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ করে উসকানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সেজন্য সর্বোচ্চ অ্যালার্ট (সতর্ক) থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে যেন কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বিগত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিষয়েও সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে কনফারেন্সে। আন্দোলন কেন্দ করে যেসব মামলা হয়েছিল, সেগুলো দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আসন্ন ৫ আগস্ট দেশের জুলাই আন্দোলন দিবস। দেশের সর্বস্তরের মানুষ যেন এই দিবস সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারেন, সেজন্য পুলিশকে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানগুলো যাতে কোনো বিঘ্ন ছাড়াই হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।