বিকাশগত সমন্বয়হীনতা, যা ডিসপ্রাক্সিয়া নামেও পরিচিত, একটি সাধারণ স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা। এটি শিশুর দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, সংগঠন এবং সমন্বিত নড়াচড়া সম্পাদনের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এর ফলে একটি শিশু তার বয়সের তুলনায় দৈনন্দিন কাজকর্মে কম পারদর্শী হয় এবং আনাড়ির মতো নড়াচড়া করে বলে মনে হয়। শিশুদের ডিসিডি শৈশবে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা, যা মোটর (চলাচল) দক্ষতা ও সমন্বয়ে সমস্যা সৃষ্টি করে।

ডিসপ্রাক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের যেসব কাজে পুরো শরীরের ব্যবহার প্রয়োজন (যেমন ধরা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো) অথবা শুধু হাতের ব্যবহার (যেমন লেখা, জুতার ফিতা বাঁধা) কিংবা উভয়েরই ব্যবহার প্রয়োজন, সেসব কাজে অসুবিধা হতে পারে। যেকোনো দক্ষতা শেখা, তা মনে রাখা এবং অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে তাদের অনেক বেশি প্রচেষ্টা লাগে।

হালকা ডিসপ্রাক্সিয়া সাধারণত প্রাক্‌বিদ্যালয়গামী বা ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে তারা স্থির থাকতে পারে না, ক্রমাগত বিভিন্ন বস্তুতে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে থাকে। তারা সহজেই বিচলিত হতে পারে এবং মেজাজ হারানোর প্রবণতা থাকতে পারে। জিগস বা বিল্ডিং ব্লকের মতো গঠনমূলক খেলনা এড়িয়ে চলে। তাদের সূক্ষ্ম অঙ্গসঞ্চালনের দক্ষতা দুর্বল থাকে এবং পেন্সিল ধরতে বা কাঁচি ব্যবহার করতে অসুবিধা হয়।

ডিসিডিতে আক্রান্ত ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে হামাগুড়ি দেওয়া, হাঁটা, নিজে নিজে খাওয়া এবং পোশাক পরার মতো প্রাথমিক বিকাশের ধাপগুলো বিলম্বিত হতে পারে। তাদের আঁকাআঁকি, লেখা এবং খেলাধুলার পারদর্শিতাও সাধারণত বয়সের তুলনায় পিছিয়ে থাকে।

এ অবস্থার লক্ষণগুলো অল্প বয়স থেকেই দেখা যায়। তবে শিশুদের বিকাশের হারে ব্যাপক ভিন্নতা থাকায় ডিসিডিতে আক্রান্ত কোনো শিশুর বয়স ৫ বছর বা তার বেশি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত এটি নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা হয় না।

শিশুর বিকাশে এ ধরনের কোনো সমস্যা মনে হলে অবশ্যই একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে, যাতে কোনো বিকাশগত সমস্যা আছে কি না তা শনাক্ত করা যায়।

সমন্বিত নড়াচড়া একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে বিভিন্ন স্নায়ু ও মস্তিষ্কের অংশ জড়িত থাকে। এই প্রক্রিয়ার যেকোনো সমস্যা নড়াচড়া ও সমন্বয়ে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। ডিসিডিতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে কেন অন্যান্য দক্ষতার মতো সমন্বয়ের বিকাশ ভালোভাবে হয় না, তা সাধারণত স্পষ্ট নয়। তবে এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা শিশুর ডিসিডি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • গর্ভাবস্থার ৩৭তম সপ্তাহের আগে অর্থাৎ অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া;
    • জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে জন্মানো;
    • পরিবারে ডিসিডির ইতিহাস থাকা, যদিও এ অবস্থার জন্য ঠিক কোন জিনগুলো দায়ী তা এখনও স্পষ্ট নয়;
    • গর্ভাবস্থায় মায়ের মদ্যপান বা অবৈধ মাদক গ্রহণ।

ডিসিডির কোনো নিরাময় নেই। তবে বেশ কিছু থেরাপি শিশুদের তাদের সমস্যাগুলো সামলাতে সাহায্য করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কঠিন মনে হওয়া কাজগুলো সহজে করার উপায় শেখানো, যেমন জটিল নড়াচড়াকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়মিত অনুশীলন করা। এছাড়া কাজগুলো সহজ করার জন্য সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, যেমন কলম বা পেন্সিলে বিশেষ গ্রিপ ব্যবহার করা, যাতে সেগুলো সহজে ধরা যায়।

যদিও ডিসিডি শিশুর বুদ্ধিমত্তাকে প্রভাবিত করে না, তবে এটি তাদের শেখার প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে এবং স্কুলে পড়াশোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

ডিসিডির চিকিৎসা শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষভাবে পরিকল্পনা করা হয়। এতে সাধারণত বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী একসঙ্গে কাজ করেন, যাকে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমওয়ার্ক বলা হয়।

যদিও ডিসিডিতে আক্রান্ত শিশুর শারীরিক সমন্বয় স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় কম থাকে, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মানিয়ে চলার কৌশল আয়ত্ত করার ফলে এ সমস্যাটি ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিশুর সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। স্কুলে তাদের অসুবিধাগুলো, বিশেষ করে লিখিত কাজের ক্ষেত্রে, আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য বাবা-মা ও শিক্ষকদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হয়।

যদিও ডিসিডিতে আক্রান্ত শিশুর শারীরিক সমন্বয় স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় কম থাকে, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মানিয়ে চলার কৌশল আয়ত্ত করার ফলে এ সমস্যাটি ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিশুর সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। স্কুলে তাদের অসুবিধাগুলো, বিশেষ করে লিখিত কাজের ক্ষেত্রে, আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য বাবা-মা ও শিক্ষকদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন হয়।

ডিসপ্রাক্সিয়া নাকি ডিসিডি? যদিও যুক্তরাজ্যে অনেকে ছোট শিশুদের মধ্যে প্রথম দেখা দেওয়া নড়াচড়া ও সমন্বয়ের অসুবিধা বোঝাতে ‘ডিসপ্রাক্সিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেন, স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীরা এ শব্দটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহার করেন। এর পরিবর্তে অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী এ অবস্থাকে বর্ণনা করতে ‘ডেভেলপমেন্টাল কোঅর্ডিনেশন ডিজঅর্ডার’ বা ডিসিডি শব্দটি ব্যবহার করেন।

তবে উদাহরণস্বরূপ, মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে—যেমন স্ট্রোক বা মাথায় আঘাতের ফলে—জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে যে চলাফেরার অসুবিধা দেখা দেয়, তা বর্ণনা করতে ডিসপ্রাক্সিয়া শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেকে ডিসিডি বোঝাতে স্পেসিফিক ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার অব মোটর ফাংশন (এসডিডিএমএফ) শব্দটিও ব্যবহার করে থাকেন।

অল্পসংখ্যক শিশু, যাদের সাধারণত মৃদু উপসর্গ থাকে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা হয়, তারা তাদের অসুবিধাগুলো কাটিয়ে উঠতে শিখতে পারে। তবে অধিকাংশ শিশুরই দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রয়োজন হয় এবং তারা কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও এর প্রভাব বহন করে।

দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক থেরাপি ও উপযুক্ত সহায়তার মাধ্যমে ডিসপ্রাক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুরা উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারে।

লেখক : কনসালট্যান্ট, নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্ট, বেটার লাইফ হসপিটাল। প্রাক্তন অটিজম বিশেষজ্ঞ, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল।

এইচআর/জেআইএম