অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন চিত্রশিল্পী ও পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার। সোমবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। স্ত্রী মেরী মনোয়ার, ছেলে সাদাত মনোয়ার ও মেয়ে নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন তিনি। মুস্তাফা মনোয়ারের লাশ হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও চারুকলায় শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ বনানী কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হবে।
বরেণ্য এই শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করার নয়। জাতি তার অবদানকে সর্বদা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’
পৃথক বার্তায় শোক প্রকাশ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকে শেষবারের মতো প্রিয় এই শিল্পীকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। অনেকে ভিড় জমান বাসভবনে।
পরিবার থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতাল থেকে প্রথমে লাশ ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে গোসল শেষে লাশ নেওয়া হয় ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কের বাসভবনে। সেখানে পরিবার ও স্বজনদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে লাশ রাখা হয় স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে।
আজ সকাল ৯টায় দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুস্তাফা মনোয়ারের প্রথম জানাজা হবে। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল সাড়ে ১০টায় লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে চারুকলা ইনস্টিটিউটে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হবে। এরপর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে।
মুস্তাফা মনোয়ার দীর্ঘদিন নিউমোনিয়াসহ নানা বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৪ জুন তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
কর্মজীবন : কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর গানের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় যোগ দেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। জেলে যান ছবি আঁকার অপরাধে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি মুস্তাফা মনোয়ার। সৃষ্টি করেছেন ‘পারুল’-এর মতো জনপ্রিয় চরিত্র। জড়িত ছিলেন ‘মীনা’ সিসিমপুরের সঙ্গে। নির্মাণ করেছেন শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’। তার নির্মিত অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ও ব্যাপক সমাদৃত।
মুস্তাফা মনোয়ারের কর্মজীবন শুরু পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, শিল্পকলা একাডেমিসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য শরণার্থী শিবিরে আয়োজন করেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মেলে ধরেন পাপেটের নতুন রূপ।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা : কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসাবে স্বর্ণপদক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরং শাখার শ্রেষ্ঠ কর্মের জন্য দুটি স্বর্ণপদক, টিভি নাটকের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য টেনাশিনাস পদক, চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার, একুশে পদক এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত ‘সুলতান স্বর্ণপদক-২০১৮’-সহ অসংখ্য সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি।








