জার্মানি ফুটবল দল যেন অতীতের ছায়া। একের পর এক বিশ্বকাপ–ব্যর্থতার আড়ালে ঢাকা পড়েছে তাদের যাবতীয় গৌরব, দীর্ঘায়িত হচ্ছে দুঃসময়।

২০১৪ সালে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতেছিল জার্মানি। এর পর থেকেই তাদের আর চেনা যাচ্ছে না। ২০১৮ আর ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপ থেকেই বিদায়।

এবার কুরাসাওকে ৭–১ গোলে উড়িয়ে ভালো শুরু করলেও শেষ ৩২–এর লড়াইয়ে টাইব্রেকারের প্যারাগুয়ের কাছে হেরে আরও কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে দলটি।

দীর্ঘ ১২ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো নকআউট ম্যাচ খেলতে নেমে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ফক্সবরোর বোস্টন স্টেডিয়ামে যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়ল, তা জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে চূড়ান্ত পতন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বাভাবিকভাবেই জার্মানির কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান পড়েছেন তীব্র তোপের মুখে। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্নবাণে জর্জর হতে হয়েছে। সব প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে এই ব্যর্থতা তিনি মেনে নিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, এটাও বলেছেন, জার্মানি এখন আর ফুটবলের পরাশক্তি নয়, ‘আপনি যদি প্রথম পর্বের পরেই বিদায় নেন, তবে তা জার্মান ফুটবলের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি এখন টানা তৃতীয়বারের মতো বিদায় বা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া, তাই আমরা আর প্রথম সারির দলগুলোর অংশ নই। আমি অত্যন্ত হতাশ।’

হতাশ জার্মানি

তবে এই হারের জন্য অতিরিক্ত সময়ে ভিএআরে গোল বাতিলকেও পরোক্ষভাবে দায়ী করেছেন। গোল বাতিল নিয়ে তাঁর মুখে বিস্তর ক্ষোভ, ‘অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান টাহর হেডার বাতিল করার সিদ্ধান্তটি ছিল একদম একটি রসিকতা।’

ভিএআরে গোল বাতিল নিয়ে জার্মানির কোচের ক্ষোভ থাকাই স্বাভাবিক, কিন্তু ম্যাচের আগে কাগজে-কলমে জার্মানি ফেবারিট থাকলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি জিততে না পারা দলটির জন্য বড় ব্যর্থতাই। নাগলসমানের এই জার্মানিকে দেখে মনে হয়নি যে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ বা ২০১৪ সালের সেই লড়াকু ও অপরাজেয় জার্মানির উত্তরসূরি।

প্যারাগুয়ে গ্রুপ পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে কোনোমতে শেষ ৩২-এ জায়গা পেয়েছিল, কিন্তু মাঠে তারা জার্মানির বিশ্বসেরা তারকাদের এক ইঞ্চি জায়গাও ছেড়ে দেয়নি; বরং টাইব্রেকারে জয় ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটাকে করে রেখেছে স্মরণীয়।

ব্রাজিল জাপানের কাছে হারবে— ভবিষ্যদ্বাণী করা জার্মান সেই অর্থনীতিবিদকে নেইমারের খোঁচা

প্যারাগুয়ের শেষ পেনাল্টিটি জালে জড়াতেই স্টেডিয়ামে তাদের সমর্থকেরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। পরের রাউন্ডে সম্ভাব্য ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে হলেও বোস্টনের এই রূপকথা তাঁরা চিরকাল মনে রাখবে। আর উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে আসা জার্মান ফুটবলাররা টাইব্রেকারের পর মাঠের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। জার্মানির সাবেক তারকা ক্লিন্সম্যান এই হারকে বিব্রতকর বলেছেন। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ নাগলসমানকে বরখাস্তের দাবি তুলেছেন।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ নাগলসমানকে বরখাস্তের দাবি তুলেছেন।

তবে পদত্যাগ করতে চান না বলে জানিয়ে দিয়েছেন নাগলসমান। তাঁর কথা ‘ডিএফবি (জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) যদি আমাকে চায়, আমি দায়িত্ব পালন করে যাব। আমি জানি, অনেক মানুষ চান, আমি চলে যাই, কিন্তু ডিএফবি চাইলে আমি কাজ চালিয়ে যেতে সানন্দেই রাজি। আমি আমার বসের কাছে আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরব। আজ যদি জার্মানিতে কোনো জরিপ করা হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আমার সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলবে না। এই টুর্নামেন্টে আমরা তেমন কিছুই করতে পারিনি। তবে আমি এমন কোনো মানুষ নই যে পরিস্থিতি দেখে পালিয়ে যাব।’

এই কঠিন সময়ে কথা বলেছেন ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়েও, ‘সম্ভবত আমাদের একটি বড় পরিবর্তন দরকার। দেখা যাক, কী হয়। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের কিছু সমাধান খুঁজতে হবে। আমি আজ বিস্তারিত বলতে চাই না। তবে কিছু জিনিস পরিবর্তন করা দরকার।’

২০১৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ থেকে জার্মানি বিদায় নিয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। পরের বিশ্বকাপে শক্তিশালীভাবে ফেরার আশা নিয়েও সেই একই গল্প। এবারও ব্যর্থ জার্মানি। ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে কীভাবে জার্মানি ঘুরে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার।

জার্মানির গোলটি বাতিল হলে ‘আর্সেনালের চ্যাম্পিয়ন হওয়ারই কথা নয়’