পিয়াস সরকার
কেটে গেছে বিশটা বছর। দীর্ঘ এই সময় পর আবার প্রিয় বারান্দাটায়। বারান্দা থেকে এখনো দেখা যায় বকুল গাছটা। এখনো সূর্যের আলো এসে গাছটায় পড়ে। কিন্তু গাছটার মতো নীলের জীবনটাও অগোছালো। স্তরে স্তরে হয়েছে সর্বনাশ।
নীল তখন টগবগে যুবক। স্টেশন পেরিয়ে ঝোঁপঝাড়ের পথ বেরিয়ে দোতলা বাড়ি। নীল এই বাড়িতে থাকতো। জীবনের শ্রেষ্ঠ একটা উপন্যাস লিখতে চেয়েছিল এই বাড়িতে। বাড়ির নাম বকুল। বকুল যেন বনের মধ্যে এক সিংহাসন।
নীল বাউণ্ডুলে। উপন্যাস তাকে টানে। তার চাওয়া জীবনের সব ছেড়ে একটা নির্জন স্থানে ঘাঁটি গাড়বে। সে সময়ে সে একটা উপন্যাস লিখবে। এই অর্ধপরিত্যক্ত বাড়িতে বন্ধুর সহযোগিতায় উঠে পড়ে। বাড়ির মালিক ভারতে থাকে। মাঝে মধ্যে তার এক আত্মীয় ঢু মেরে দেখে যায়। নীলের জায়গা হলো দোতলায় বিশাল বারান্দাওয়ালা রুমে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে সামান্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। বকুলে মানুষজন আসে না বললেই চলে। প্রতিবেশীরা এই বাড়ি এড়িয়ে চলে। মাঝে মধ্যে গরু-ছাগল চড়াতে কিংবা খুঁজতে আসেন। নীল পাঁচ কিলোমিটার দূরে বাজারে যায় প্রয়োজন হলে।
নির্জন সময়। উপন্যাস লেখার সময়। নির্জনতা তার ভালো লাগছে। কিন্তু অতি নির্জনতার কুফলগুলো মাথাব্যথা আকারে ধরা দিচ্ছে। নীলের পিছুটান নেই। বাবা-মা গত হয়েছেন। একটা বোন আছে। বিবাহিত, যোগাযোগ নেই।
নির্জনতা ও নিঃসঙ্গতা এক নয়; এটা নীল বুঝতে শুরু করে। দিনগুলো তার দীর্ঘ হতে শুরু করে। নির্জন এই গ্রামের স্টেশনটায় নীল প্রায়ই হাঁটতে যায়। দিনে মাত্র একটা ট্রেন থামে। বাকি ট্রেনগুলো দাঁড়ায় না। বিকট হুইসেল বাজিয়ে চলে যায়। স্টেশনটার নামটা সুন্দর ‘মায়ার হাট’। স্টেশনের আশপাশে শোভা পায় অসংখ্য গাব গাছ।
বিকেল সবে শুরু হয়েছে। ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল। নীল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বকুল গাছটা বৃষ্টি-বাতাসের সঙ্গে লড়াই করছে। নীল নিজের হাতে বানানো চা পান করতে করতে দৃশ্যগুলো দেখছিল। আর উপন্যাসে বৃষ্টি নামে এক মেয়ের চরিত্র নিয়ে আঁকছিল।
হঠাৎ একটা বড় দমকা হাওয়া বয়ে গেল। হাওয়াটা এতটাই প্রবল যে নীলের টেবিলে থাকা খাতা-কলম উড়িয়ে নিলো। হঠাৎ মাথায় চক্কর দিলো। মাথা ঘুরে পড়ে গেল নীল। জ্ঞান ছিল তার। আশপাশে যা হচ্ছে সবই দেখলো। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। নীল স্বাভাবিক হলো রাতে। কী ঘটেছিল নীলের সঙ্গে...
পরদিন ভোরেই নীল মায়ার হাট ত্যাগ করে। এমনভাবে ত্যাগ করে যে হাতের ব্যাগটা নিয়েই বের হয়ে যায়। যে উপন্যাসের জন্য তার বকুলে আগমন, সেই খাতাটাও নেয়নি।
আরও পড়ুনপিয়াস সরকারের রম্যগল্প / চশমাদের কর্মবিরতি
বিশ বছর পর নীল সেই বাড়িতে ফিরেছে। অর্ধপরিত্যক্ত বাড়ি এখন পুরো পরিত্যক্ত। মায়ার হাট স্টেশনটায় পরিবর্তন হয়েছে। দোকান হয়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। আধাপাকা রাস্তাও হয়েছে। বাজারের জন্য যেতে হয় না পাঁচ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এখনো একটা ট্রেনই থামে এই স্টেশনে। নীল ট্রেন ধরে যাচ্ছিল। এই ট্রেনটা মায়ার হাটে থামার কথা নয়। কিন্তু গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে শুনলো ট্রেনের যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো হালকা একটা আলোয় লেখা ‘মায়ার হাট’।
নীল ট্রেন থেকে নামলো। গাবগাছগুলো চাঁদের আলোয় যেন জ্বলছে। ট্রেন থেমেছে শুনে স্টেশনের দোকানগুলো খুলেছে। এককাপ চা হাতে নীল বকুলের রাস্তাটা দেখছে। নীল দোকানদারকে বকুলের কথা বললেন। দোকানদার জানালেন, এটা এখন পরিত্যক্ত।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে চলে গেল। নীল মায়ার হাটেই রয়ে গেল। ট্রেনটা ছুটে যাচ্ছে... নীল ভাবছে তার বর্তমান তাকে রেখে চলে যাচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে আছে অতীতে।
নীল হাঁটছে, বকুলের দিকে। বাড়ির গেটটা ভগ্ন প্রায়। ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। কোনোরকম গেট পার হয়ে ভেতরে গেল। বকুল গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশে জন্ম নিয়েছে আগাছা। বাড়ির অবস্থা যা-তা। ঘরের ভেতরে মাকড়সার জাল, ধুলা, ছোট ছোট গাছ। নাক আটকে আসছে। ওপরের তলায় তার রুমে যাবে কি, যাবে না... এক পা বাড়ায় আর বুকটা কেঁপে ওঠে। ভীষণ নীরবতা আবার সাপ, পোকামাকড়ের ভয়।
সিঁড়িগুলো দিয়ে হাঁটা দায়। ওপরের পলেস্তারা খসে খসে পড়েছে। একটা লাঠি নিলো নীল। আশপাশে তাকিয়ে দেখছে কেউ আছে কি না। একটু সাহায্যের আশায়। না কেউ নেই। হঠাৎ করে মিষ্টি শব্দে ময়না পাখির ডাক শুনতে পায়। কিন্তু শব্দটা মিষ্টি হলেও বুকটা ধুক করে ওঠে।
ধীরে ধীরে নীল জঞ্জাল ভরা করিডোর পেরিয়ে তার রুমের সামনে দাঁড়ালো। একটু আশ্চর্যই হলো বটে। বকুলের অবস্থা যা তা। কিন্তু তার রুমের দরজাটা পরিষ্কার, অক্ষত। ছিটকিনি লাগানো। ছিটকিনিটাও পরিষ্কার। তবে কি নিয়মিত এই ছিটকিনি খোলা হয়। কিন্তু যাতায়াত থাকলে তো করিডরটার এমন বেহাল দশা হতো না।
ভয়ে থরথর করে কাঁপছে হাত। ছিটকিনিতে হাত রাখলো নীল। নীল বিয়ে করেনি। তার প্রেমিকার হাত প্রথমবার যখন ধরেছিল; তখন যেরকম ঝটকা লেগেছিল সেরকম লাগলো। তবে বৃষ্টির হাতটা ছিল মোলায়েম, ছিটকিনিটা ঠিক তার বিপরীত।
ও হ্যাঁ, নীলের প্রেমিকার নাম রোদেলা। নীল ভালোবেসে ডাকতো বৃষ্টি। বিয়ে হয়েছে বৃষ্টির। সেই স্মৃতি নিয়েই আছে। নতুন কোনো হাত আর ধরা হয়নি।
নিঃশ্বাস আটকে রেখে ছিটকিনিটা টান দিলো নীল। খুলে গেল দরজাটা। একটা আলো এসে চোখে লাগলো। চোখটা বন্ধ করে ফেলে নীল।
ধীরে ধীরে চোখ খুলছে... নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কেটলিতে চা। কেটলির চা এখনো হালকা গরম। দু’কাপ চা বানিয়েছিল নীল। এক কাপ চা নিয়ে গিয়েছিল বারান্দায়। খাটের ওপর এখনো উল্টানো রয়েছে আহমদ ছফার লেখা বইটা। বইটা উল্টে দেখে ‘সূর্য তুমি সাথী’ উপন্যাস। বালিশটা এখনো সেখানে। কোলবালিশটা তার পাশে। এভাবেই হেলান দিয়ে বসে নীল। কতগুলো বকুল ফুল এনে রেখেছিল টেবিলের ওপর। সেগুলো সেখানেই আছে। ফুলগুলো তাজা। ছড়াচ্ছে সৌরভ।
আরও পড়ুনপিয়াস সরকারের রম্যগল্প / বোতল-বালিশ ও মশার এগ্রিমেন্ট
বারান্দায় যাবার পালা। বারান্দায় ধীর পায়ে যাচ্ছে নীল। দড়ির সঙ্গে ঝুলছে একটা গামছা। অর্ধভেজা। গোসল শেষে শুকাতে দিয়েছিল সেই বিশ বছর আগে। ডানে তাকাতেই দেখলো, চায়ের কাপটা পড়ে আছে। অর্ধেক চা মাটিতে গড়িয়েছে।
হঠাৎ বাতাসে পাতা নড়ার শব্দ হলো। ছোট টেবিলটার পাশে পড়ে আছে তার লেখা অর্ধ-উপন্যাস। কলমটার ক্যাপ এখনো পেছনে লাগানো। একটা ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া অনেকগুলো পাতা। খাতার লেখাগুলো কেমন যেন অস্পষ্ট। আর ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া লেখাগুলো স্পষ্ট। নীল বুঝতে পারছে না, কী হচ্ছে তার সঙ্গে। সে ধীরে ধীরে ঝুড়িতে ফেলা দেওয়া পাতাগুলো একত্র করে। আর পড়তে পড়তে ভাবে... বাহ দারুণ।
হঠাৎ একটা হালকা হাওয়া এসে শরীরে লাগে। নাকে লাগে বকুল ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ।
শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি...
এসইউ








