রাষ্ট্রপতি সাধারণত নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করেই দায়িত্ব ছাড়েন। তবে রাজনৈতিক সংকট, গণআন্দোলন, অভিশংসন, সাংবিধানিক চাপ বা ব্যক্তিগত কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নজির রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে পেরু, শ্রীলঙ্কা কিংবা জার্মানি বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনা বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

এদিকে বাংলাদেশেও রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও দেশীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। যদিও যখন এই প্রতিবেদন লিখছি তখন পর্যন্ত তার পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

jagonewsদক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হে

দক্ষিণ কোরিয়া: দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত দেশটির সাংবিধানিক আদালত তার অভিশংসন বহাল রাখে এবং তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা হারান। পরে তার বিরুদ্ধে বিচারও হয়। এর আগে ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট রোহ মু-হিউনের বিরুদ্ধেও অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত পদে বহাল ছিলেন।

পেরু: রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশ

লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুতে গত এক দশকে একাধিক প্রেসিডেন্ট মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি দুর্নীতির অভিযোগ ও অভিশংসনের মুখে পদত্যাগ করেন। ২০২০ সালে মার্টিন ভিজকারাকেও কংগ্রেস অপসারণ করে। একই বছরে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল মেরিনো মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

jagonewsপেরুর প্রেসিডেন্ট পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি দুর্নীতির অভিযোগ ও অভিশংসনের মুখে পদত্যাগ করেন

শ্রীলঙ্কা: জনরোষে ক্ষমতা ছাড়েন গোতাবায়া

শ্রীলঙ্কার সেই আন্দোলন-গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি এখনো সতেজ। ২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কাজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ভবন দখল করলে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরে বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান। এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের একটি ঘটনা।

জার্মানি: বিতর্কের জেরে বিদায়

জার্মানির প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান উলফ ২০১২ সালে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়া এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েন। তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন।

jagoশ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান

বলিভিয়া: সংকটের পর পদত্যাগ

২০১৯ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ওঠার পর বলিভিয়াজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর চাপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস পদত্যাগ করেন এবং পরে দেশ ত্যাগ করেন।

আর্মেনিয়া: আন্দোলনের চাপে নেতৃত্ব পরিবর্তন

২০১৮ সালে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা ঘিরে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী সার্জ সার্গসিয়ান পদত্যাগ করেছিলেন। যদিও তিনি তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, আর্মেনিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রপতি ও সরকারপ্রধানের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

jagoজার্মানির প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান উলফ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন

কিন্তু বাংলাদেশেও কী সেই ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সসহ একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সাহাবুদ্দিন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। কিছু প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়েছে যে, তিনি শুক্রবার পদত্যাগ করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে সরকারিভাবে এখনো কোনো প্রজ্ঞাপন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি হয়নি। তাই বিষয়টি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। অন্তর্বর্তী সময়ে সংবিধানে নির্ধারিত বিধান অনুসারে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা কার্যকর হবে।

jagoবাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়েও আলোচনা এখন তুঙ্গে

পদত্যাগ সব সময় একই কারণে হয় না

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, রাষ্ট্রপতির আগাম বিদায়ের কারণ একেক দেশে একেক রকম। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ, কোথাও গণআন্দোলন, কোথাও অর্থনৈতিক সংকট, আবার কোথাও রাজনৈতিক সমঝোতার অভাব রাষ্ট্রপ্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়েও আলোচনা এখন তুঙ্গে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত। ভবিষ্যতে সরকারি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশও কি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আন্তর্জাতিক তালিকায় নতুন করে যুক্ত হবে।

কেএসকে