বাংলা কবিতার হাজার বছরের প্রবহমান ধারায় কিছু কবি আসেন, যারা শুধু সময়ের রূপকার হন না, বরং হয়ে ওঠেন একটি ভূখণ্ডের সমগ্র সত্তার ভাষ্যকার। কবি আল মুজাহিদী তেমনই এক বিরল প্রজ্ঞাবান কবি, যার কবিতার জমিন নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের কর্দমাক্ত মাটি, প্রবহমান নদী, ঐতিহাসিক সংগ্রাম এবং এ দেশের মানুষের চিরায়ত আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মিশ্রণে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চার প্রধান স্তম্ভ-কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ এবং আল মাহমুদ যে আলাদা আলাদা নান্দনিক ও আদর্শিক বলয় তৈরি করেছিলেন, আল মুজাহিদীর কাব্যলোকে আমরা সেই চার ধারার এক অদ্ভুত ও সার্থক মেলবন্ধন দেখতে পাই। তিনি নজরুলের দ্রোহ, জসীমউদ্দীনের সারল্য, ফররুখের জাগরণী বিশ্বাস এবং আল মাহমুদের মৃত্তিকাসংলগ্নতাকে নিজের মতো করে আত্মস্থ করেছেন।
বাংলাদেশের মানুষ মূলত পলল মাটির সন্তান। এ মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়, আত্মিক। কবি জসীমউদ্দীন যেমন বাংলার পল্লী-প্রকৃতিকে নাগরিক সাহিত্যের ড্রয়িংরুমে পরম মমতায় স্থান করে দিয়েছিলেন, আল মুজাহিদী সেই মাটির ঘ্রাণকে আরও আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গভীরতা দান করেছেন। তার কবিতায় নদী শুধু জলধারা নয়, সেটি ইতিহাসের সাক্ষী। তার ‘মৃত্তিকার কাল’ কিংবা ‘হেমন্তের সূর্যাস্তে’ কাব্যগ্রন্থের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, কবি বাংলার নিসর্গকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসাবে উপস্থাপন করছেন। কবি লিখেছেন :
পলির চাদরে ঢাকা এই জল-মৃত্তিকার দেহ,
এখানে নদীর সাথে মানুষের নিবিড় মিতালী;
বুকের পিঞ্জর চিরে ফলে ওঠে সোনালী ফসল,
এ মাটি আমার মা, এ মাটিই চিরন্তন পালি।
উদ্ধৃত অংশে ‘জল-মৃত্তিকার দেহ’ রূপকটি গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আল মুজাহিদী যখন মানুষকে মাটির দেহ হিসাবে কল্পনা করেন, তখন তিনি মূলত আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’-এর সেই আদিম ও অকৃত্রিম লোকজ চেতনার উত্তরসূরি হিসাবে নিজেকে জাহির করেন। আল মাহমুদ যেমন লোকজ মিথকে আধুনিক কবিতার ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন, আল মুজাহিদীও বাংলার চিরচেনা বটতলা, ধানের শীষ, বর্ষার মেঘ আর কুপি বাতির আলোয় বাংলার মানুষের অস্তিত্বের আদিম শিকড়কে খুঁজে ফিরেছেন। তার কাছে ঐতিহ্য কোনো মৃত অতীতের কঙ্কাল নয়, বরং তা বর্তমানকে বাঁচিয়ে রাখার সঞ্জীবনী সুধা।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় যে পরাধীনতার বিরুদ্ধে আপসহীন দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিলেন, আল মুজাহিদী সেই আগুনের এক বিশ্বস্ত মশালবাহী। বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের যাবতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আল মুজাহিদীর কলম গর্জে উঠেছে নজরুলের মতো করেই। তবে নজরুলের দ্রোহ যেখানে ছিল অনেক বেশি সশব্দ ও আগ্নেয়গিরির মতো, আল মুজাহিদীর দ্রোহ সেখানে এক ধীরস্থির, গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে। স্বৈরাচার ও জনতার অধিকার হরণের বিরুদ্ধে কবি উচ্চারণ করেছেন :
দাঁড়াও স্বৈরাচারী, এই রাজপথ মানুষের কেনা নয়,
এখানে ঝরেছে রক্ত, এখানে জেগেছে অভয়;
শৃঙ্খল পরিয়ে তুমি কতদিন বেঁধে রাখবে জোয়ার?
ভেঙে যাবে সব কারা, খুলে যাবে মুক্তির দুয়ার।
এই পঙ্ক্তিগুলোতে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ বা ‘ভাঙার গান’-এর সেই চিরচেনা স্পন্দন অনুনাদিত হয়। কবি জানেন যে, বাংলার মানুষ স্বভাবগতভাবে শান্ত হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা সমুদ্রের জোয়ারের মতো অপ্রতিরোধ্য। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে আল মুজাহিদী শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসাবে দেখেননি; তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ধরা দিয়েছে শোষিতের বিরুদ্ধে শোষকের এক চিরকালীন ধর্মযুদ্ধ হিসাবে। তার কবিতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা কোনো পৌরাণিক দেবদূত নয়, বরং সে বাংলার কাদামাটি গায়ে মাখা এক সাধারণ চাষার ছেলে, যে নিজের মায়ের সম্ভ্রম বাঁচাতে রাইফেল কাঁধে তুলে নিয়েছে।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে ফররুখ আহমদ ছিলেন ইসলামি রেনেসাঁস বা পুনর্জাগরণের প্রধান কবি, আর আল মাহমুদ ছিলেন সেই বিশ্বাসের সঙ্গে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সেতুবন্ধকারী। আল মুজাহিদী এ দুই ধারার মধ্যবর্তী এক সুবর্ণরেখা। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমাদের কবিতায় যখন পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে এক ধরনের নাস্তিক্যবাদী ও শিকড়বিচ্ছিন্ন আধুনিকতার চর্চা শুরু হয়েছিল, তখন আল মুজাহিদী সতেরো কোটি মানুষের প্রাণের ধর্ম ও বিশ্বাসকে কবিতার নান্দনিক উপাদান হিসাবে সগৌরবে ফিরিয়ে আনেন। তার বিশ্বাস কোনো অন্ধ ধর্মান্ধতা নয়, বরং তা সুফিবাদের এক উদার আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। কবি লিখছেন :
আযানের ধ্বনি মিশে যায় ভোরবেলার দোয়েলের গানে,
আমার খোদার আরশ কাঁপে এই বাংলার ধানে;
সিজদায় অবনত বাংলার সবুজ জমিন,
এখানেই লেখা আছে পরম করুণার ঋণ।
এ চারটি লাইন বিশ্লেষণ করলে আল মুজাহিদীর দার্শনিক শক্তির গভীরতা টের পাওয়া যায়। তিনি ‘আযান’ (ঐশ্বরিক ডাক)-এর সঙ্গে ‘দোয়েলের গান’কে (প্রকৃতির ডাক) একাকার করে দিয়েছেন। তার কাছে স্রষ্টার আরাধনা মসজিদ বা মন্দিরের চার দেওয়ালের ভেতরে আবদ্ধ নয়; বাংলার দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানের খেতই যেন তার কাছে এক বিশাল প্রার্থনালয়। ফররুখ আহমদের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্য এসেছিল মরুভূমির উট, সিন্দবাদ বা কাফেলার রূপকে-যা ছিল কিছুটা দূরবর্তী। কিন্তু আল মুজাহিদী সে বিশ্বাসকে বাংলার জলবায়ু ও পলিমাটির সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে, তা এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন শ্বাস-প্রশ্বাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র হয়ে ওঠার যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, আল মুজাহিদী তাকে তার কবিতার ক্যানভাসে মহাকাব্যিক বিস্তৃতি দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তার কাছে শুধু ভাষার অধিকারের লড়াই ছিল না, তা ছিল বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় খোঁজার প্রথম মাইলফলক। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে তার পঙ্ক্তিমালা আমাদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত বেদনাবিধুর শিহরণ জাগায় :
একুশ আমার মায়ের মুখের প্রথম মিষ্টি বোল,
একুশ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো কল্লোল;
রক্তপলাশ হয়ে ফোটে রফিক-সালামের নাম,
বর্ণমালার জমিনে এঁকেছি স্বাধীনতার গ্রাম।
এখানে ‘কল্লোল’ শব্দের ব্যবহারটি লক্ষণীয়। রক্তের স্রোতকে কবি নদীর কল্লোলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কারণ নদীর গতি যেমন কেউ রোধ করতে পারে না, বাঙালির ভাষার অধিকারও কোনো স্বৈরাচারী শাসক দমিয়ে রাখতে পারেনি। আবার ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়কে তিনি দেখেছেন শতবর্ষের পরাধীনতার গ্লানি মোচনের এক পুণ্যতিথি হিসাবে। তার ‘হলুদ পাতার কান্না’ কাব্যগ্রন্থে আমরা দেখি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গের এক করুণ চিত্র। স্বাধীন দেশে যখন নব্য শোষকদের উত্থান ঘটে, তখন কবি আপসহীন ভাষায় তার সমালোচনা করেন। ইতিহাসের চারণকবি হিসাবে তিনি শুধু অতীতের বন্দনা করেননি, ভবিষ্যতের জন্য এক সজাগ প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছেন।
আল মুজাহিদীর কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার ভাষারীতি। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মুখের চলিত ভাষাকে কবিতার ধ্রুপদি কাঠামোর সঙ্গে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে যুক্ত করেছেন। তার শব্দভান্ডারে তৎসম শব্দের গম্ভীর গাম্ভীর্যের পাশাপাশি আরবি, ফার্সি এবং খাঁটি দেশি শব্দের এক বিস্ময়কর মিথস্ক্রিয়া দেখতে পাওয়া যায়। ‘মোনাজাত’, ‘দরগা’, ‘কিয়ামত’, ‘ইনসান’-এর মতো শব্দগুলো তার কবিতায় কোনো আগন্তুক শব্দের মতো জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে না, বরং ‘মৃত্তিকা’, ‘কমল’, ‘অবগাহন’ কিংবা ‘ধানের চিড়ে’র সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক জৈবিক ঐক্য তৈরি করে।
জসীমউদ্দীন যেখানে খাঁটি গ্রাম্য শব্দ ব্যবহার করতেন এবং আল মাহমুদ যেখানে আঞ্চলিক মিথকে প্রাধান্য দিতেন, সেখানে আল মুজাহিদী পরিশীলিত নাগরিক প্রমিত বাংলার ভেতরে লোকজ আত্মাকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তার কবিতার ছন্দ মূলত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের, যা পড়তে গেলে বাংলার বাউল ও ভাটিয়ালি গানের সুর মনের ভেতরে আপনাআপনিই বেজে ওঠে।
মহাকাল সবসময়ই সত্যিকারের খাঁটি কবিকে ছাঁকনিতে ছেঁকে নিজের কাছে রেখে দেয়। কবি আল মুজাহিদী বাংলাদেশের সেই সমষ্টিক চেতনার কবি, যিনি নাগরিক কোলাহলের ভেতরে বসেও হারিয়ে ফেলেননি তার গ্রামের বাড়ির মেঠোপথের ঠিকানা। কাজী নজরুল ইসলামের কাছ থেকে তিনি ধার করেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তর্জনী উঁচিয়ে কথা বলার সাহস; জসীমউদ্দীনের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বাংলার দুঃখী মানুষের মনের ভাষা বোঝার ক্ষমতা; ফররুখ আহমদের কাছে শিখেছিলেন আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের মন্ত্র; আর আল মাহমুদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন মাটির গভীর থেকে শিল্পের রস নিংড়ে নেওয়ার কৌশল। এ চার মহারথীর কাঁধে ভর দিয়ে আল মুজাহিদী তৈরি করেছেন তার নিজস্ব এক পঞ্চম অধ্যায়।
আজকের এ বিশ্বায়নের যুগে, যখন আমাদের নতুন প্রজন্ম নিজস্ব সংস্কৃতি ও শেকড় থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন আল মুজাহিদীর কবিতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়-আমরা কে, আমাদের শিকড় কোথায় এবং কোন রক্তের মূল্যে এ মানচিত্র আমাদের অর্জিত। তিনি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একজন লিপিকার নন, তিনি এ ভূখণ্ডের চিরন্তন আত্মার এক নান্দনিক পাহারাদার। বাংলা কবিতার জমিনে যতদিন পলি পড়বে, যতদিন এদেশের নদীগুলো সাগরের দিকে বয়ে যাবে, ততদিন কবি আল মুজাহিদীর পঙ্ক্তিমালা এ দেশের মানুষের মুখে মুখে ও মনোজগতে উচ্চারিত হতে থাকবে।








