আতঙ্ক নয়, অপেক্ষা। আনচেলত্তির ঠান্ডা মাথার কৌশলেই জাপানের দুর্গ ভাঙল ব্রাজিল। হাফটাইমের বাঁশি বাজতেই হিউস্টন স্টেডিয়ামে যেন দুই রকমের ছবি।
এক পাশে উল্লাসে ভাসছে জাপান। অন্য পাশে হতাশায় ডুবে ব্রাজিল। স্কোরবোর্ড বলছে ১-০। মাঠে দৌড়ে বেড়ানো জাপানি ফুটবলারদের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস, আর ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট অস্বস্তি। কিন্তু সেই মুহূর্তে একজন মানুষ ছিলেন, যার মুখে উদ্বেগের ছাপ ছিল না। তিনি কার্লো আনচেলত্তি। তার চোখে যেন লেখা ছিল, ম্যাচ এখনও শেষ হয়নি।
প্রথমার্ধে জাপান ঠিক সেই খেলাটাই খেলেছিল, যেটা তারা চেয়েছিল। দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ, নিখুঁত সংগঠন আর মাঝমাঠে ব্রাজিলকে ধীর করে দেওয়ার পরিকল্পনা। ব্রাজিলের অভিজ্ঞ কিন্তু তুলনামূলক ধীরগতির মিডফিল্ড ও রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলেছিল তারা। একটি সুযোগ থেকেই গোল করে এগিয়েও যায়।
অনেক কোচ এমন পরিস্থিতিতে হুটহাট পরিবর্তন করেন। কেউ অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে তুলে নেন, কেউ পুরো ছক বদলে ফেলেন। আনচেলত্তি তা করেননি। ড্রেসিংরুমে তিনি আতঙ্ক ছড়াননি। বরং বদলেছিলেন ম্যাচের গল্প। চোটের কারণে লুকাস পাকেতাকে তুলে নিতে হলেও তার জায়গায় আরেকজন একই ধরনের মিডফিল্ডারকে নামাননি। মাঠে পাঠালেন তরুণ এন্দ্রিককে।
সিদ্ধান্তটি ছিল সাহসী, আবার হিসেবি এন্দ্রিক মাঠে নেমেই ম্যাচের গতি বদলে দেন। মাঝমাঠ থেকে সামনে বল বহনের গতি বাড়ে। জাপানের ডিফেন্ডাররা আর আগের মতো স্বস্তিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ব্রাজিলের আক্রমণে আসে নতুন প্রাণ। কিন্তু আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত ছিল অন্যটি।
প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড দেখেছিলেন কাসেমিরো। জাপানের গোলের সময় তাকেই সহজে কাটিয়ে উঠেছিলেন কাইশু সানো। অনেক কোচই হয়তো ঝুঁকি না নিয়ে তাকে তুলে নিতেন। আনচেলত্তি জানতেন, বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতা কখনও কখনও একটি ভুলের চেয়েও বেশি মূল্যবান। তিনি ক্যাসেমিরোকেই রেখে দিলেন। আর সেই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল একেবারে অন্য রূপে খেলতে শুরু করল। ছোট ছোট পাসের বদলে তারা বারবার বল তুলতে লাগল জাপানের বক্সে। প্রথমার্ধে যেখানে মাত্র ১২টি ক্রস করেছিল, বিরতির পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭টিতে। পরিকল্পনাটা ছিল পরিষ্কার। জাপানের রক্ষণকে আকাশপথে চাপে ফেলতে হবে।
এই কৌশলের প্রথম পুরস্কার এনে দেন ক্যাসেমিরোই। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে দুর্দান্ত হেড করে সমতা ফেরান তিনি। গোলের পরও আনচেলত্তি থামেননি। তিনি বুঝেছিলেন, জাপান এখন নিজেদের অর্ধেই আটকে পড়েছে। তাই একের পর এক আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নামিয়ে চাপ আরও বাড়িয়ে দেন। পুরো দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখল, আক্রমণ আর মাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রাজিলের হাতে।
জাপান অপেক্ষা করছিল একটি পাল্টা আক্রমণের জন্য। কিন্তু সেই সুযোগই আর তৈরি হতে দিল না ব্রাজিল। সময় গড়িয়ে যোগ করা সময়ে পৌঁছেছে। অনেকের চোখ তখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে। ঠিক তখনই এল শেষ আঘাত। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ডান পাশের ফাঁকা জায়গায় দৌড় দিলেন। নিখুঁত সময়ে বল পেলেন। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে জাপানের গোলরক্ষক জায়ন সুজুকিকে পরাস্ত করলেন। গোলের পর হিউস্টন স্টেডিয়াম মুহূর্তেই ব্রাজিলের উৎসবে পরিণত হলো। খেলোয়াড়রা ছুটছেন। বেঞ্চ থেকে সবাই মাঠে ঢুকে পড়েছেন। গ্যালারিতে উন্মাদনা।
আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও কার্লো আনচেলত্তি ছিলেন প্রায় একই রকম শান্ত। মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য যেন তিনি আগেই দেখে রেখেছিলেন। এই জয় হয়তো ব্রাজিলের সবচেয়ে নান্দনিক ফুটবলের গল্প নয়। কিন্তু এটি একজন কোচের ধৈর্য, বিশ্বাস আর সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গল্প।
যেখানে আতঙ্ক নয়, ঠান্ডা মাথাই শেষ পর্যন্ত জাপানের সুসংগঠিত দুর্গ ভেঙে ব্রাজিলকে তুলে দিল বিশ্বকাপের পরের রাউন্ডে। হয়তো এই কারণেই বলা হচ্ছে, এই ব্রাজিল দলে সবচেয়ে বড় তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নন, এন্দ্রিকও নন। সবচেয়ে বড় শক্তির নাম কার্লো আনচেলত্তি।








