বক্সের ঠিক বাইরে থেকে বাঁ পায়ের শটে গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে গোল, লাইনটা পড়লেই সবার আগে মাথায় আসবে লিওনেল মেসির নাম। আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কতশত গোল করেছেন এই পজিশন থেকে। এমনকি বক্সের বাইরে ফ্রি কিক নাকি তার কাছে পেনাল্টির চেয়েও সহজ, এমন কথাও শোনা যায় সমর্থকদের মধ্যে। ঠিক সেই জায়গা থেকেই রোববার জর্ডানের বিপক্ষে গোল করলেন জিওভানি লো সেলসো। যে গোল দেখে ডাগআউটে বসে থাকা মেসিকেও মুগ্ধ হতে দেখা গেলো। এই লে সেলসোর জীবনটাও ট্রাজেডি আর রোমাঞ্চে ভরা। এই গোলের পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, কান্না আর ফিরে আসার এক অসাধারণ গল্প।
সেলসোর কাছে বিশ্বকাপ যেন অনেকদিনের অপূর্ণ এক স্বপ্নের নাম। ২০১৮ বিশ্বকাপ দলে থাকলেও আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়ায় অভিষেকের সুযোগই পাননি। চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন লিওনেল স্কালোনির অন্যতম ভরসা, মাঝমাঠের সেই সৃজনশীল অস্ত্র। কিন্তু ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি। বিশ্বকাপের ঠিক আগে পেশিতে চোট পেয়ে ছিটকে যান দল থেকে। টেলিভিশনের পর্দায় বসেই দেখেছেন সতীর্থদের বিশ্বজয়ের আনন্দ, আর নিজের বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছেন না-পাওয়ার কষ্ট। বিশ্বকাপের মেডেলটাও পাওয়া হয়নি তার।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো ২০২৬ বিশ্বকাপে। আগেই টানা দুই ম্যাচ জিতে নকআউট নিশ্চিত করেছিল আর্জেন্টিনা। ফলে শেষ ম্যাচ তাদের জন্য হয়ে দাঁড়ায় কার্যত নিয়মরক্ষার। সেই ম্যাচের একাদশে ৯ পরিবর্তন আনেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। আর তাতে দরজা খুলে যায় সেলসোর জন্য, ৩০ বছর বয়সে আসে তার বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ অভিষেক। শুরুটাও যেন ছিল নাটকীয়। ম্যাচের মাত্র পাঁচ মিনিটেই বল জালে পাঠিয়েছিলেন লো সেলসো। কিন্তু অফসাইডের পতাকায় উদযাপন থেমে যায়। মনে হচ্ছিল, দুর্ভাগ্য বুঝি এখনও তার পিছু ছাড়েনি।
কিন্তু গল্পের শেষটা অন্যরকমই লেখা ছিল। ১৯তম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল আদায় করেন তিনি। ফ্রি-কিক নেওয়ার সুযোগ ছেড়ে দেন হুলিয়ান আলভারেস। বেঞ্চে বসে সব দেখছিলেন লিওনেল মেসি। আর সেই মুহূর্তে বাঁ পায়ের নিখুঁত বাঁকানো শটে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণে। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল—যে গোলের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় সাড়ে চার বছর, অসংখ্য চোট আর অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা পেরিয়ে। গোলটি হতেই যেন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। বেঞ্চে থাকা মেসিসহ পুরো আর্জেন্টিনা দল লো সেলসোর সেই মুহূর্ত উদযাপন করে।
২০২২ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ভিয়ারিয়ালে ধারে খেলতে যাওয়া এই টটেনহাম মিডফিল্ডার হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়েন। যে চোট শেষ করে দেয় তার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। আর্জেন্টিনার হয়ে আবার মাঠে ফেরার মাঝে সময়ের ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৬ মাস। কোরাসাওয়ের বিপক্ষে ফেরার ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৭-০ গোলের বড় জয়ে লিওনেল মেসিকে দিয়ে দুটো গোলও করান সেলসো। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ১০০তম গোলটিও আসে লো সেলসোর পাস থেকেই।
গত বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডে জিওভানি লো সেলসো ছিলেন লিওনেল স্কালোনির 'অটোমেটিক চয়েস'। লিওনেল মেসির সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু চোট তাকে ছিটকে দেয় বিশ্বকাপ থেকে, বাড়তি চিন্তায় ফেলে স্কালোনিকে। পরে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই আনন্দও মুছে দিতে পারেনি লো সেলসোর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা। নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন না জানার পর টানা তিন-চার দিন বাথরুমে লুকিয়ে কেঁদেছিলেন। এমনকি বিশ্বকাপের আগে সতীর্থরা তার সুস্থতা কামনা করে ব্যানার হাতে মাঠে নামলে আবারও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
অবশেষে চার বছর পর এলো সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপে ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই জর্ডানের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে গোল করে নিজের বিশ্বকাপ অভিষেককে স্মরণীয় করে রাখলেন লো সেলসো। একসময় যে বিশ্বকাপ তাকে শুধু কান্না উপহার দিয়েছিল, সেই বিশ্বকাপই এবার তাকে দিল হাসার, গর্ব করার এবং নিজের গল্পটা নতুন করে লেখার সুযোগ।
এসকেডি/জেআইএম








