মরক্কো বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে, তবে এইটুকু শুনলে আপনি নাটকের মোটে এক শতাংশও জানবেন না। কারণ, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর এবং পাগলাটে ফুটবল যুদ্ধ!

রক্তক্ষয়ী প্রথমার্ধ এবং মাঠের যুদ্ধ

ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠ রূপ নেয় এক রণক্ষেত্রে। ডাচ ডিফেন্ডার ইয়ান পল ফান হেকে পুরো প্রথমার্ধ জুড়ে যেন জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করলেন। ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে সাইবারিকে এক কঠিন ট্যাকল করতেই দুজনের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর একে একে আজেদ্দিন উনাহির কনুইয়ের আঘাত এবং নুসাইর মাজরাউইয়ের বুটের অসাবধান চোট আছড়ে পড়ে ফান হেকের ওপর। মাথা ফেটে যখন ফান হেকের রক্ত ঝরতে শুরু করল, তখন সেটিই যেন হয়ে উঠল এই ম্যাচের শারীরিক লড়াইয়ের আসল প্রতীক। বলের দখল নিতে দুই দলই একের পর এক সংঘর্ষে জড়াল। অথচ সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখানো রেফারি উইলটন সাম্পাইও এই ম্যাচে কাউকেই একটা হলুদ কার্ডও দেখালেন না!

কোমানের কৌশল ও গাকপোর অশ্রুসিক্ত সেই মহাকাব্য

এই ম্যাচে ডাচ কোচ রোনাল্ড কোমান প্রথমবারের মতো পাঁচ ডিফেন্ডারের এক নিরেট রক্ষণব্যূহ সাজান। ফান হেকে, ভার্জিল ফন ডাইক, নাথান আকে ও মিকি ফান ডে ভেনকে একসাথে নামিয়ে দেন তিনি। মরক্কোর গতিদানব আচরাফ হাকিমিকে বোতলবন্দি করতে ফান ডে ভেনকে খেলানো হয় উইংব্যাকের ভূমিকায়। এই কৌশলে রক্ষণ সামলানো গেলেও আক্রমণে নেদারল্যান্ডসের গতি কমে যায়। অবশেষে ৭০ মিনিটে আকে-কে তুলে মাঠে নামানো হয় দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকার ভাউট ভেগহর্স্টকে। আর এই মাস্টারস্ট্রোক কাজে লেগে যায় মাত্র দুই মিনিটে! ৭২ মিনিটে ভেগহর্স্টের হেড থেকে বল পান সামারভিল, তাকে ফাউল করা হলেও সুযোগ হাতছাড়া হয়নি। সেখানে ওত পেতে থাকা কোডি গাকপো নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে দেন।

গোলটি করার পরপরই তৈরি হয় বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক এক মুহূর্ত। গাকপো হাঁটু গেড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সতীর্থদের আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের জার্সিতে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। 

গর্ভাবস্থায় নিজের অনাগত পুত্রসন্তানকে হারিয়েছেন গাকপো ও তার সঙ্গী নোয়া ভ্যান ডের বাই। চরম এই পারিবারিক ট্র্যাজেডির পরও ডাচ কোচ কোমানকে তিনি একবারের জন্যও বলেননি যে টুর্নামেন্ট ছেড়ে চলে যেতে চান।   কান্নার পর উঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে আঙুল তুলে গোলটি তিনি উৎসর্গ করেন তার সেই প্রয়াত সন্তানকে। গ্যালারিতে বসে থাকা তার বাবা-মাও তখন চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। এটি সবাইকে মনে করিয়ে দিল, ফুটবলের চেয়েও জীবনে বড় কিছু বিষয় আছে।

গ্যালারির মেক্সিকান গর্জন

সাধারণত ডাচ সমর্থকরাই গ্যালারি মাতিয়ে রাখে, কিন্তু এবার পুরো স্টেডিয়াম দখল করে নিয়েছিল মরক্কোর লাল সমর্থকেরা। আর তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল হাজার হাজার মেক্সিকান দর্শক! ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিট থেকেই গ্যালারিতে ধ্বনিত হচ্ছিল, 'নো এরা পেনাল' (ওটা পেনাল্টি ছিল না)। এটি আসলে ২০১৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মেক্সিকোর সেই বিতর্কিত পেনাল্টির ক্ষোভ, যেখানে আরিয়েন রোবেনের পড়ে যাওয়াকে মেক্সিকানরা ডাইভ মনে করে। ম্যাচের আগে ডাচ অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক এক সাংবাদিকের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেছিলেন মেক্সিকানরা ডাচদের হার চাইবে না, কিন্তু গ্যালারির গর্জন প্রমাণ করে দিল ফান ডাইক ভুল ছিলেন!

শেষ মুহূর্তের সমতা ও অবিশ্বাস্য সেই সেভ

নেদারল্যান্ডস যখন জয়ের সুবাস পাচ্ছিল, তখনই মরক্কো ফিরিয়ে আনল ২০২২ বিশ্বকাপের সেই চেনা রোমাঞ্চ। যোগ করা সময়ে মরক্কোর ইসা দিয়প দেশের হয়ে নিজের প্রথম গোলটি করে মরক্কোকে ১-১ সমতায় ফেরান! স্টেডিয়ামের গর্জন তখন এতটাই বধির করে দেওয়ার মতো ছিল যে, উল্লাসে গ্যালারি থেকে সমর্থকেরা পানীয় ছুড়ে মারতে শুরু করেন। এরপর অতিরিক্ত সময়ে ডাচদের ২৩ বছর বয়সী ব্রাইটন গোলরক্ষক বার্ট ফেরব্রুগেন করলেন টুর্নামেন্টের সম্ভাব্য সেরা সেভটি! মরক্কোর রহিমি যখন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, গোল একপ্রকার নিশ্চিত ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় অ্যাঙ্গেল ছোট করে হাঁটু ও হাত বাড়িয়ে দিয়ে রহিমির নিকট পোস্টের শটটি ঠেকিয়ে দেন ফেরব্রুগেন। ফলে ম্যাচ গড়ায় সেই ভাগ্যনির্ধারণী টাইব্রেকারে।

ইতিহাসের অন্যতম পাগলাটে ও বিশৃঙ্খল টাইব্রেকার

টাইব্রেকার শুরুর আগে আলোচনা ছিল দুই গোলরক্ষককে নিয়ে। একদিকের নায়ক ফেরব্রুগেন, অন্যদিকের নায়ক মরক্কোর পেনাল্টি স্পেশালিস্ট ইয়াসিন বুনু, যিনি ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেন এবং চলতি বছরের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি করে পেনাল্টি রুখে দিয়েছিলেন।

এরপর শুরু হলো সেই স্নায়ুক্ষয়ী ও পাগলাটে শুটআউট, যেখানে ১০টি শটের মধ্যে ৫টিই মিস হয়!  ১ম শট: তেউন কুপমেইনার্স জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে নেন (১-০)।  ২য় শট: মরক্কোর নিল এল আইনাউই বল মারেন ক্রসবারে!  ৩য় শট: ডাচদের এগিয়ে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আসে বদলি খেলোয়াড় জাস্টিন ক্লুইভার্টের সামনে। তিনি বুনুকে বোকা বানাতে থেমে থেমে দৌড়ালেও শেষ পর্যন্ত বল মারেন বাম পোস্টে! এর মাধ্যমে একটি অদ্ভুত পরিসংখ্যান টিকে রইল: বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে ১১০ মিনিটের পর বদলি নামা শেষ ১১ ফুটবলারের মধ্যে ৯ জনই পেনাল্টি মিস করলেন।  ৪র্থ শট: মরক্কোর সৌফিয়ান রহিমির শট ফেরব্রুগেন দারুণভাবে ঠেকালেও বল তার শরীরের নিচ দিয়ে গড়িয়ে, পায়ে লেগে শেষ পর্যন্ত গোললাইন অতিক্রম করে গোল হয়ে যায় (১-১)।  ৫ম ও ৬ষ্ঠ শট: এরপরের দুটি শট থেকে ডাচদের ভাউট ভেগহর্স্ট এবং মরক্কোর শেমসদিন তালবি গোল করেন। স্কোর দাঁড়ায় ২-২।  ৭ম শট: ডাচ তারকা কুয়েন্টিন টিম্বার বল মারেন পোস্টের বাইরে!  ৮ম শট: মরক্কোর আচরাফ হাকিমিও ঠিক সেই একই পোস্টে বল মারেন, যেখানে একটু আগে ক্লুইভার্ট মেরেছিলেন! ৮টি শট শেষে গোল হলো মাত্র ৪টি!  ৯ম শট: ক্রিসেনসিও সামারভিল মাঝ বরাবর শট নেন। কিন্তু বুনু ডানদিকে সরতে গিয়েও বাম হাত দিয়ে সহজেই বলটি ফিরিয়ে দেন।  ১০ম শট: মরক্কোকে জেতানোর চূড়ান্ত সুযোগ পান ইসমাইল সাইবারি। তিনি কোনো ভুল করেননি, নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে মরক্কোকে ৩-২ ব্যবধানে জয় এনে দেন।

ম্যাচের আগে ডাচ কোচ কোমান বলেছিলেন, এখান থেকে বিদায় নিলেও ভালো স্মৃতি থাকবে। তবে বাস্তবে এমন বিদায় তারা চাননি। ৫টি টাইব্রেকারের মধ্যে ৪টি হেরে ডাচদের টাইব্রেকারের ট্র্যাজিক ইতিহাস আরও দীর্ঘ হলো। আর মরক্কোর স্বপ্নের যাত্রা অব্যাহত রইল। আগামী ৪ জুলাই হিউস্টনে শেষ ষোলোর মহালড়াইয়ে কানাডার মুখোমুখি হবে মরক্কো!