এই মৌসুমে আম না খেয়ে থাকা কি সম্ভব? আর এমন সুস্বাদু ফল দেখলে ইচ্ছা সংবরণ করা সম্ভব হয় না। অথচ আম যতই স্বাদের হোক না কেন, সবার জন্য উপাদেয় নয়, বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের গাউট আছে।

এই আমের মৌসুমে আম খাওয়ার লোভ সবারই হয়। এই সময় আত্মীয়স্বজনের বাসায় গেলেও আম নিয়ে যান সবাই, অতিথিকেও খেতে দেওয়া হয় আম। আর বাসায় তো নিয়ম করে আম খাওয়া একটি মৌসুমি ডিমান্ড। কিন্তু আপনি জেনে আতঙ্কিত হতে পারেন যে বেশি পরিমাণে আম খেলে ইউরিক অ্যাসিড বাড়তে পারে, বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ ইউরিক অ্যাসিড বা গাউটের সমস্যা আছে। তবে এটা সরাসরি পিউরিনের কারণে নয়, বরং আমের উচ্চ ফ্রুকটোজের (ফলের চিনি) জন্য। যাঁরা এমন সমস্যায় আছেন, তাঁদের আম খেতে হবে পরিমিত ও বুঝেশুনে। আম খেলে যে ইউরিক অ্যাসিড বাড়তে পারে, সেই বিজ্ঞানটা বুঝলে আম খাওয়ার ভুল কৌশল থেকে বের হতে পারবেন।

কেন হতে পারে

• ফ্রুকটোজের প্রভাব: আমে প্রচুর প্রাকৃতিক চিনি (ফ্রুকটোজ) থাকে। অতিরিক্ত ফ্রুকটোজ শরীরে ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং কিডনির মাধ্যমে তার নিষ্কাশন কমাতে পারে। অনেক মেডিক্যাল সোর্স গাউট রোগীদের জন্য আমসহ উচ্চ ফ্রুকটোজ ফল (আঙুর, কলা, আনারস ইত্যাদি) সীমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দেয়।

• পিউরিন কম: আমে পিউরিনের পরিমাণ খুবই কম, তাই সরাসরি পিউরিনসমৃদ্ধ খাবারের (লাল মাংস ও সি ফুড) মতো প্রভাব নয়। কিন্তু অতিরিক্ত খাওয়া ফ্রুকটোজের মাধ্যমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ফ্রুকটোজ (ফলের চিনি) শরীরে অন্যান্য চিনির (যেমন গ্লুকোজ) মতো বিপাক হয় না। এর ফলে লিভারে একটি বিশেষ প্রক্রিয়া চলে, যা ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। মূল ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো—

দ্রুত ফসফোরিলেশন (Phosphorylation)

• ফ্রুকটোজ লিভারে প্রবেশ করলে ফ্রুকটোকিনেজ (KHK) নামক এনজাইম এটাকে দ্রুত ফ্রুকটোজ-১-ফসফেটে রূপান্তর করে।

• এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর ATP (শরীরের এনার্জি মলিকিউল) ব্যবহার হয় ও ফসফেট দ্রুত কমে যায়।

ATP কমে যাওয়া ও AMP বাড়া

• ATP কমে গেলে শরীরের ভেতরে AMP (Adenosine Monophosphate) জমতে থাকে।

• এই AMP-কে AMP ডিঅ্যামিনেজ (AMPD) এনজাইম ভেঙে ইনোসিন মনোফসফেট (IMP) তৈরি করে।

পিউরিনের ভাঙন ও ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন

• IMP-ইনোসিন-হাইপোক্সান্থাইন-জ্যান্থাইন-ইউরিক অ্যাসিড।

• এই পুরো প্রক্রিয়ায় পিউরিন নিউক্লিওটাইড ভেঙে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়।
যার পরিণতি: রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায় (হাইপারইউরিসেমিয়া), যা গাউট, জয়েন্টের ব্যথা ও অন্যান্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে কিডনির ওপর চাপ পড়ে, যার কারণে ফ্রুকটোজ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়াতে পারে, যা কিডনি দিয়ে ইউরিক অ্যাসিড বের হওয়া কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত ফ্রুকটোজ খেলে (বিশেষ করে প্রসেসড ফুড, সফট ড্রিংকস, ফ্রুট জুস) এই প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয়।
মূলত গ্লুকোজের বিপরীতে ফ্রুকটোজের কোনো নেগেটিভ ফিডব্যাক নেই, তাই অতিরিক্ত খেলে লিভার ‘ওভারলোড’ হয়ে ATP নষ্ট করে ইউরিক অ্যাসিড বানায়।

ফ্রুকটোকিনেজ এনজাইমের ভূমিকা

ফ্রুকটোকিনেজ (যাকে কেটোহেক্সোকিনেজ বা KHKও বলা হয়) হলো শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম, যা ফ্রুকটোজের বিপাকের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ফ্রুকটোজকে ফসফোরিলেট করা, ফ্রুকটোজ (ফলের চিনি) লিভারে প্রবেশ করলে ফ্রুকটোকিনেজ এটিকে দ্রুত ফ্রুকটোজ-১-ফসফেটে রূপান্তর করে। অতিরিক্ত ফ্রুকটোজ খেলে ফ্রুকটোকিনেজ অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে লিভারকে ওভারলোড করে। এ জন্যই অতিরিক্ত আম, ফ্রুট জুস, সফট ড্রিংকস বা প্রসেসড ফুড ইউরিক অ্যাসিড, মেদভুঁড়ি, ফ্যাটি লিভার ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়ায়। ফ্রুকটোকিনেজ হলো ফ্রুকটোজের ‘গেটকিপার’ এনজাইম। এটি ফ্রুকটোজকে দ্রুত শোষণ করে শরীরে চর্বি ও ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের পথ খুলে দেয়।

ইউরিক অ্যাসিডের সঙ্গে যোগসূত্র

• ATP কমে গেলে AMP জমতে থাকে।

• AMP ভেঙে শেষ পর্যন্ত ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়, অর্থাৎ ফ্রুকটোকিনেজ হলো ফ্রুকটোজ, ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।

কতটা খাওয়া উচিত

• সাধারণ মানুষের জন্য: মাঝারি পরিমাণে (এক থেকে দুটি ছোট আম বা এক কাপ কাটা আম) খাওয়া সাধারণত নিরাপদ, যা ভিটামিন সি ও ফাইবারের জন্য উপকারী।

• উচ্চ ইউরিক অ্যাসিড বা গাউট থাকলে: খুব সীমিত রাখুন (দিনে একটি ছোট টুকরা বা তার কম)। অতিরিক্ত খেলে ফ্লেয়ার-আপ (ব্যথা বাড়া) হতে পারে। ফলের জুস বা শেক এড়িয়ে চলুন, কারণ, তাতে চিনির ঘনত্ব বেশি। ফ্রুট জুস, সুগার সিরাপ ও HFCS যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।

আম খেয়ে ব্যথা বেড়ে গেলে যদি পানি বেশি খান (দিনে তিন থেকে চার লিটার), এতে ইউরিক অ্যাসিড নিষ্কাশন সহজ হয়। উচ্চ পিউরিনযুক্ত খাবার (লাল মাংস, অ্যালকোহল, সি ফুড) এড়িয়ে চলুন। লেবু, চেরি ও বেরি জাতীয় ফল ইউরিক অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করতে পারে। সবচেয়ে ভালো তেজপাতা জ্বাল দেওয়া পানি প্রতিদিন দুই কাপ করে পান করুন।

লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নিবার্হী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র