আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে রোববার রাতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। এতে দেশটির অন্তত ৩৬ জন বেসামরিক নিহত এবং আরও ১৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আফগান কর্তৃপক্ষ। তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী হামলার জবাবে স্থল ও বিমান হামলা চালিয়ে ২৯ জন জঙ্গিকে হত্যা করেছে। সোমবার আলজাজিরা ও বিবিসির পৃথক প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে এ তথ্য।
আফগানিস্তানের অভিযোগ, বেসামরিক এলাকা লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। আফগান সরকারের ডেপুটি মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বলেছেন, পাকতিয়া, পাকতিকা এবং কুনার প্রদেশে বেসামরিক নাগরিকদের বাড়ি লক্ষ্য করে পাকবাহিনী এসব হামলা চালিয়েছে। তালিবান এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাকতিয়ায় চামকানি জেলার মান্দখালী গ্রামে এক বাড়িতে পাকবাহিনী বোমাবর্ষণ চালিয়ে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি এবং শিশুকে হত্যা করেছে। এরপর পাকবাহিনী দ্বিতীয় হামলাটি চালায় গ্রামবাসীদের ওপর। এই হামলায় নিহত হয়েছে ২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ১৫৮ জন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পাকতিকার গিয়ান জেলার ওলাস্ট গ্রামে আরেক বাড়িতে পাকবাহিনীর হামলায় ছয়জন বেসামরিক নিহত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই নারী এবং শিশু। কুনারের মানোগাই জেলায় হামলা চালিয়ে এটি একটি আবাসিক বাড়িও গুঁড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথম দফার হামলার পর যখন স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন, ঠিক তখনই দ্বিতীয় দফায় বোমাবর্ষণে উদ্ধারকারীদের শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার বিস্ফোরণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। আফগানিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলাকে একটি ‘নৃশংস যুদ্ধাপরাধ’ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো স্থানে প্রথম হামলার পর সেখানে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত বেসামরিক নাগরিক বা চিকিৎসাকর্মীদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বার হামলা চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি গুরুত্বর অপরাধ। আফগান সরকারের মুখপাত্র এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা জানান, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনা, হাসপাতাল ও মসজিদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, দেশজুড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর একাধিক হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নির্ভুল হামলায় পাকতিয়া, পাকতিকা এবং কুনারে সন্ত্রাসীদের তিনটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।
গত শনিবার পাকিস্তানের করাচিতে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদরদপ্তরে আত্মঘাতী হামলা হয়। এতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হন। ওই আত্মঘাতী হামলায় তিন হামলাকারীও নিহত হয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, তারা চতুর্থ একজনকে গ্রেফতার করেছেন যিনি একজন আফগান নাগরিক। এই হামলার জেরেই আফগানিস্তানে অভিযান চালালো পাকবাহিনী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার পরিমাণ অনেকটা বেড়েছে। বিশেষ করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার জন্য আফগানিস্তানকে দায়ী করে আসছে ইসলামাবাদ। দেশটির অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিষিদ্ধঘোষিত পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) এসব হামলা চালাচ্ছে। তবে পাকিস্তানের এসব অভিযোগ বারবারই অস্বীকার করে আসছে আফগানিস্তান।
উভয় দেশের কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্ত এলাকায় থেমে থেমে সীমান্ত সংঘর্ষ ও বিমান হামলায় অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতেও দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষে অনেক মানুষ নিহত হন। এরপর মার্চ মাসে কাবুলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের হামলায় শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। সীমান্ত উত্তেজনার জেরে বহু বছর ধরেই হামলা পালটা হামলা চালিয়ে আসছে দেশ দুটি। ফলে প্রতিবেশী দেশ দুইটির সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। উভয় পক্ষই কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুদেশের সীমান্ত অঞ্চলের উত্তেজনা এবং দফায় দফায় চলা আকাশপথের এই লড়াই সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।








