বিশ্বকাপে আলো সব সময় পড়ে ফুটবলারদের ওপর। গোল, উদ্যাপন, কান্না, ট্রফি উঁচিয়ে ধরা-এসব মুহূর্তই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু সেই ইতিহাস কোটি দর্শকের ঘরে পৌঁছে দেন আরেক দল মানুষ, যাদের খুব কমই দেখা যায়। তারা ধারাভাষ্যকার, প্রযোজক, ক্যামেরাপারসন, সম্প্রচার প্রকৌশলী কিংবা মাঠে ছুটে বেড়ানো প্রতিবেদক। তাদের নিরলস পরিশ্রম ছাড়া বিশ্বকাপের উত্তেজনা কখনোই পূর্ণতা পায় না। এবারের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের দিক থেকে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। তিন দেশ, ১৬ শহর, ৪৮ দল এবং ১০৪ ম্যাচ-এত বিশাল আয়োজন শুধু মাঠের খেলোয়াড়দেরই নয়, সম্প্রচারকর্মীদের সামর্থ্যরেও প্রতিনিয়ত পরীক্ষা নিচ্ছে। এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে চলা, দীর্ঘ বিমানযাত্রা, সময় অঞ্চলের পার্থক্য, প্রতিটি ম্যাচের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রস্তুতি-সব মিলিয়ে এটি যেন আরেকটি ম্যারাথন।
একজন ধারাভাষ্যকারের কাজ শুধু খেলার বর্ণনা দেওয়া নয়। তাকে জানতে হয় খেলোয়াড়দের পটভূমি, দলের ইতিহাস, পরিসংখ্যান, নামের সঠিক উচ্চারণ। বিশাল স্টেডিয়ামের অনেক উঁচু থেকে একই রঙের বুট পরা খেলোয়াড়দের আলাদা করে চেনাও কঠিন। আবার গ্রুপপর্বে একাধিক ম্যাচ একসঙ্গে চললে মুহূর্তে বদলে যেতে পারে সমীকরণ। তখন দর্শকদের সামনে নির্ভুল তথ্য তুলে ধরা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বকাপ এখন আর শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। টিভি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল অ্যাপ-সব জায়গায় একই সঙ্গে কোটি কোটি দর্শকের জন্য কনটেন্ট তৈরি করতে হচ্ছে।
ফলে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তুলতে হয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী, আধুনিক স্টুডিও এবং জটিল প্রযুক্তিনির্ভর নেটওয়ার্ক।
তবু এই অবিরাম যাত্রার মাঝেও তাদের চোখে থাকে উচ্ছ্বাস। কারণ তারা খুব কাছ থেকে দেখেন ফুটবল ইতিহাসের জন্ম। যে গোলে একটি দেশের স্বপ্ন বেঁচে ওঠে, যে অশ্রুতে শেষ হয়ে যায় আরেক দলের যাত্রা-সেসব মুহূর্তের প্রথম সাক্ষীদের অন্যতম তারাই। দর্শক যখন ঘরে বসে আবেগে ভাসেন, তখন সেই আবেগকে শব্দ, ছবি ও অনুভূতিতে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। বিশ্বকাপ তাই শুধু ২২ জন ফুটবলারের লড়াই নয়।
এটি হাজারো অদৃশ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক মহাযজ্ঞ। মাঠের নায়কদের পাশাপাশি ক্যামেরার ওপাশের এই নীরব যোদ্ধারাও সমানভাবে বিশ্বকাপের গল্প লিখে চলেন-নিজেদের নাম আলোচনার কেন্দ্রে না রেখেই।








