একসময় বর্ষা এলেই কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে নেমে আসত ভাটা। আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘলা আকাশ, টানা বৃষ্টি আর উত্তাল সাগরের কারণে এ সময়টাকে পর্যটনের ‘অফ সিজন’ হিসেবে ধরা হতো। হোটেল-মোটেল থাকত ফাঁকা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাটত অলস সময়। কিন্তু সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
চলতি বছরের পুরো জুনজুড়েই কক্সবাজারে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঈদুল আজহার ছুটির পরও কমেনি ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগমন। বরং রোদ, মেঘ আর বৃষ্টির লুকোচুরিতে নতুন রূপে ধরা দেওয়া সমুদ্রসৈকত যেন আরও বেশি টানছে পর্যটকদের।
‘সবাই ধারণা করেছিলাম, কোরবানির ঈদের পর সময়গুলো পর্যটক শূন্য যাবে। কিন্তু বিগত দিনের চেয়ে এবারের জুন মাস পুরো সময়ই কমবেশি পর্যটক পেয়েছে কক্সবাজার। সপ্তাহের খোলা দিনগুলোতে কম হলেও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকছে। পর্যটনসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি ব্যবসা করেছে’
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষার ধরন বদলেছে। টানা বৃষ্টির পরিবর্তে এখন কখনো রোদ, কখনো মেঘ, আবার কখনো স্বল্প সময়ের বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে। এমন আবহাওয়া পর্যটকদের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে। ফলে একসময়কার ‘মরা মৌসুম’ এখন ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

ঈদের পরও কমেনি পর্যটকের ঢল
সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সাগরে নোনাজলের ঢেউয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আনন্দে মেতেছে সমুদ্রস্নানে। কেউ হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউবা কোমর সমান পানিতে গোসলে ব্যস্ত। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো মুঠোফোনে ধারণ করছেন।
কুমিল্লার চান্দিনা থেকে আসা পর্যটক তৌসিফ রহমান বলেন, বৃষ্টির সময় যে কক্সবাজার এতটা উপভোগ্য হয় আগে কখনো জানা ছিল না। এ মেঘ-এ রোদ- এই বৃষ্টি কি এক মনোরম পরিবেশ। শীতল পরিবেশে সৈকতে ঘুরে বেশ স্বস্তি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে সময়টা দারুণ উপভোগ করছি।
আরও পড়ুন
পায়রার জল, জনপদ আর জীবন দেখতে চাইলে
গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আসা মাহবুব ইসলাম বলেন, বর্ষার কারণে সাগরের ঢেউগুলো খুব বড় হয়ে আঁচড়ে পড়ছে। সমুদ্রের আকর্ষণ অন্য যে-কোনো পর্যটন স্থানের চেয়ে আলাদা। দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি ও দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছি, কিন্তু সমুদ্র বারবার কক্সবাজারে নিয়ে আসে। সময় পেলেই এখানে আসি। বৃষ্টিবাদলার দিনে রুম ভাড়াসহ সবকিছু সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যাচ্ছে। পরিবার-পরিজনকে নিয়ে এসে আনন্দও অনেক পাচ্ছি।
‘বৃষ্টির সময় যে কক্সবাজার এতটা উপভোগ্য হয় আগে কখনো জানা ছিল না। এ মেঘ-এ রোদ- এই বৃষ্টি কি এক মনোরম পরিবেশ। শীতল পরিবেশে সৈকতে ঘুরে বেশ স্বস্তি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে সময়টা দারুণ উপভোগ করছি’
শুধু গোসল নয়, বেলাভূমিতে বিনোদনও জমে উঠেছে। পর্যটকেরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে কিংবা বিচ বাইকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সৈকতের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দ্রুতগতির জেট-স্কিতে চড়ে অনেকেই যাচ্ছেন সাগরের গভীরে। সারিবদ্ধ কিটকট চেয়ার-ছাতাগুলোতেও বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন সাগরপ্রেমীরা।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার এলাকা থেকে আসা পর্যটক এস এম মাসুদ বলেন, বন্ধুরা মিলে কক্সবাজারে এসে দারুণ সময় কাটাচ্ছি। ঘোড়ায় চড়া, বিচ বাইকে ঘুরা, জেড স্কীতে ঢেউ কাটা দারুণ উপভোগ্য।
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থেকে আসা বেলাল আহমেদ বলেন, আগে থেকে বুকিং না দিয়েও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হোটেলে কম খরচে থাকা যাচ্ছে। মেরিন ড্রাইভের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আর সমুদ্রের শীতল বাতাস ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে।
পর্যটন ব্যবসায় ফিরেছে স্বস্তি
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাব ও ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটন ভালোই জমেছিল কক্সবাজারে। বাস, ট্রেন ও বিমানে ছুটে আসা মানুষের ঢল নামে সৈকত তীরে। ধারণা ছিল, ছুটি শেষ হলে হয়ত পর্যটনে খরা সময় যাবে। কিন্তু কোরবানির ঈদের ধারা পুরো জুন মাসেই চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে শুক্রবারে সৈকত পরিণত হয় জনসমুদ্রে। কলাতলী, লাবণী, সুগন্ধা ও সি-গাল পয়েন্ট-সবখানেই পর্যটক-দর্শনার্থীর যেন মেলা বসে। সাগরের নোনাজল আর ঢেউয়ের উচ্ছ্বাসে মাতেন হাজারো ভ্রমণপিয়াসী।
আরও পড়ুন
বড়পুকুরিয়া লেক: তলিয়ে যাওয়া গ্রামে নতুন পর্যটন স্বপ্ন
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের বিপণন ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নূর সোমেল বলেন, সবাই ধারণা করেছিলাম, কোরবানির ঈদের পর সময়গুলো পর্যটক শূন্য যাবে। কিন্তু বিগত দিনের চেয়ে এবারের জুন মাস পুরো সময়ই কমবেশি পর্যটক পেয়েছে কক্সবাজার। সপ্তাহের খোলা দিনগুলোতে কম হলেও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকছে। পর্যটনসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি ব্যবসা করেছে।

নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি
এদিকে, পর্যটকদের আনন্দ-বিনোদন যেন বিষাদে পরিণত না হয়, সে দিকটি নিশ্চিতে বেলাভূমিতে রয়েছে সী সেইফ লাইফগার্ড, বীচ কর্মী, ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা ইউনিট।
সী-সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মী মো. ওসমান বলেন, বর্ষার কারণে সমুদ্র বেশ উত্তাল রয়েছে। কোরবানির ঈদের ছুটি থেকে টানা পর্যটক রয়েছে সৈকতে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেলাভূমির তিনটি প্রধান পয়েন্টে বিপুল পরিমাণ পর্যটক-দর্শণার্থীর সমাগম ঘটে। গোসলে নামেন কয়েক হাজার মানুষ। লাইফগার্ড সদস্যরা তিনটি পয়েন্টেই সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছেন। এরপরও অনেকে ভেসে যান, জানতে পারলেই তাদের উদ্ধার করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা বরগুনার নিদ্রার চর
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। বিপুল পরিমাণ পর্যটক উপস্থিতি হলেই মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়।
তিনি বলেন, পর্যটক যেন সৈকতে গোসলে নেমে কোনো ধরনের ঝুঁকি বা বিপদের মুখে না পড়েন। আমাদের উদ্ধারকর্মীদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে, ইনানীর দুর্ঘটনা, অসাবধানতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত।
আরও পড়ুন
ঐতিহ্যবাহী যত প্রাচীন দিঘির জনপদ ফেনী
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আজমল হোসেন বলেন, কোরবানি ঈদের পর থেকে সপ্তাহের সবদিনেই পর্যটক উপস্থিতি রয়েছে। তবে, শুক্র ও শনিবার বিপুলসংখ্যক পর্যটক-দর্শনার্থীর ভিড় জমে। আগত সাগর প্রেমীদের নিরাপত্তায় ‘কলাতলী-সুগন্ধা-লাবণী’ তিন পয়েন্ট এবং ইনানী, হিমছড়িতে দুই শিফটে ট্যুরিস্ট পুলিশ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি আরও বলেন, দিনে কোনো সমস্যা না হলেও রাতে সুগন্ধা ও লাবণীর মাঝামাঝি ঝাউবন এলাকায় একটু ঝামেলা হয়। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে অনৈতিকতায় লিপ্ত নারী-পুরুষের নিরাপদ আড্ডাস্থল হয় এটা। আমাদের একটি মোবাইল টিম সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে টহলে থাকে। বেলাভূমির লাইটিংটা শুধু সাগরের দিকে না হয়ে ঝাউবাগানেও দেওয়া গেলে এসব সমস্যা দূর করে রাতেও পর্যটকদের নিরাপদ চলাফেরা নিশ্চিত করা সম্ভব। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আন্তরিকতায় দায়িত্ব পালন করছে।
কক্সবাজার বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির তত্ত্বাবধায়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মামনুন আহমেদ অনীক বলেন, সুগন্ধা থেকে সী-গাল পর্যন্ত ঝাউবাগান এলাকায় লাইটিং না থাকার বিষয়টি নজরে ছিল না। এখন যেহেতু অবগত হয়েছি, আলোচনা সাপেক্ষে তা স্থাপন করা হবে। বীচে বিদ্যমান লাইটগুলোর মাঝে প্রায় ১৫টি অকেজো শনাক্ত হয়েছে, সেগুলো সারানো উদ্যোগ চলছে। একই সঙ্গে অন্ধকার থাকা ঝাউবাগানের লাইটগুলো বসানো যায় কিনা প্রচেষ্টা থাকবে।
এসএএল/কেএইচকে/জেআইএম








