অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে—এমন মন্তব্য করে ‘যমুনার অন্দরে আর কিনারে হওয়া ভয়াবহ দুর্নীতির’ তদন্ত করতে দুদককে নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রবিবার রাতে জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই আহ্বান জানান।

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেদিন এই মন্তব্য করলেন, সেই সময়ে বিগত অন্তর্ববর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার চিকিৎসা ভাতা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। জনগণের ট্যাক্সের পয়সা বিদেশে চিকিৎসার নামে লাখ লাখ টাকা খরচ করাকে সরাসরি দুর্নীতি বলে আখ্যা দেয়া না গেলেও এ বিষয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে। তার আগে দেখা যায় খবরে কী বলা হচ্ছে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন চিকিৎসার জন্য একাই নিয়েছেন প্রায় ৮২ লাখ টাকা। তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে তিনি নিয়েছেন ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এছাড়া পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন নিয়েছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ (প্রয়াত) ২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. এম আমিনুল ইসলাম ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে খবরে বলা হচ্ছে।

এর বাইরে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিনও চিকিৎসা বাবদ নানা অংকের টাকা নেন সরকারি কোষাগার থেকে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমও বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেলেও তিনি কত টাকা নিয়েছেন, খবরে তা বলা হয়নি। যদিও সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশের পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার জবাবে ধর্ম উপদেষ্টা খালিদ হোসেন দাবি করেছেন, তিনি খুব সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী এমপিদের বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা নতুন নয়। যেসব রোগ বিরল, গুরুতর এবং যার চিকিৎসা দেশে নেই ও ব্যয়বহুল—সেসব রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়? যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায় যে, কারো শরীরে দূরারোগ্য কোনো অসুখ আছে; যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট নন; যদি দেখা যায় যে তিনি যে অসুখে ভুগছেন তার চিকিৎসা দেশে নেই এবং বিদেশে চিকিৎসা করানোটা ব্যয়বহুল—এমন লোকদেরকে কেন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে হবে?

উপদেষ্টা-মন্ত্রী-এমপি বা এরকম জনঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা হওয়া উচিত এক নম্বর যোগ্যতা। যারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেন এইসব পদে বসানো হবে বা বসতে দেয়া হবে? নাকি বিষয়টা এমন যে, যেহেতু রাষ্ট্রীয় চেয়ারে বসে গেছেন এবং যেহেতু জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় বিদেশে চিকিৎসা করালেও কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না (অতীতে প্রশ্ন ওঠেনি), অতএব সবাই এই সুযোগটা নিয়েছেন।

ধর্ম উপদেষ্টা ৬২ লাখ টাকা খরচ করে ব্যাংককে হৃদরোগের যে চিকিৎসা করিয়েছেন, সেই চিকিৎসা কি বাংলাদেশের বিশেষায়িত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে হয় না? বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশের বেসরকারি কোনো বড় হাসপাতালে হয় না? জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বা বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে বিনা পয়সা বা খুব সামান্য খরচেই হয়ে যেতো।

সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী চিকিৎসার জন্য ৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে কী চিকিৎসা করিয়েছেন? তার অসুখের নাম কী এবং কোথায় চিকিৎসা করিয়েছেন? উপদেষ্টা না হলে তিনি কি এই চিকিৎসাটা করাতেন না? ৭ লাখ টাকা খরচ করে চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা কি তার নেই বা ছিল না? সরকারি কোষাগার থেকেই নিতে হলো কেন? অন্য উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন যে, তারা চিকিৎসার জন্য যে টাকাগুলো সরকারি কোষাগার থেকে নিলেন, এই টাকা ব্যক্তিগতভাবে খরচের সামর্থ্য ছিল না? উপদেষ্টা না হলে তারা এই চিকিৎসাটা করতেন না? নাকি উপদেষ্টা হয়েছেন বলে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না?

অর্থাৎ যে সরকার ‘সংস্কার’ শব্দটি বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললো, সেই সরকারের কর্তা ব্যক্তিরাও জনগণের ট্যাক্সের পয়সা খরচ করে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলেন। প্রশ্ন হলো, তাদের দেড় বছরে স্বাস্থ্য খাতে তারা কী সংস্কার করেছেন? কোনো সংস্কার হয়নি। বরং সময়মতো টিকা না দেয়া এবং টিকা কেনায় সাতশোর বেশি শিশু হামে মৃত্যুবরণ করেছে। হাম মহামারী আকার ধারণ করেছে। যদিও এই অপরাধে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বা তৎকালীন সরকারের অন্য কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। উল্টো বিগত দিনেও যেমন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিরা জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন, সেই একই পথে হেঁটেছেন ‘সংস্কারবাদী’ সরকারের উপদেষ্টারাও। 

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে যে প্রশ্নটি বরাবরই সামনে আসে তা হলো, তারা কেন দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেন না? নাকি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অসুখ হয়, যার জন্য বিদেশে যেতে হয়? নাকি চিকিৎসার নামে জনগণের অর্থে তারা বিদেশ ভ্রমণে যান?

যদি দেশের সরকারি হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা না হয়, তাহলে এই প্রশ্ন তুলতে হবে যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কত সরকার এলো গেলো—তারা কেন এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলো না বা সরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন এমন মানে উন্নীত করতে পারলো না যাতে এখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও অনায়াসে চিকিৎসা নিতে পারেন? যদি তারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন তাহলে সরকারি হাসপাতালগুলোর চেহারা বদলে যেতো। কিন্তু তারা যেহেতু শরীর একটু খারাপ হলেই প্লেনে উড়াল দিয়ে সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড চলে যান বা যেতে পারেন, সে কারণে দেশের, বিশেষ করে মন্ত্রী-এমপিদের নিজের এলাকার সরকারি হাসপাতালগুলোর দৈন্য দশা কাটে না। সেখানে গিয়ে মানুষ সেবা পায় না। সরকারি হাসপাতালের চারপাশে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে ওঠে এবং মানুষকে সেসব জায়গায় গিয়ে মোটা অংকের অর্থ খরচ করে চিকিৎসা নিতে হয়। অনেক সময় পয়সা খরচ করেও প্রতারিত হয়।

বাস্তবতা হলো, ভিআইপিরা এমনও অনেক চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, যেসবের চিকিৎসা অনায়াসেই দেশে সম্ভব। কিন্তু তারপরও তারা বিদেশে যান মূলত কয়েকটি কারণে। ১. মানসিকতা। ২. ফুটানি। ৩. দেশের চিকিৎসার ওপর অনাস্থা। ৪. বিদেশি চিকিৎসার ওপর ভরসা। বিভিন্ন সময়ে দেশের খ্যাতিমান ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নানা ফোরামে এটা বলেছেন যে, কিছু চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি এখনও আসেনি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব।

বিগত দিনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী-এমপিদের চিকিৎসার নামে জনগণের অর্থ খরচের বিষয়টা নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয়নি বা যে কারণেই হোক এই বিষয়টি নিয়ে সেভাবে সংবাদও হয়নি। কিন্তু এখন বিগত দিনের সকল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রী ও এমপিদের মধ্যে কারা কত টাকা সরকারি কোষাগার থেকে নিয়েছেন এবং আসলেই তারা কোথায় কী চিকিৎসা করিয়েছেন; চিকিৎসার পরে তাদের অসুখ ভালো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে অনুসন্ধানমূলক সংবাদ প্রকাশ করা যেতে পারে।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।          

 এইচআর/জেআইএম