ভেতরে–ভেতরে আমি বেশ উত্তেজনা অনুভব করলাম।

কয়েক মিনিট!

আর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই দেখা হবে তাঁর সাথে!

টের পেলাম, হাত ঘামছে আমার।

গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

ঘরের চারপাশে তাকালাম। বসার ঘর। কোনো জাঁকজমক নেই। নেই কোনো দামি আসবাব।

শুধু ঘরে আছে এক সেট সোফা। পুরোনো আমলের। সেই সোফায় আমি বসেছি। আমার সামনে বেতের তৈরি টি–টেবিল।

তবে এসব সাধারণ আসবাবই আমাকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তুলল।

এত বড় লেখক!

এত নামকরা কথাসাহিত্যিক!

সারা দেশে যাঁর হাজার হাজার ভক্ত, তাঁর বসার ঘর এত সাধারণ!

কথাসাহিত্যিক আশিক হোসেনকে কে না চেনে! তাঁর বসার ঘরে আমি এখন বসে আছি।

মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি!

কে যেন পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকল।

তাকিয়ে দেখি একজন ভদ্রমহিলা ঘরে প্রবেশ করেছেন।

আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, ইনি লেখকের মিসেস না হয়েই যায় না।

তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম।

ভদ্রমহিলা সালামের জবাব না দিয়েই জানতে চাইলেন,

‘আপনি? আপনার পরিচয়?’

‘আমি ইসমাইল হোসেন, ম্যাডাম। টাইম প্রকাশনী থেকে এসেছি। স্যারের কাছে এসেছি।’

‘ও তো ব্যস্ত আছে। আপনি নাহয় পরে আসুন।’

‘স্যার আমাকে ফোনে আসতে বলেছেন।’

‘আচ্ছা বসুন। চা খাবেন?’

‘লাগবে না, ম্যাডাম।’

ভদ্রমহিলা নিজেও বসলেন।

‘আপনাকে কেন ডেকেছে ও? মানে ওর কাছে কী দরকার আপনার?’ জানতে চাইলেন ম্যাডাম।

একটু অবাক হলাম। আশিক স্যার যে আমাদের প্রকাশনীতে কয়েক বছর ধরে পাণ্ডুলিপি দিচ্ছেন, আপা কি তা জানেন না?

‘স্যার আমাদের প্রকাশনীর জন্য একটা পাণ্ডুলিপি রেডি করে রেখেছেন, সেটাই নিতে এসেছি।’

দেয়ালের ইট দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় প্লাস্টার খসে খসে পড়ছে। সিঁড়িটা নোংরা। প্রথম ধাপে পা রেখে ভাবলাম, এবার দেখা পাব তো। এক ঘণ্টা ধরে ঘুরছি এই এলাকায়। বাসা খুঁজে পাচ্ছি না। বসের কড়া নির্দেশ, আমি যেন বাসা খুঁজে চেকটা ঠিকভাবে তুলে দিই। এর আগে অফিস থেকে চেক গ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কোনো জবাব আসেনি।

‘ও। তা কোন পাণ্ডুলিপি দিতে চেয়েছে ও?’

এবার আরও বেশি অবাক হলাম। স্যার বরাবর আমাদের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি দিয়ে থাকেন।

‘আপনি কিছু জানেন না!’

‘নাহ! সারা দিন বসে বসে কী লেখে, কাকে কোন লেখা দেয়, কিছু জানিও না। খোঁজও রাখি না।’

তাঁর গলায় স্পষ্ট অভিমান টের পেলাম।

‘স্যারের লেখা বইগুলো সারা দেশের পাঠকেরা আগ্রহসহকারে পড়ে। আপনার নিশ্চয়ই ভালো লাগে ব্যাপারটা?’

‘ভালো তো লাগেই না; বরং বই দেখলেই আমার গায়ে জ্বালা ধরে। ওগুলো তো বই না, যেন একেকটা ইট।’ ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন ম্যাডাম।

জবাবে আমি কিছু বলতে যাব, তার আগেই ঘরে ঢুকলেন কথাসাহিত্যিক আশিক হোসেন। হাতে একটা পাণ্ডুলিপি।

ম্যাডাম উঠে ভেতরে চলে গেলেন।

আমার আর জানা হলো না বই কীভাবে ইট হয়!

দুই.

দেয়ালের ইট দেখা যাচ্ছে।

অনেক জায়গায় প্লাস্টার খসে খসে পড়ছে।

সিঁড়িটা নোংরা। প্রথম ধাপে পা রেখে ভাবলাম, এবার দেখা পাব তো। এক ঘণ্টা ধরে ঘুরছি এই এলাকায়। বাসা খুঁজে পাচ্ছি না। বসের কড়া নির্দেশ, আমি যেন বাসা খুঁজে চেকটা ঠিকভাবে তুলে দিই। এর আগে অফিস থেকে চেক গ্রহণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কোনো জবাব আসেনি।

পেমেন্টের বিষয়ে আমার বস নিয়ম মেনে চলেন। লেখক বেঁচে নেই তো কী হয়েছে, তাঁর ফ্যামিলিকে চেক পৌঁছে দাও।

বসের কথা মানতেই হবে।

অনেক বছর আগে কথাসাহিত্যিক আশিক হোসেনের বাসায় গিয়েছিলাম পাণ্ডুলিপি আনতে।

সেটা ছিল ভাড়া বাসা।

ভেতরে ঢুকলাম। ঘরে কম পাওয়ারের একটা বাতি জ্বলছে। সেই বাতির অল্প আলোয় ঘরে দারিদ্র্যের চিত্র স্পষ্ট দেখতে পেলাম। বসার জন্য কোনো সোফা নেই ঘরে। শুধু আছে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ার। ছোট একটা টেবিলও আছে ঘরে। ‘বসুন।’ ‘এটা কি স্যারের আদি বাসা?’

বছর দুয়েক আগে লেখক ক্যানসারে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর সময় অনেক টাকা খরচ হয়েছে বলে শুনেছি। আশিক স্যার মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবার এখন রংপুরে থাকে। ম্যাডামের বাপের বাড়িতে।

আমি টাইম প্রকাশনীতেই থেকে গেছি। এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে আমার প্রমোশন হয়েছে। রংপুরে এসেছিলাম বকেয়া পাওনা তুলতে।

প্রকাশক স্যার আসার আগে আমাকে একটা খাম দিয়ে বলেছেন, ‘এই চেকটা আশিক হোসেনের পরিবারকে পৌঁছে দিয়ো। আর বোলো, প্রতিবছরই আমি চেক পাঠানোর চেষ্টা করব। লেখকের কাছে টাইম প্রকাশনী পরিবার কৃতজ্ঞ।’

দুচোখে জল চলে এসেছিল আমার। বসের এই মানবিকতার কারণেই আমার মতো অনেক কর্মচারী এখনো চাকরি করছে তাঁর অধীনে।

জীর্ণ বাড়িটার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করলাম।

এই বাড়িই কি লেখকের?

অনেকক্ষণ ধরে খুঁজে খুঁজে শেষ পর্যন্ত পেলাম কি না, এমন ভগ্নদশার বাড়ি!

দরজার কড়া নাড়লাম।

কেউ সাড়া দিল না।

ফিরে যাব কি না ভাবছি।

এমন সময় দরজা খোলার শব্দ হলো।

‘কাকে চাই?’ নারীকণ্ঠ। আধো আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম না।

‘এটা কি কথাসাহিত্যিক আশিক স্যারের বাসা?’

‘উনি তো মারা গেছেন। আপনি জানেন না?’

‘জানি। আমি এসেছি উনার মিসেসের কাছে।’

‘বলুন। আমিই উনার মিসেস।’ নিস্পৃহ গলায় বললেন মহিলা।

চমকে উঠলাম। একদমই চিনতে পারিনি।

অনেক বছর আগে তাঁকে দেখেছিলাম।

তেজী, রাগী আর অহংকারী মনে হয়েছিল তাঁকে সেদিন।

‘ম্যাডাম, আদাব। আমি এসেছি টাইম প্রকাশনী থেকে। আমার বস আপনার জন্য একটি চেক পাঠিয়েছেন।’

‘আসুন।’

ভেতরে ঢুকলাম। ঘরে কম পাওয়ারের একটা বাতি জ্বলছে। সেই বাতির অল্প আলোয় ঘরে দারিদ্র্যের চিত্র স্পষ্ট দেখতে পেলাম।

বসার জন্য কোনো সোফা নেই ঘরে। শুধু আছে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ার। ছোট একটা টেবিলও আছে ঘরে।

‘বসুন।’

‘এটা কি স্যারের আদি বাসা?’

‘না। আপনার স্যারের চিকিৎসার খরচের জন্য সব বিক্রি করতে হয়েছে। এটা আমার বাবার বাসা। এখানে কেউ থাকত না। আমার সব ভাইবোন অন্য শহরে থাকে। আমিই শুধু এই বাসায় থাকি।’

‘স্যারের ভক্ত পাঠকেরা কেউ দেখা করতে আসে না?’

‘অনেক বছর আগে আমি একদিন আপনার বাসায় গিয়েছিলাম। স্যারের লেখা পাণ্ডুলিপি নেওয়ার জন্য। সেদিন আপনি বলেছিলেন, স্যারের বইগুলোকে দেখলে আপনার গা জ্বালা করে। বইগুলোকে একেকটা ইট মনে হয় আপনার। আজ এত দিন পরে সেই ইটগুলোর জন্য সম্মানীর চেক পেয়ে কেমন লাগছে আপনার?’ অনেক দিনের জমানো ক্ষোভ সুযোগ বুঝে ঝেড়ে দিলাম।

‘না।’ ধীরে ধীরে বললেন ম্যাডাম।

কী বলব ভেবে পেলাম না। চুপ করে রইলাম।

‘আসলে লেখক তার লেখার মাধ্যমে বেঁচে থাকে। মারা যাওয়ার পর তাই পাঠকেরা লেখকের লেখা বইগুলোরই কদর করে। তাদের পরিবার বাঁচল কি মরল, সে বিষয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। থাকেও না।’

তাঁর কথা শুনে নড়েচড়ে বসলাম আমি।

‘ম্যাডাম, আমাদের বস আপনার জন্য একটা চেক পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিন।’

চেকসহ খাম বের করে দিলাম।

খাম নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন তিনি।

‘ভাবতেই পারিনি তার লেখা বইগুলোর জন্য এত দিন পরে কেউ টাকা দেবে।’ ভদ্রমহিলা আর্দ্র গলায় বললেন।

উঠে দাঁড়ালাম।

‘আসি, ম্যাডাম।’

দরজার সামনে পৌঁছে ঘুরে দাঁড়ালাম।

‘ম্যাডাম, একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে।’

‘বলুন।’

‘অনেক বছর আগে আমি একদিন আপনার বাসায় গিয়েছিলাম। স্যারের লেখা পাণ্ডুলিপি নেওয়ার জন্য। সেদিন আপনি বলেছিলেন, স্যারের বইগুলোকে দেখলে আপনার গা জ্বালা করে। বইগুলোকে একেকটা ইট মনে হয় আপনার। আজ এত দিন পরে সেই ইটগুলোর জন্য সম্মানীর চেক পেয়ে কেমন লাগছে আপনার?’

অনেক দিনের জমানো ক্ষোভ সুযোগ বুঝে ঝেড়ে দিলাম।

ভদ্রমহিলা রাগলেন না।

‘সেটা তো ছিল আমার রাগের কথা। অভিমানের কথা।’

‘মানে?’

‘তোমার স্যার লেখক হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পর আমাকেই ভুলে গেল। দিনরাত শুধু লিখত। আর পত্রপত্রিকায়, টিভিতে সাক্ষাৎকার দিত—এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকত।’

‘সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?’

‘না। স্বাভাবিক নয়। লেখালেখি শুরুর সময়ে সে আমাকে বলেছিল, আমিই নাকি তার লেখালেখির অনুপ্রেরণা। অথচ খ্যাতি পেয়ে আমাকেই সে ভুলে গেল! এ কেমন কথা!’

মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন ম্যাডাম।

আমাকে স্তব্ধ করে দিয়ে।