দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দ্রুত একটি ‘জাতীয় কেমিক্যাল নীতি’ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, বস্ত্র ও প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত অধিকাংশ রাসায়নিক বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ নির্ভরতা কমাতে সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণের পাশাপাশি চারটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন জরুরি।

শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসিআই কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও এসআর স্পেশালটি কেমিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রব্বানী।

তিনি বলেন, দেশের প্রায় সব প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পই রাসায়নিক কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত প্রায় আড়াই হাজার ধরনের রাসায়নিকের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্রায় ৯০ শতাংশ অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) আমদানিনির্ভর। একইভাবে চামড়াশিল্পের অধিকাংশ ট্যানিং কেমিক্যালও বিদেশ থেকে আসে।

আসিফ রব্বানী জানান, দেশের রাসায়নিক শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার বর্তমানে ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। খাতটি বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়লেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাসায়নিক আমদানির পরিমাণ বেড়ে ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। জাতীয় মোট আমদানির প্রায় ১০ শতাংশই রাসায়নিক পণ্য।

আরও পড়ুন

সার্কভুক্ত দেশে রপ্তানিতে অগ্রগতি নেই বাংলাদেশের

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় উৎপাদকরা উল্টো শুল্ক কাঠামো, এইচএস কোডের জটিলতা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার, বিশেষায়িত কেমিক্যাল গুদামের অভাব, গ্যাস-বিদ্যুতের অনির্ভরযোগ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারের সংকট এবং দুর্বল লজিস্টিক ব্যবস্থার কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মূল প্রবন্ধে চারটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো-

১. শুল্ক কাঠামো সংশোধন, এইচএস কোডের সমন্বয় এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অপব্যবহার বন্ধ করা।
২. বিশেষায়িত কেমিক্যাল গুদাম, কেমিক্যাল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড), আধুনিক পরীক্ষাগার এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা।
৩. সিঙ্গেল উইন্ডো লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কেমিক্যাল নীতি প্রণয়ন।
৪. এপিআই গবেষণা, গ্রিন কেমিস্ট্রি এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের গবেষণা সহযোগিতা জোরদার করা।

সভাপতির বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে শক্তিশালী কেমিক্যাল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয়ভাবে ডাই, কেমিক্যাল ও অন্যান্য স্পেশালটি ইনপুটের উৎপাদন বাড়ানো না গেলে উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

বক্তারা জানান, আধুনিক কেমিক্যাল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে রাসায়নিকের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সক্ষমতা ৬০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং রপ্তানি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

সেমিনারে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিসিএসআইআর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন।

ইএইচটি/এএমএ