লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর উদ্বোধনী সংখ্যায়। তখনো প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই লেখাটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। আজ প্রথমবারের মতো ‘অন্য আলো’র অনলাইন পাঠকের জন্য লেখাটি উপস্থাপন করা হলো।
সে একদিন গেছে বটে। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। টক-ঝাল-মিষ্টি। আরও কত স্বাদের! আমি আর মসিহউদ্দিন শাকের মিলে সূর্য দীঘল বাড়ীর স্ক্রিপ্ট জমা দিলাম ১৯৭৬ সালে। সরকারি অনুদান পেলাম ১৯৭৭ সালে মাত্র আড়াই লাখ টাকা। নগদ তুললাম ৫০ হাজার। শাকের ইঞ্জিনিয়ারগিরি ছেড়ে দিয়ে তার শ্বশুরের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪০ হাজার টাকা আনল। আমি মোল্লা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে অ্যাকাউন্ট্যান্টের ফুলটাইম চাকরি ছেড়ে পার্টটাইম হলাম; উপরন্তু অফিস থেকে ১৮ হাজার টাকা অগ্রিম তুলে এনে দুজন মিলে আদাজল খেয়ে লেগে পড়লাম।
নায়িকার খোঁজে গরুখোঁজা
প্রথমেই মাঠে নামলাম ছবির প্রধান চরিত্র জয়গুনের জন্য অভিনেত্রী খুঁজতে। গেলাম রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফ্লোরা আহমেদের কাছে। তিনি তখন রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের গান গাইছিলেন। প্রস্তাব শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলেন। ঘুরতে ঘুরতে একদিন সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে দেখি এক মহিলা তাঁর ছেলেকে স্কুল থেকে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ‘জয়গুন পেয়েছি’, বলে দৌড়ে গেলাম তাঁর কাছে। কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, বিষয়টা এই। শুনে মহিলা তো থ। ‘আমি রাঁধি, বাড়ি, বাচ্চাকে স্কুলে আনি-নিই। আমি করব অভিনয়?’ আমরাও নাছোড়বান্দা। জোর করে বাসার ঠিকানা নিলাম। একদিন দল বেঁধে গেলাম। ভদ্রমহিলার স্বামী একজন সরকারি চাকুরে। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন এটা হবে না। আমরা ব্যর্থ মনে ফিরে এলাম। এরপর গেলাম জিনাত বরকতউল্লাহর কাছে। তিনি বললেন, ‘আমি নেচেই কূল পাই না, অভিনয় করব কখন!’ ছুটলাম লেখিকা মমতাজ হোসেনের (প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবীরের বোন) কাছে। তিনি তখন উদয়ন স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল। প্রস্তাব শুনে হেসেই অস্থির। উল্টো প্রস্তাব করলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিমের মেয়ে ডলি ইব্রাহিমের নাম। মেয়েটা তখন টেলিভিশনে নাটক করে। আমরা আমল দিলাম না। ঠিক করলাম, আর না। প্রফেশনাল হতে হবে। ঢুকলাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। টার্গেট করলাম নার্গিস (আনোয়ারার বোন) ও শর্মিলী আহমেদকে। শর্মিলীর বাড়ি গিয়ে এক হাজার টাকায় কন্ট্রাক্ট সই করিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
তাতেই কি বাঁচার জো আছে! দু–তিন দিন শুটিং করলাম ভালোই। শর্মিলীর স্বামী প্রতিদিন সঙ্গে যায় পাহারাদার হিসেবে। একদিনের একটি শট—জয়গুন তথা শর্মিলী দাওয়ায় বসে ভাত রাঁধছে ব্যাক টু দ্য ক্যামেরা হয়ে। হঠাৎ দখিনা বাতাসের ঝাপটায় তার পিঠ থেকে শাড়ি উড়ে যায়। বুকের আঁচল টানতে গিয়ে শর্মিলী কেমন যেন সচকিত হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফেলে। তাড়াতাড়ি কাট করে দৌড়ে গিয়ে বললাম, এ কী করলেন ম্যাডাম! চমৎকার একটা শট ইজ নেট গুড হয়ে গেল! এ ঘটনার পরদিন থেকে শর্মিলী আর আসে না। আমাদের তো মাথায় বাড়ি। এতগুলো টাকার সঙ্গে প্রথম উদ্যোগটাও মাঠে মারা গেল!

নানান সমস্যার কারণে শুটিং শুধু পেছায়। টমির শিডিউল আর আসে না। একদিন শুনি, টমিকে ধরে নিয়ে গেছে মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা, গলায় বেল্ট ছিল না বলে। ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আমিও ভীষণ মুষড়ে পড়ি, ‘টমি নেই। কে আর অমন সুন্দর করে প্রস্রাব করার পোজ দেবে!’ শেষমেশ ওই শট দুটি আর নেওয়াই হয় না।
আবার মাঠে নামলাম নায়িকার খোঁজে। ছবির সম্পাদক সাইদুল আনাম টুটুলও প্রস্তাব করল ডলির নাম। মনে পড়ল মমতাজ হোসেনের প্রস্তাবের কথা। গেলাম ডলির কাছে। মেয়েটা এককথায় রাজি হয়ে গেল। সেই থেকে ডলিই হয়ে গেল জয়গুন।
কুকুর–শোকে পাথর
চিত্রনাট্য লেখার সময়ই একটা সিম্বলিক শট মাথায় এসেছিল আমার। দুশ্চরিত্র মাতবর গদু প্রধান জয়গুনকে পাওয়ার জন্য লালায়িত। একদিন রাস্তায় ধরেছে তাকে। জয়গুন রেগে বলছে, ‘আল্লা কি শরমের পানি দিয়া তোর মুখ ধোয়নি?’ শুনে ক্লোজ শটে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে গদু প্রধান। এর পরই আসবে সেই সিম্বলিক শট। একটা কুকুর ঠ্যাং তুলে প্রস্রাব করছে। দুই অ্যাঙ্গেলে—একবার বাঁ পা তুলে। একবার ডান পা তুলে। তো, এই শট দুটি ঠিকঠাক মতো নেওয়ার জন্য বাসায় একটা কুকুর পোষা শুরু করি। নাম টমি। আমার ছেলে-মেয়েরা তো মহাখুশি। টমির প্রশিক্ষণ নিয়ে মহাব্যস্ত। টমিও সারা দিন ওদের সঙ্গে খেলে। ঘোরে–ফেরে আর মাঝে মাঝে ঠ্যাং তুলে প্রস্রাব করে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি আর একটা দামি শটের কথা ভেবে পুলকিত হই। এভাবে দিন যায়। নানান সমস্যার কারণে শুটিং শুধু পেছায়। টমির শিডিউল আর আসে না। একদিন শুনি, টমিকে ধরে নিয়ে গেছে মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা, গলায় বেল্ট ছিল না বলে। ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আমিও ভীষণ মুষড়ে পড়ি, ‘টমি নেই। কে আর অমন সুন্দর করে প্রস্রাব করার পোজ দেবে!’ শেষমেশ ওই শট দুটি আর নেওয়াই হয় না।
ওদিকে আমাদের অবস্থা কাহিল। ছবির পাত্র-পাত্রীদের চেহারায় মিল থাকছে না। একেক দৃশ্যে একেক রকম হচ্ছে। শেষমেশ সব ছেড়ে দিলাম নিয়তির হাতে। যা হয় হোক। দেখলাম, দর্শকেরা সবই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে নিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, জয়গুনের তিন সন্তানের বেড়ে ওঠা নিয়ে মাথাব্যথার শেষ নেই। অথচ আমার নিজের তিন ছেলে-মেয়ের খোঁজ রাখার সময় পাই না। সহকর্মীদের কেউ হঠাৎ যদি জিজ্ঞাসা করে, ‘নিয়ামত ভাই, ছেলেটা কত বড় হয়েছে?’ আমি দুই হাত আড়াআড়িভাবে প্রসারিত করে দেখাই—এই এত বড়ো!
তালগাছ নিয়ে বেতাল অবস্থা
আবু ইসহাকের উপন্যাসে জয়গুনের ভিটায় একটা মস্ত বড় তালগাছ ছিল। আমাদের চেষ্টা ছিল যতদূর সম্ভব দৃশ্যপট কাহিনির মূলানুগ রাখা। ধামরাইয়ের বাদিগাইল গ্রামে একটা ভিটা বছরে দুই হাজার টাকায় লিজ নিলাম। জয়গুনের ভিটার সঙ্গে সবকিছুই মিলে গিয়েছিল। শুধু তালগাছ আর জগ্গি ডুমুরের গাছটা ছিল না। বাদিগাইল থেকে ১৪ মাইল দূরে রাজাসন গ্রাম থেকে ৬০০ টাকায় একটা আস্ত তালগাছ গোড়াসুদ্ধ কিনে ৩০০ টাকায় একটি নৌকা ভাড়া করে রওনা হলাম। পথে তালগাছের ভারে নৌকা গেল ভেঙে। মাঝির সে কী কান্নাকাটি! তাকে তিন হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেই তালগাছ দড়ি দিয়ে বেঁধে ৫০–৬০ জন মিলে বহু কষ্টে টেনেহিঁচড়ে লোকেশনে এনে তুললাম, তারপর বিশাল গর্ত খুঁড়ে জয়গুনের ভিটায় পুঁতে দিলাম; তাতেই কি হিল্লে হয়। দুই দিন বাদেই তালগাছের পাতা গেল মরে। মহামুশকিল! কন্টিনিউয়িটি কি থাকে না। আবার বেরোলাম গ্রামে। তালগাছ খুঁজে বের করে ডালসুদ্ধ পাতা কিনে আনলাম। বিশাল মই বানিয়ে মরা তালগাছে চড়ে গজাল দিয়ে তাজা ডাল–পাতা লাগিয়ে তারপর শুটিং করলাম; কিন্তু একদিন পরপর পাতা যায় মরে আর আমরা তাজা পাতা এনে লাগাই। এ তো গেল তালগাছ। পাতাবিহীন ন্যাড়া জগ্গি ডুমুরগাছও একটি ৫০ টাকায় কিনে এনে ভিটেয় পোঁতা হয়; আর প্রতিদিন একটি করে আস্ত লাউগাছ এনে জয়গুনের ঘরের চালে ছুড়ে দিয়ে শুটিং করা হয়।
বয়স ঠেকাই কী দিয়ে?
জয়গুনের তিন সন্তান—হাসু, মাইমুন আর কাশুর চরিত্রে অভিনয় করে যথাক্রমে লেনিন, ইলোরা আর সজীব। শুটিং শুরু হওয়ার সময় লেনিন পড়ে ক্লাস এইটে। ইলোরা ফাইভে। সজীবের বয়স তিন কি সাড়ে তিন বছর। সরকারি অনুদানে ঢিলেমি, টাকা-পয়সার সংকট—নানান কারণে আমাদের ছবিটি শেষ করতে সময় লাগে তিন বছর; কিন্তু টাকার অভাবে শুটিং ঠেকে থাকলেও বাড়ন্ত বয়সের ছেলেমেয়েদের বয়সের বাড় ঠেকে থাকে না। দীর্ঘ তিন বছরে তরতর করে বেড়ে ওঠে ওরা। লেনিনের বুকের ছাতি বেড়ে যায়; নাকের নিচে গোঁফের রেখা গজায়। গায়েগতরে অনেকখানি বেড়ে ওঠে ইলোরা। সজীবের অবস্থাও তাই। ওদিকে আমাদের অবস্থা কাহিল। ছবির পাত্র-পাত্রীদের চেহারায় মিল থাকছে না। একেক দৃশ্যে একেক রকম হচ্ছে। শেষমেশ সব ছেড়ে দিলাম নিয়তির হাতে। যা হয় হোক। দেখলাম, দর্শকেরা সবই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে নিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, জয়গুনের তিন সন্তানের বেড়ে ওঠা নিয়ে মাথাব্যথার শেষ নেই। অথচ আমার নিজের তিন ছেলে-মেয়ের খোঁজ রাখার সময় পাই না। সহকর্মীদের কেউ হঠাৎ যদি জিজ্ঞাসা করে, ‘নিয়ামত ভাই, ছেলেটা কত বড় হয়েছে?’ আমি দুই হাত আড়াআড়িভাবে প্রসারিত করে দেখাই—এই এত বড়ো!
বাজিটা হলো—চিটাগাং মেইল আসছে। ডলি যে করে হোক সেটা থামিয়ে দেবে। না পারলে টাকা দেবে, না কী একটা জানি হবে। আমরা তো অবাক। মেয়েটা সত্যি সত্যি রেললাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্রেন আসছে। মেয়েটা সরে না। ট্রেন থামারও লক্ষণ নেই। প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসছে। রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে ডলি। যেন সিনেমার দৃশ্য। ট্রেন থামে না। ডলিও নড়ে না। চাপা দেয় দেয়—এমন সময় কাজল আরেফিন ছুটে গিয়ে ছোঁ মেরে সরিয়ে আনে ডলিকে।
প্রশ্নকর্তা অবাক হয়ে বলেন, ‘এভাবে দেখাচ্ছেন কেন? এ কি মাছ, না কাঁঠাল?’ তখন আমার টনক নড়ে। বলি, কী করব ভাই, ছেলে-মেয়েদের তো সব সময় শোয়া অবস্থায় দেখতে হয়। ভোরবেলায় যখন বেরিয়ে আসি, ওরা ঘুমিয়ে থাকে। আবার রাতে যখন ফিরি, তখনো ওদের ঘুমন্ত পাই। তাই কে কত বড় হলো, আমার চোখে ওভাবেই ধরা পড়ে।
বড় জেদি ছিল মেয়েটা
নতুন এসেই ডলি তার অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা দিয়ে মুগ্ধ করে আমাকে। বেশ একটা মায়া পড়ে যায় মেয়েটার ওপর। একদিন কী একটা দৃশ্যের শুটিং হবে। আয়োজনে দেরি হচ্ছে। সেই ফাঁকে ডলি, সম্পাদক সাইদুল আনাম টুটুল আর সহকারী পরিচালক কাজল আরেফিনের মধ্যে বাজি ধরা হয়েছে। বাজিটা হলো—চিটাগাং মেইল আসছে। ডলি যে করে হোক সেটা থামিয়ে দেবে। না পারলে টাকা দেবে, না কী একটা জানি হবে। আমরা তো অবাক। মেয়েটা সত্যি সত্যি রেললাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্রেন আসছে। মেয়েটা সরে না। ট্রেন থামারও লক্ষণ নেই। প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসছে। রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে ডলি। যেন সিনেমার দৃশ্য। ট্রেন থামে না। ডলিও নড়ে না। চাপা দেয় দেয়—এমন সময় কাজল আরেফিন ছুটে গিয়ে ছোঁ মেরে সরিয়ে আনে ডলিকে।
ট্রেনের লোকজন এটাকে শুটিং ভাবল, না অন্য কী ভাবল, জানি না। তবে আমার মনে কিসের একটা অজানা আশংকা ঝাপটা দিয়ে গেল। এ ঘটনার কয়েক বছর পর মেয়েটা আত্মহত্যা করে। মানুষের মন বড় বিচিত্র। বড় বিচিত্র এ জীবন। এরই সন্ধান করে চলেছি আমি আমার প্রতিটি ছবির ফ্রেমে ফ্রেমে।







