মেয়াদের অর্ধেক সময়ে এসে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকার দেশে ফিরলে শুক্রবারের (২৪ জুলাই) মধ্যে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন এমনটি সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন তার এক মুখপাত্র। আরো তিনটি সূত্র একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় সূত্রগুলোর নাম প্রকাশ করেনি সংবাদ সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৩ মিনিটে রয়টার্স এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেন জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে। বর্তমানে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগ করেন সে ক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। 

রাষ্ট্রপতি কেন পদত্যাগ করছেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি তার মুখপাত্র। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। এরপরই শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে চাপ দিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের প্রেস সচিব সারওয়ার আলম বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকারের কাছে একটি স্বাক্ষরিত চিঠি জমা দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কার্যকর হয়।” তিনি বলেন, “শুক্রবার স্পিকার থাইল্যান্ড থেকে ফিরলে রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।”

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি সাহবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর বিভিন্ন মহলে আলোচনার সৃষ্টি করে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিএনপির উচ্চ পর্যায় থেকে নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা বলেন, “রাষ্ট্রপতি তাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রায়ই বলতেন, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারি।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাইজিংবিডি ডটকমকে জানান, এ বিষয়ে এখনো তিনি অবগত নন। তিনি বলেন, “এটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়।”

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চান, তবে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারবেন। এ বিষয়ে সরকারের কোনো করণীয় নেই।”

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম আক্তার সিদ্দিক রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সংবিধানের ৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং পদত্যাগসহ অন্যান্য বিষয় উল্লেখ রয়েছে। ব্যক্তিগত কারণ, নৈতিক কারণে কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ হলে তা সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে।”

গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি তাকে সঙ্গে সঙ্গে সরানোর পথে যায়নি।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনা ছিল রাষ্ট্রপতি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কিনা। আর এখন বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রি—তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। এছাড়া পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিএনপি থেকে কেউ হচ্ছেন-নাকি দলের বাইরে থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হবে, এমন আলোচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বিএনপি তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সুযোগ পাবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দমন অভিযানে প্রায় ১৪০০ জন নিহত হন। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা।